একদিন।
রাত বেশ গভীর। নিস্তব্ধ অঞ্চলটা। মনে হলো কে যেন দরজায় টোকা দিচ্ছে ঠুক ঠুক ঠুক।
ঘুম ভেঙে গেল মহীতোষবাবুর। কিন্তু কিছু আর শোনা গেল না। ভাবলেন, বোধ হয় স্বপ্ন দেখছেন। পাশ ফিরে চোখ বুজলেন। একটু পরেই আবার সেই শব্দ। এবার বিছানায় উঠে বসেই হাঁকলেন, কে?
উত্তর নেই।
পাঁচ মিনিট পরে আবার সেই শব্দ। এবার জোরে।
মহীতোষবাবু উঠতে যাচ্ছিলেন, ওঁর স্ত্রী বাধা দিলেন, যেও না।
মহীতোষবাবু হচ্ছেন পুলিশ অফিসার। এত অল্পে ভয় পেলে কি তার চলে।
দাঁড়াও দেখি। বলে উঠে আলমারি খুলে রিভলবারটা নিয়ে দরজা খুলতে গেলেন, আর ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে একটা অল্পবয়সী ছেলের গলা শোনা গেল, মহী, আমি এসেছি, খুব দরকার।
গলার স্বর শুনে মহীতোষবাবু অবাক! যেন অনেক দিন আগের খুব চেনা গলার স্বরটা। তাড়াতাড়ি দরজা খুললেন। কিন্তু কেউ কোথাও নেই।
মহীতোষবাবুর বাড়ির সামনে সরু এক ফালি প্যাসেজ আছে। প্যাসেজটা গিয়ে পড়েছে বড়ো রাস্তায়। এই প্যাসেজ দিয়েই যাওয়া-আসা করতে হয়। দরজার সামনে কেউ নেই দেখে মহীতোষবাবু প্যাসেজের উপর টর্চ ফেললেন। দেখলেন সেখানে একটা লোক দাঁড়িয়ে। খালি গা, পরনে একটা লুঙ্গি। মাথায় ফেট্টি বাঁধা। মুখটা রক্তে জবজবে।
এ আবার কে? এত রাত্তিরে এখানে কেন? পুলিশের লোক বলে লোকটা কি নালিশ জানাতে এসেছে?
তাকে কিছু বলতে যাবেন, স্পষ্ট দেখলেন লোকটা হাতের ইশারায় তাকে ডাকছে।
মহীতোষবাবু রিভলবারটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেলেন। এগিয়ে গেলেন একেবারে ওর তিন ফুটের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে এক চাঙড় বরফ যেন তার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে গেল। হাত-পা অসাড় হয়ে এল।
কে এ? এ তো ভৈরব। সেই যে খুন হয়েছিল। যার খুনের কিনারা এখনও হয়নি। আশ্চর্য! সে কি করে–
পরক্ষণেই দেখলেন ও এগিয়ে যাচ্ছে রাস্তার দিকে। হাতের ইশারায় কেবলই ডাকছে, এসো–আমার সঙ্গে এসো।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো তিনি ওর পিছনে পিছনে চললেন। ও গলি থেকে পথে নামল। রাস্তা নির্জন–অন্ধকার। আগে আগে চলেছে ভৈরবের ছায়ামূর্তি। পিছনে মহীতোষবাবু। মাঝেমাঝেই সে পিছন ফিরে দাঁড়াচ্ছে আর ইশারায় ডাকছে।
ও কোথায় কী উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে কে জানে! মহীতোষবাবু চলেছেন তো চলেছেনই। একটা কথাই শুধু ওঁর মনে পড়ছে, দরজা ঠেলবার সময়ে ছোটো ছেলের গলায় ভৈরব বলেছিল, খুব দরকার।
কিসের দরকার? তবে কি ও ওর খুনীর কাছে নিয়ে যেতে চায়?
এ কথা মনে হতেই মহীতোষবাবু খুব ভয় পেলেন। এভাবে একা যাওয়া তার উচিত নয়। তখনই তিনি ফিরে যেতে চাইলেন। কিন্তু ঠিক কোথায় এসে পড়েছেন তা বুঝতে পারলেন না। তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। পা দুটো যেন অসাড় হয়ে এল। তিনি আর হাঁটতে পারলেন না। ফুটপাথের ওপরেই বসে পড়লেন।
জ্ঞান ফিরে এল ভোরবেলায়। তখন একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
এই পর্যন্ত বলে মহীতোষবাবু থামলেন। ধূর্জটিবাবু সেই যে শীতের ভয়ে অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে গুটিসুটি আধ-শোওয়া হয়ে ছিলেন, তেমনি রয়েছেন। সাড়াশব্দ নেই। ঘরের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তিকর হাওয়া থমথম করছে। বাইরে কতকগুলো কুকুর কেন যে এই বাড়িটা লক্ষ্য করেই ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করতে লাগল কে জানে!
ঘরে এই মুহূর্তে মহীতোষবাবু আর ধূর্জটিবাবু ছাড়া অন্য কেউ নেই। তবে কেন কুকুরগুলো
না, ঘরে আরো একজন কখন নিঃশব্দে এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে মহীতোষবাবুর কথা শুনছে কেউ তা খেয়াল করেনি।
কে? ও লক্ষ্মণ। মহীতোষবাবু যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। দে তো বাবা, জানলাগুলো বন্ধ করে। বড্ড ঠাণ্ডা বাতাস আসছে।
লক্ষ্মণ কোনো উত্তর দিল না। দৈত্যের মতো বিরাট চেহারা নিয়ে ধুপ ধুপ করে পায়ের শব্দ তুলে জানলাগুলো বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে চলে গেল।
তারপর
কি মশাই, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি?
বলে যান। মুখ না তুলেই কফ-জড়ানো স্বরে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন ধূর্জটিবাবু।
তারপর থেকে প্রায়ই রাত দুপুরে দরজায় শব্দ। মহীতোষবাবুকে উঠতে হতো। দেখতেন দরজার বাইরে ভৈরব দাঁড়িয়ে।
একদিন বিরক্ত হয়ে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতে গিয়েছিলেন। উঃ ভৈরবের সে কী রাগ! কী দৃষ্টি! চোখ দুটো যেন হলদে বোতামের মতো অভিব্যক্তিশূন্য অথচ ভয়ঙ্কর। মনে হচ্ছিল তক্ষুণি বুঝি মহীতোষবাবুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ছটা আঙুল দিয়ে টুটি চেপে ধরবে।
বাধ্য হয়ে মহীতোষবাবুকে বাড়ি বদলাতে হলো। কিন্তু সেখানেও ভৈরব হাজির। এমনি করে যেখানেই যান ভৈরবের হাত থেকে নিষ্কৃতি পান না। একদিন তো সবে সন্ধ্যেবেলা– লোডশেডিং। বাড়ি ফিরছিলেন মহীতোষবাবু। দেখলেন গলির মুখে ভৈরব কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। এখন আর নাম ধরে ডাকে না। শুধু ওর সেই ভয়ঙ্কর হলুদ বোতামের মতো চোখ দিয়ে যেন গিলতে আসে।
তাই, শেষ পর্যন্ত বলতে পারেন একেবারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। কী বলব মশাই, ভৈরবের ভয়ে রাতে ঘুমুতে পারতাম না। এখানে এসে মনে হচ্ছে নিস্তার পেয়েছি।
গল্প আমার এখানেই শেষ। বলে মহীতোষবাবু একটা সিগারেট ধরালেন। আরামে একটা সুখটান দিলে বললেন, এসব কথা কাউকে বলিনি–বলতে চাই না। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। নেহাৎ আপনি
কথা শেষ হলো না মহীতোষবাবুর। তাঁর মনে হলো ঘরটা যেন হঠাৎ কুয়াশায় ভরে উঠছে।
