ইচ্ছে করেই সন্ধের পর বেরিয়ে ছিলাম। কারণ লোকের সামনে বড়ো একটা বেবরাতে চাই না। সবাই কেমন যেন অবাক হয়ে আমায় দেখে। ভালো লাগে না। কিন্তু তবু নিস্তার নেই। অন্ধকারে রাস্তায় বেরোতেই গোটাকতক কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এল। এই বুঝি কামড়ে দেয়।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বুল্টুদের বাড়ি পৌঁছলাম। বুল্টু বাইরের ঘরে বসে ওর বাবার কাছে পড়ছিল। একা বুল্টু থাকলেই খুশি হতাম। যাই হোক এসেছি যখন বুল্টুকে দূর থেকেই দেখে যাই।
সেই মতো আমি নিঃশব্দে রকে উঠে জানলা দিয়ে উঁকি মারলাম। বুল্টু আমায় দেখতে পেল না। তখন সাহসে ভর করে ডাকলাম–বুল্টু–
বুল্টু চমকে উঠল। তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে যে আঁৎকে উঠল। চিৎকার করে বাবা গো? বলেই ভেতরে চলে গেল। আমি কতবার বুল্টু বুল্টু করে ডাকলাম। কিন্তু ও আর আমার সঙ্গে দেখা করল না। ওর বাবা আমায় রীতিমতো ধমক দিয়ে বললেন, শোনো, তোমায় দেখে বুল্টু যখন এত ভয় পায় তখন এ বাড়িতে আর এসো না। লজ্জায়, দুঃখে আমি মাথা নিচু করে পালিয়ে এলাম। ঠিক করলাম, বুল্টুর সামনে আর কোনদিন যাব না।
কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারলাম না।
.
কদিন পর।
তখন সন্ধে হয়-হয়।
আমি আমার ঘরটিতে বসে আছি, দরজা-জানলা বন্ধ করে।
হঠাৎ রাস্তায় হল্লা, ধর–ধর–ছেলেধরা।
চমকে উঠলাম। ছেলেধরা এল কোথা থেকে?
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শংকর এসে ঘরে ঢুকল। চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, বুল্টুকে ছেলেধরার দল ধরে নিয়ে গেল!
চমকে উঠলাম–অ্যাঁ! বলিস কী? কখন?
এখনই।
ওর বাড়িতে জানে?
হ্যাঁ, কান্নাকাটি করছে।
আমি আর বাড়িতে বসে থাকতে পারলাম না, যে অবস্থায় ছিলাম সেই অবস্থাতেই ছুটলাম।
ছোটো তো নয় উড়ে যাওয়া।
শরীরটা অসম্ভব হাল্কা মনে হচ্ছে। মাটিতে যেন পা ঠেকছেই না। দুরন্ত গতি।…..রাস্তার লোক হাঁ করে দেখছে।
কিন্তু আমার এদিক-ওদিক তাকাবার ফুরসৎ নেই। যেমন করে হোক বুল্টুকে উদ্ধার করতেই হবে। আমার পায়ে যেমন ঝড়ের গতি, শরীরে তেমনি অলৌকিক বল। মিনিট পনেরো পর ধরে ফেললাম গাড়িটিকে।
গাড়িতে জনাচারেক লোক ছিল। আমাকে ছুটে আসতে দেখে তারা অবাক হল। তারা তো জানে না যখন আমার এই শরীরে অলৌকিক শক্তি ভর করে তখন আমাকে কেউ আটকাতে পারে না। দেখলাম গাড়ির মধ্যে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে বুল্টু।
একটা অস্বাভাবিক হুংকার দিয়ে রুখে দিলাম গাড়িটা। তারপর চারজন ছেলেধরাকে কাবু করে বুল্টুকে কাঁধে করে বাড়িতে পৌঁছে দিলাম।
.
জীবনে এই একটা ভালো কাজ করতে পারলাম।
কিন্তু
কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হল একা আমার পক্ষে?
এটা যদি সত্যিই অলৌকিক ব্যাপার হয় তা হলে প্রশ্ন জাগে কোথা থেকে পেলাম এই শক্তি? কে জোগাল?
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একজনের কথা মনে হল–সে আত্রেয়ী।
জানি সে বহুকাল আগে মৃত। মৃত্যু হলেই কি সব শেষ হয়ে যায়?
যায় না। তার বহু প্রমাণ আমি পেয়েছি।
আত্রেয়ী নিজেই তার প্রমাণ দিয়েছে এই সেদিনও।
তার দেহ যে আমার এই বাড়ির নীচেই পোঁতা আছে আমি জানি। সে গত রাত্রে হঠাৎ কেন দেখা দিয়েছিল? কেন দিয়েছিল?
না, আমাকে ভয় দেখাতে নয়। মনে হয় শুধু এই কথা জানাতে চায়, সে আমার কাছেই আছে। এ বাড়িতে তার একটা নতুন আকর্ষণ হয়েছে। সে আকর্ষণ বুল্টু আর তার বন্ধুরা। এও বলেছিল, আমি যেন আমার শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে না ভাবি।
এখন মনে হচ্ছে বিকেলে যখন ওরা খেলা করত তখন মাঝে মধ্যেই কোথাও নূপুরের শব্দ শোনা যেত। মনে হত কেউ যেন নূপুর পরে হালকা পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের সঙ্গে খেলছে। কিন্তু তাকে দেখা যায় না।
আত্রেয়ী ছিল ছেলেমানুষ। তাই ছোটো ছেলেমেয়েদের ভালোবাসত। বুল্টুরা যখন ছাদে খেলা করত তখন আত্রেয়ীও যে অলক্ষে সেখানে এসে দাঁড়াত তা আজ বোঝা যাচ্ছে।
কতদিন শোনা গেছে আমার ঘর থেকে নূপুর পায়ে দিয়ে কেউ যেন ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই কি বুল্টুর বিপদে ওকে বাঁচাবার জন্যই আত্রেয়ীর আত্মা আমার ওপর ভর করে ছেলেধরার হাত থেকে বুল্টুকে বাঁচিয়ে দিল?
সঠিক উত্তর জানা না গেলেও এই মুহূর্তে আত্রেয়ীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে উঠল। মনে মনে বললাম, আত্রেয়ী, তুমি যেখানেই থাক যেভাবেই থাক আমার নমস্কার নিও। প্রার্থনা করি, বুল্টুকে রক্ষা করে তুমি যে মহৎ কাজ করলে তার জন্য পরমেশ্বর তোমার। এই অভিশপ্ত জীবন থেকে তোমায় মুক্তি দেবেন।
সেদিনই রাত তখন গভীর।
হঠাৎ ঘরের মেঝে কেঁপে উঠল। তারপর মেঝের একটা অংশ ফেটে গেল। আর সেইখান দিয়ে খানিকটা সাদা ধোঁয়া হুশ করে বেরিয়ে এল। তারপর পাক খেতে খেতে জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
.
পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। তাকিয়ে দেখি পুবের জানলা দিয়ে আসা ঝলমলে আলোয় ঘর ভরে আছে। একটু পরেই শংকর গরম চা আর টোস্ট নিয়ে ঢুকল। আমি হাসিমুখে উঠে বসলাম।
শংকর আমার হাতে চা তুলে দিয়েও আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জিগ্যেস করলাম, কী দেখছিস?
ও উত্তর দিল না। শুধু টেবিলের ড্রয়ার থেকে ছোট আয়নাটা এনে আমার হাতে দিল।
কী রে, হঠাৎ আয়না দিচ্ছিস?
দেখুন!
দেখলাম। মুখে আমার সেই বীভৎস দাগ আর নেই। সব মিলিয়ে গেছে। বুল্টুকে আয়েত্রী উদ্ধার করেছিল আমার মধ্যে দিয়ে। আর মুক্তি পাবার পর সে আমায় মুক্ত করে দিয়ে গেল আমার ভয়ঙ্করতম সমস্যা থেকে। আমি আবার আগের মতো হয়ে গেছি। বুল্টুরা আর আমায় দেখে ভয় পায় না। নিয়মিত খেলে। এর পরেও কি আমি বিশ্বাস করব না–ভূত বলে সত্যিই কিছু আছে! আমি তো আমার জীবনেই তা প্রমাণ পেয়েছি। যতদিন আয়েত্রীর আত্মার ভর আমার ওপর ছিল ততদিন আমি অন্য মানুষ ছিলাম। মুখটা হয়ে উঠেছিল কদাকার। এরপর হয়তো চেহারাটাও হত। আমার প্রার্থনায় আয়েত্রী মুক্তি পেল। আমাকেও মুক্তি দিয়ে গেল।
