[শারদীয়া ১৪১৬]
» ভৈরব
ছোটনাগপুরের পাহাড়-ঘেরা এই ছোট্ট জায়গাটায় সেদিন যেন ধূসর সন্ধ্যা কেমন একরকম গা-ছমছম-করা রহস্যময় রোমাঞ্চ নিয়ে নেমে এসেছিল।
এমনটা অন্যদিন হয় না। অন্যদিনও এই সময় ধূর্জটিবাবু সর্বাঙ্গে গরম চাদর জড়িয়ে, হাতে দস্তানা পরে টাক মাথার উপর মাংকি-ক্যাপ চাপিয়ে লাঠি ঠুকঠুক করে এসে বসেন। এখন সবে অক্টোবরের মাঝামাঝি। শীত পড়েনি, পড়ব পড়ব করছে। এখনই ঐ কচি শীতের বিরুদ্ধেই ধূর্জটিবাবুর এই রণসাজ। তার এই শীতবস্ত্রের বর্ম দেখে মহীতোষ মজুমদারের স্ত্রী হাসেন। কিন্তু যাঁকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা তিনি নির্বিকার। তাঁর কোনো লজ্জা-সংকোচ নেই। মহীতোষবাবু এক সময়ে পুলিশ অফিসার ছিলেন। অসময়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানে এসে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। তাঁর পুলিশি জীবনের নানা ঘটনা শুনতে ধূর্জটিবাবু ভালোবাসেন। সেই লোভে এই কদিন ধরে রোজ সন্ধ্যাবেলা উনি এখানে আসেন।
কেন যে মহীতোষবাবু পুলিশের চাকরির মতো লোভনীয় কাজ রিটায়ার করার আগেই ছেড়ে দিয়েছিলেন সে কথা একমাত্র বাড়ির লোক ছাড়া আর কাউকে বলেননি। কেননা বললেও তা কেউ বিশ্বাস করবে না। শুধু চাকরি ছাড়াই নয়–একেবারে দেশ ছাড়া হতে হয়েছিল।
এখানে উনি এসেছেন মাস ছয় হলো। শান্ত, নিরিবিলি জায়গা। ভদ্রলোকের বাস তেমন নেই। কেননা শহর বলতে যা বোঝায় তা এখান থেকে ক্রোশখানেক দূরে। মহীতোষবাবুর বাংলোর অল্প দূরে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি। ঐ একটিই দোতলা বাড়ি। ওপরের জানালাগুলো সব সময়েই বন্ধ। একতলায় লোক থাকে। তারা বাঙালী নয়, মিশুকেও নয়। তবে কয়েক দিন হলো ধূর্জটিবাবু নামে বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি ঐ বাড়িতে এসেছেন। তিনি নিজেই এসে মহীতোষবাবুর সঙ্গে আলাপ করেছেন।
উনি অবশ্য সকালের দিকে আসেন না। বিকেলেও শীতের ভয়ে বড়ো একটা দূরে কোথাও যান না। ঠাণ্ডার ধাত। একটুতেই নাকি বুকে কফ জমে, গলা বসে যায়। তিনি অল্প কথা বলেন, তবু বিদেশে এই বাঙালী অতিথিকে পেয়ে মহীতোষবাবু ও তার স্ত্রী খুব খুশী।
স্বামী-স্ত্রী ছাড়া এ বাড়িতে আর একজন আছে। তার নাম লক্ষ্মণ। লম্বা-চওড়া, যাকে বলে দশাসই চেহারা–তাই। কুচকুচে কালো রঙ। আর পাথরের মতো বোবা। কাজ করে অসুরের মতো। ভোরবেলা আসে। কাজ করে রাতের খাবার নিয়ে চলে যায় নদীরে ওপারে। ধূর্জটিবাবু ওকে প্রথম দেখেই আঁৎকে উঠেছিলেন। ফিসফিস করে বলেছিলেন, ঐ লোকটার কাছ থেকে সাবধান থাকবেন মশাই। আমি বলছি, ও মানুষ খুন করতে পারে।
এ কথা শুনে মহীতোষবাবুর স্ত্রী শিউরে উঠেছিলেন, কিন্তু এক সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহীতোষবাবু ভয় পাননি। ভয় পেয়েই বা কি করবেন। সন্দেহ করে না হয় ছাড়িয়ে দিলেন। তারপর লোক পাবেন কোথায়?
রোজ সন্ধ্যেবেলা ধূর্জটিবাবু এসে মহীতোষবাবুর কাছে তার পুলিশি জীবনের যত খুন খারাপির গল্প ছেলেমানুষের মতো শোনেন। লণ্ঠনের আলো থেকে চোখ আড়াল করার জন্যে উনি একটা কিছু বই কিংবা কাগজ চিমনির গায়ে ঠেকিয়ে রাখেন। একটা ঘটনা বলা শেষ হয়ে গেলে উনি নাকে কেমন একটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করেন। অর্থাৎ ঘটনাটা তার পছন্দ হলো না। অন্য ঘটনা শুনতে চান। যেন তিনি কোনো বিশেষ ঘটনা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সময়ে সময়ে মহীতোষবাবুর মনে হতো ধূর্জটিবাবু হয়তো বা কোনো ছদ্মবেশী লেখক–প্লট খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
শেষে আজ মহীতোষবাবু তাঁর জীবনের সেই একান্ত গোপনীয় রোমাঞ্চকর কাহিনীটা বলতে শুরু করলেন, যে কাহিনীর নায়ক দুটি স্কুলের ছাত্র–মহীতোষ আর ভৈরব।
কাহিনী শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন যেন কতকগুলো অশুভ লক্ষণ দেখা দিল। দেওয়ালে একটা ছবি টাঙানো ছিল সেটা হঠাৎ ঝনঝন করে পড়ে ভেঙে গেল। এই সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির ছাদে কি একটা পাখি বিশ্রী শব্দে ডেকে উঠল। সে ডাক শুনে মহীতোষবাবুর মতো লোকও চমকে উঠলেন। তার পরই মনে হলো যেন প্রচণ্ড ঝড় উঠছে। তিনি জানলার কাছে। গিয়ে দাঁড়ালেন, কিন্তু কালিঢালা অন্ধকার আকাশ ছাড়া ঝড়ের কোনো লক্ষণই দেখতে পেলেন না।
এসব কি হচ্ছে? মনে মনে মহীতোষবাবু যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বললেন না। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে তিনি গল্প বলতে শুরু করলেন।
ভৈরব ছিল তাঁর ইস্কুলের বন্ধু। একই সঙ্গে পড়তেন তারা। কতই বা বয়েস হবে তখন, তেরো-চোদ্দ? ভৈরব ছিল একটু অদ্ভুত প্রকৃতির। তার স্বভাবের সঙ্গে মহীতোষের স্বভাবের কোনো মিল ছিল না। তবু ভৈরব কেন যে মহীতোষকে খুব ভালোবাসত তার কারণ অজানা।
পড়াশোনায় ভৈরবের মন ছিল না। ঐ বয়েসেই সে তুকতাক, ঝাড়ফুঁক শেখার জন্যে গ্রামে গ্রামে ঘুরত। ওঝাদের বাড়ি গিয়ে বসে থাকত। সে ওঝারা সাপের ওঝা নয়, ভূত ছাড়াবার ওঝা।
ওর চেহারাটাও ছিল তেমনি। কালো ষণ্ডাগণ্ডা। ছোট করে কাটা চুল। সে চুলে কখনও তেল পড়ত না। আর চোখ দুটো ছিল পাথরের চোখের মতো নিষ্প্রাণ। ঐ চোখের দিকে তাকিয়ে মাস্টারমশাইরা পর্যন্ত ওর সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না।
এমন ছেলেকে কেউ ভালোবাসতে পারে না। মহীতোষও পারতেন না। কিন্তু ছুটির পর ভৈরব একরকম জোর করে মহীতোষকে টেনে নিয়ে যেত নির্জন জায়গায়, বিশেষ করে শ্মশান কিংবা কবরখানায়। সেখানে বসে ও যে সব কথা মহীতোষকে শোনাতো তাতে বেচারি মহীতোষের রক্ত জল হয়ে যেত। যেমন ও বলত ও নাকি ভূত নামানো প্রায় শিখে ফেলেছে। অমুক গ্রামের অমুক ওঝা ওর গুরু।
