এও সহ্য করা যায় কিন্তু এই রাত্তিরে কেউ যে কালো সানগ্লাস পরে থাকতে পারে তা যেন ভাবাই যায় না।
যাই হোক, ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। তার গলায় যে রুদ্রাক্ষের মালা ছিল এটা এতক্ষণ নজরে আসেনি। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সামনে যে একজন ভদ্রলোক বসে আছেন, সেদিকে লক্ষ্যমাত্র না করে ম্যাগাজিনের তলা থেকে খুলিটা নিয়ে বুলুর সেই আলমারিতে রেখে এলেন। যেন তিনি খুলিটা ভালো করে দেখতে নিয়েছিলেন, দেখার পর রেখে দিলেন আর কি!
বুলু কি আলমারিতে চাবি লাগিয়ে যায়নি? নাকি ওটা খোলাই থাকে?
জানি না।
ভদ্রলোক আবার নিজের জায়গায় গিয়ে মুখের ওপর কাগজ আড়াল করে বসলেন।
আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম বুলু কখন আসবে বলতে পারেন?
উত্তরে একটা গম্ভীর স্বর গলার মধ্যে ঘড় ঘড় করে উঠল–মিনিট তেরোর মধ্যে।
ও বাবা! ইনি যে আবার মিনিট সেকেণ্ড ধরে কথা বলেন! দশ মিনিটও নয়, পনেরো মিনিটও নয়–একেবারে তেরো মিনিট!
জিজ্ঞেস করলাম–ওর সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছে?
না।
দেখা হয়নি, বুলু কোথায় গেছে তাও বোধহয় জানেন না। অথচ তিনি বলতে পারেন– তেরো মিনিট পরে আসবে!
কত রকমের স্ক্রু-ঢিলে মানুষই না আছে!
একটু পরে উনিই আবার কথা বললেন–হ্যাঁ, আর আট মিনিটের মধ্যে ওর এসে পড়া উচিত যদি না কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়।
–অ্যাকসিডেন্ট!
–হ্যাঁ। মানে দুর্ঘটনা।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি অ্যাকসিডেন্টের ভয় পাচ্ছেন কেন? উনি তেমনি করেই উত্তর দিলেন, অ্যাকসিডেন্টকে ও ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে এনেছে।
কিছু বুঝতে না পারলেও রীণার সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে নাকি বাস চাপা পড়ছিল।
এমনি সময়ে কলিংবেল বাজল। তারপর আধ মিনিটের মধ্যে বুলু হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল। ও মা, কাকু! কতক্ষণ এসেছেন?
আমি উত্তর দেবার আগেই ভদ্রলোক হঠাৎই উঠে পড়লেন।
বুলু বললে, এ কি মামা, এখনি উঠছেন?
–হ্যাঁ। তুমি একটু শুনে যেও।
বলে সামান্যতম ভদ্রতাটুকুও না দেখিয়ে প্রায় আমার গায়ে ধাক্কা দিয়ে চলে গেলেন।
বুলু ওঁকে এগিয়ে দিয়ে ফিরে এল। মুখটা থমথম করছে। একটু চুপ করে থেকে বলল, উনি হঠাৎ অমন করে চলে গেলেন কেন বুঝলাম না। আপনার সঙ্গে বোধহয় ভালো করে কথাও বলেননি?
আমি একটু হাসলাম।
–যাবার সময়ে আমাকে বললেন কি জানেন? বললেন, হয় ঐ খুলিটা এ ঘর থেকে সরাও, নয় যার তার এ ঘরে ঢোকা বন্ধ করো। কথার মানে বুঝেছেন তো কাকু?
আমি আবার শুধু হাসলাম।
.
এই হচ্ছে নাকি বুলুর দু নম্বর মজার জিনিস বুলুর নতুন পাতানো মামা!
মামাটির সঙ্গে বুলুর আলাপ হয় নেপালের কাঠমাণ্ডুর একটা হোটেলে। তিনি বাঙালী। কলকাতাতেও যেমন তার একটা আস্তানা আছে তেমনি আছে কাঠমাণ্ডুতেও। কিন্তু কাঠমাণ্ডুতে কোথায় যে পাকাপাকিভাবে থাকেন, কি করেন তা কেউ জানে না। মাঝে মাঝে এই হোটেলে তাঁর দেখা পাওয়া যায়। এখানে তাঁর পরিচয় একজন জ্যোতিষী বলে। মুখ দেখেই তিনি ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান বলে দিতে পারেন।
এই সূত্রেই বুলুর সঙ্গে তার আলাপ। হোটেলের সবাই ভিড় করে আসে তার ঘরে। শুধু বুলুই যায় না। সে এসব মোটে বিশ্বাস করে না। কিন্তু বুলু না গেলে কি হবে– ভদ্রলোক নিজেই একদিন ডাকলেন–ও মামণি! শোনো শোনো।
অগত্যা বুলুকে ঢুকতে হয়েছিল ওঁর ঘরে।
সবাই আসে, শুধু তুমিই আস না।
বুলু হেসে বলেছিল–আমি ওসব বিশ্বাস করি না।
ভদ্রলোক একটু হেসেছিলেন।
সেদিন ঐ পর্যন্ত।
এরপর একদিন ভদ্রলোক বুলুকে একেবারে তাজ্জব করে দিলেন যখন বললেন, তোমার বাবার জন্যে কিছু ভেব না। তিনি ভালো আছেন। এই মাসের শেষেই তিনি ফিরে আসছেন।
বুলুর বাবা লিবিয়াতে চাকরি নিয়ে গিয়েছিলেন। অবাক কাণ্ড-নেপালে আসার ঠিক আগের দিনই বুলুরা চিঠি পেয়েছিল–তিনি ফিরছেন।
এত বড়ো ভবিষ্যৎ বাণীর পর আর কি ঠিক থাকা যায়! বরফ গলল। বুলু দারুণ বিশ্বাসী হয়ে গেল। ভদ্রলোককে মামা বলে ডাকতে লাগল।
কিন্তু অবাক হবার ব্যাপার তখনো বাকি ছিল।
নেপাল থেকে ফেরার আগের দিন।
সন্ধ্যের পর বুলুরা দক্ষিণাকালী দেখে হোটেলে ফিরল। দক্ষিণাকালী মন্দির কাঠমাণ্ডু থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে। অনেক পাহাড়, খাদ পেরিয়ে তবে যেতে হয়। মন্দিরটা একটা পাহাড়ের নীচে। নামতে হয় অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে। ঐরকম পরিবেশেই বুঝি কালীকে মানায়। প্রকৃতির কোলে নিস্তব্ধ, নিঝুম পরিবেশটি।
যাই হোক, বুলু ফিরেই তার এই নতুন মামাটির সঙ্গে দেখা করল। হাসতে হাসতে ব্যাগ খুলে কাগজে মোড়া একটা জিনিস বের করে তার হাতে দিয়ে বলল, দেখুন তো মামা জিনিসটা কেমন হলো?
জিনিস দেখে তো মামা হতভম্ব!
–এটা তুমি কোথায় পেলে?
বুলু বলল, একজন পাহাড়ীর কাছ থেকে কিনলাম দক্ষিণাকালীর মন্দিরের কাছে।
মামা অনেকক্ষণ ধরে সেই ছোট্ট খুলিটা পরীক্ষা করে দেখলেন। তারপর বললেন, এ যে বড়ো ভয়ঙ্কর জিনিস। এ নিয়ে তুমি কি করবে মা?
বুলু তাড়াতাড়ি তার হাত থেকে খুলিটা নিয়ে বলল, আলমারিতে সাজিয়ে রাখব।
মামা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ বুলুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, কাজটা কি ভালো হবে? ও যার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দেওয়াই উচিত।
এই পর্যন্ত বলে তিনি একটু থামলেন। তারপর বললেন, আমি শীগগিরই ওখানে যাব। ইচ্ছে করলে আমায় দিতে পার। যার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দেব। দামটা না হয় এখুনি তোমায় দিয়ে দিচ্ছি।
