একদিন বলল, খুব ইচ্ছে করে তিব্বত যেতে। ওখানকার লামারা নাকি প্রেসিদ্ধ। মহী ভাই, চনা, তোতে আমাতে একবার তিব্বত ঘুরে আসি।
শোনো কথা! তিব্বত যেন এপাড়া-ওপাড়া! শুধু গিয়েই, কদিন থেকে ফিরে আসা।
চল না মহী! লেখাপড়া শিখে ভালো ছেলে হয়ে বাড়ি বসে থেকে কি হবে। তার চেয়ে যদি প্রেতসিদ্ধ হতে পারিস তাহলে দুনিয়ার সবকিছু চলে আসবে এই হাতের মুঠোয়।
এসব কথায় মহীতোষ সাড়া দিতে পারতেন না। ভৈরবের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে শেষ পর্যন্ত এড়িয়ে যেতে লাগলেন। ছুটি হতে না হতেই তিনি ছুটে বাড়ি পালাতেন।
একদিন ভৈরব মহীতোেষকে একা পেয়ে ওঁর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ওর ডান হাতে একটা বাড়তি ছোট আঙুল ছিল। সেটা আবার ছুরির ফলার মতো বাঁকা। দেখলে গা শিউরে উঠত। সেই বেঁটে আঙুলটার তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে মহীতোষের হাতে দাগ কেটে দিয়ে বলল, কিরে! আমায় এড়িয়ে যাচ্ছিস? কিন্তু মনে রাখিস, আমায় দূরে ঠেলে দিলেও আমার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবি না। আমি তোকে কাছে টানবই।
ছেড়ে দে ভাই, আমায় ছেড়ে দে। বলে কোনোরকমে সেদিন মহীতোষ ওর হাত ছাড়িয়ে পালিয়েছিলেন।
আবার একদিন পাকড়াও করেছিল ভৈরব। বলেছিল, তুই না যাস আমি একাই তিব্বত যাব। সেখানে যদি মরেও যাই তবু তোকে দেখা দেবই। আমার গুরু বলেন প্রেত-আত্মা খুব ইচ্ছে করলে দেহ ধারণ করে কিছুক্ষণের জন্যে দেখা দিতে পারে। তবে তার জন্যে আত্মাকে প্রচণ্ড কষ্ট পেতে হয়। মুক্তিও আটকে যায়। তা যায় যাক, তবু তোর সঙ্গে দেখা করতে আসব।
এই পর্যন্ত বলে ভৈরব একটু থেমেছিল। তারপর বলেছিল, তবে একটা কথা, দেখা করতে এলে তুই যদি আমায় অপমান করিস, আমায় তাড়িয়ে দিস তাহলে বন্ধু বলেও খাতির করব না। তোকে মেরে আমার সঙ্গী করে নেব।
মহীতোষ তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন।
বল, কথা দে, দেখা দিলে কাছে ডাকবি?
নিষ্কৃতি পাবার জন্যে মহীতোষ তাড়াতাড়ি বলেছিলেন, এখুন মরা-টরার কথা কেন ভাই? এখনও ঢের সময় আছে।
ভৈরত দাঁতের ফাঁকে হেসে বলেছিল, তা আছে। কিন্তু ঐ আর কি যদি-র কথা বললাম। বল, দেখা করতে এলে ফিরিয়ে দিবি না।
না।
প্রতিজ্ঞা?
হ্যাঁ, প্রতিজ্ঞা।
আমায় তখন দেখলে চিনতে পারবি তো? ডান হাতে এই আঙুল–বলে ডান হাতটা মুখের কাছে তুলে ধরেছিল। অমনি ওর ঐ ক্ষুদে আঙুলটা তিরতির করে কাঁপতে লেগেছিল। আর কপালের বাঁ দিকে এই কাটা দাগ। মনে থাকবে তো?
হ্যাঁ ভাই, থাকবে। খুব থাকবে। বলে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছিলেন।
এরপর হঠাৎই একদিন ভৈরব বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ। আর তার খোঁজ পাওয়া গেল না।
হঠাৎ ঘরের মধ্যে একরকম ছুটেই ঢুকলেন মহীতোষবাবুর স্ত্রী। তার মুখে-চোখে ভয়ের ছাপ, ছাদে কিসের শব্দ হচ্ছে!
মহীতোষবাবুও চমকে উঠলেন।
ছাদে শব্দ?
হ্যাঁ, শোনো।
মহীতোষবাবু কান পাতলেন। খুব মৃদু একটা শব্দ। কে যেন ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মহীতোষবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ছাদে কে?
উত্তর পেলেন না। শব্দটা থেমে গেল। একটা পরে লক্ষ্মণ এসে দাঁড়ালো। সে জানাল, ছাদে একটা খারাপ ধরনের পাখি বসেছিল। সেটাকে ও তাড়াতে গিয়েছিল।
তবু ভালো।
পরক্ষণেই মহীতোষবাবু ভাবেন, তাই বা কেন? এত দিন পর হঠাৎ খারাপ পাখি কোথা থেকে এল?
এত যে কাণ্ড হচ্ছে পরম ধৈর্যবান শ্রোতাটির মধ্যে কিন্তু কোনো চাঞ্চল্য নেই। সেই যে অন্ধকারে মুখ আড়াল করে গল্প শুনে যাচ্ছিলেন, টু শব্দটি নেই। বোধ হয় ঘটনাটা তার ভালোই লাগছে।
.
তারপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে–মহীতোষবাবু আবার তার কাহিনী শুরু করলেন। ভৈরবের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। তখন তিনি কলকাতার কাছাকাছি এক জায়গার থানার ও সি। একদিন একটা মার্ডার কেস এল। মহীতোষবাবু লাশ দেখলেন। প্রবল আক্রোশে কেউ লোকটাকে একেবারে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এমন তো কত লাশই দেখেছেন তিনি। কিন্তু কেন যে এই মৃতদেহটা দেখে থমকে গিয়েছিলেন তা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল।
মৃতের বয়েস বছর বাহান্ন-তিপ্পান্ন, কালো কুচকুচে রঙ। এই বয়েসেও পেশল চেহারা। নাক থ্যাবড়া। মুখটা যেন চেনা চেনা লাগল। তারপর ডান হাতে ছটা আঙুল দেখেই মহীতোষবাবু চমকে উঠেছিলেন। আঙুলটা আবার ছুরির ফলার মতো বাঁকা।
কপালের রক্তটা মোছো তো। হুকুম দিয়েছিলেন একজন কনস্টেবলকে। রক্তের ছোপ মুছে ফেলতেই দেখা গেল কাটা দাগ। বুঝতে বাকি রইল না এ তার সেই ছোটবেলাকার ক্লাস ফ্রেন্ড ভৈরব। জানা গেল ও নাকি এ অঞ্চলের এক কুখ্যাত সমাজবিরোধী। নিজেদের মধ্যে রেষারেষির জন্যেই প্রাণ হারিয়েছে।
ভৈরব যে তার চেনা মহীতোষবাবু তা প্রকাশ করলেন না। লাশ পোস্টমর্টেমের জন্যে পাঠিয়ে বাসায় ফিরে এলেন। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, একদিন যে প্রেতসিদ্ধ হবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল, শেষ পর্যন্ত সে হয়ে গেল কিনা একটা ডাকসাইটে সমাজবিরোধী।
যাই হোক এই খুনের তদন্তের ভার পড়েছিল মহীতোষবাবুর ওপরেই। কোথায় কোথায় ভৈরব থাকত, তার দলে আর কে কে আছে, কেই বা ওকে খুন করল এইসব তদন্ত শুরু করতে হলো। কিন্তু বিশেষ কোনো ক্ল পাওয়া গেল না। তা ছাড়া এইসব সমাজবিরোধীদের খুনের কেস নিয়ে মাথা ঘামাবার ইচ্ছেও তার বিশেষ ছিল না। কেসটা ক্রমে ধামা চাপা পড়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে তাঁর জীবনে একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
