অধৈর্য হয়ে নকুলকে পাঠালাম পাদ্রীবাবার বাড়িতে। কিছুক্ষণ পর ফিরে নকুল জানাল উনি বাড়ি নেই। তালা বন্ধ।
অবাক হলাম। সাধারণত উনি বিশেষ কোথাও যান না। যাবার জায়গাও নেই। তা হলে আজ এই সাত-সকালে দরজায় তালা দিয়ে কোথায় গেলেন?
এমন ভয়ও হল চারু ওঁর কোনো বড় রকমের ক্ষতি করে দেয়নি তো?
এইসব আবোল-তাবোল নানা কথা যখন ভাবছি তখন বাড়ির দরজায় একটা রিকশা এসে দাঁড়াল। আর পাদ্রীবাবা হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এসে দাঁড়ালেন আমার কাছে। উত্তেজিত ভাবে বললেন, বলুবাবু ভাই, আর একটা রিকশা নিয়ে চলুন আমার সঙ্গে।
অবাক হয়ে বললাম, এই রোদ্দুরে–কোথায়? আপনি যে বলেছিলেন কী করতে হবে তার পরামর্শ দেবেন।
পাদ্রীবাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, আর সময় নেই। এখনই কবরখানায় গিয়ে আপনার বন্ধুর হাড়গোড় যা পাওয়া যায় তা তুলতে হবে।
সে আবার কী?
পাদ্রীবাবা ধমক দিয়ে বললেন, কথা পরে। ঐ রিকশাটা দাঁড় করান।
নকুল কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। বলল, দাদা, আমি যাব না?
পাদ্রীবাবা বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাবে। দরজা বন্ধ করে চটপট উঠে পড়ে।
ইতস্তত করে বললাম, কিন্তু কবর থেকে মৃতদেহ তুলতে গেলে তো অনেক হাঙ্গামা পারমিশান-টারমিশান…
ও নিয়ে ভাববেন না। যা-যা-করার সব করে নিয়েছি। একটা অসুবিধা ছিল চারুর ফ্যামিলির পারমিশান নেওয়া। ওর সাবেক বাড়িতে গিয়ে জানলাম চারুর আত্মীয়স্বজন কেউ নেই।
কবরস্থানে এসে যখন পৌঁছলাম মাথার ওপর তখন মধ্যাহ্নের রোদ গনগন করছে। দেখলাম জিপভর্তি আর্মড পুলিশ আগেই এসে গেছে। চার্চের চত্বরে বসে আছে ঝুড়ি, কোদাল, শাবল নিয়ে জনা চারেক কবর খোঁড়ার লোক। একটু পরেই এসে পড়লেন মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান যিনি তাঁর মোটা শরীর আর বিশাল ভুড়ি নিয়ে রিকশা থেকে নেমেই একটু বিরক্তির সঙ্গে পাদ্রীবাবাকে জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার বলুন তো মিস্টার অ্যান্টনি? আজকের দিনেও ভুত-প্রেত বিশ্বাস করতে হবে নাকি?
পাদ্রীবাবা বললেন, এতদিন বিশ্বাস করার প্রশ্ন ওঠেনি। আজই উঠেছে।
হ্যাঁ, যা শুনলাম তা সত্যি হলে তো সাংঘাতিক ব্যাপার মশাই! আবার হানা দেবে নাকি?
পাদ্রীবাবা হেসে বললেন, যাতে আর সে-সুযোগ না পায় তার জন্যেই আজকের এই ব্যবস্থা।
এখন কী করতে চান? জিগ্যেস করলেন চেয়ারম্যান।
পাদ্রীবাবা বললেন, এখানেই একটি কবরে কুড়ি বছর ধরে শুয়ে আছে চারু বিশ্বাস। তার দুরন্ত আত্মা আজও শান্তি পায়নি। এই বলুবাবুর ওপর পূর্বজীবনের রাগ পুষে রেখে তাকে মারবার চেষ্টা করছে। এই কবর থেকেই দরকার মতো উঠে এসে হানা দেয় বলুবাবুর বাড়ি। কাল সন্ধেবেলায় আমি স্বচক্ষে যা দেখেছি তা ভয়ংকর।
চেয়ারম্যান বললেন, হ্যাঁ, শুনেছি। তা কী করবেন?
তার অপবিত্র দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলব। তাহলেই আর হানা দেবার কেউ থাকবে না।
কিন্তু এমনও তো হতে পারে আপনার ধারণাটা ঠিক নয়। শুধু শুধু একটা সাধারণ দেহাবশেষ তুলবেন। সে কংকালটা চারু বিশ্বাসের হতে পারে। কিন্তু তা যে প্রেতযযানিপ্রাপ্ত তার প্রমাণ দিতে পারবেন?
পাদ্রীবাবা গম্ভীরভাবে বললেন, কাউকে প্রমাণ দেবার জন্যে আমি নাটক করছি না। আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে যা কর্তব্যবোধ করছি তাই করতে যাচ্ছি। যদি না করি–একদিনও দেরি করি–তা হলে ঐ ভদ্রলোকের প্রাণসংশয় হবেই।
হঠাৎ এই সময়ে আকাশে ধোঁওয়ার মতো মেঘ জমে সূর্যকে ঢাকা দিয়ে দিল।
পাদ্রীবাবা চেঁচিয়ে উঠলেন, কুইক কুইক শীগগির কবর খুঁড়ে ফেলো। ও জানতে পেরেছে।
কবর তো খুঁড়বে কিন্তু কোনটা চারু বিশ্বাসের কবর তা তো বোঝবার উপায় নেই। সে সময়ে কবর কেউ বাঁধিয়ে রাখেনি। কুড়ি বছর পর
হ্যাঁ গো, বলুবাবু, আপনার বন্ধুর কবর কোনটা চিনতে পারেন?
পরপর ধসে যাওয়া মাটির গর্তগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি মাথা নাড়লাম।
বললাম, কুড়ি বছর কম সময় নয়। তাছাড়া এতদিন এখানে আমার দরকার হয়নি। জায়গাটার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবে মনে আছে একটা গাছের নীচে
আসুন দেখি।
পাদ্রীবাবার সঙ্গে ঝোপঝাপ ঠেলে কবরগুলো দেখতে দেখতে চললাম। ওঁর দৃষ্টি কবরের দিকে। আমি লক্ষ করছি ধারে তেমন কোনো পুরোনো গাছ আছে কিনা।
একটা কবরের কাছে এসে পাদ্রীবাবা থামলেন। হেট হয়ে মাটি পরীক্ষা করলেন। তারপর গভীর নিশ্চয়তার সঙ্গে বললেন, এইটাই—
আমি অবাক হয়ে পাদ্রীবাবার দিকে তাকালাম। পাদ্রীবাবা হেসে বললেন, কী বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা, পাশাপাশি অন্য কবরগুলো লক্ষ করুন। এর মাটিগুলো ঢিলেঢালা। কেউ যেন মাটিগুলো মাঝে মাঝে সরায়।
শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিল। তাহলে এই কবর থেকে কফিন খুলে, মাটি ঠেলে, উঠে আসে চারু!
চেয়ারম্যানবাবু কখন পিছনে এসে নাকে রুমাল চেপে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কবরের মাটি ছুঁলেন, মিস্টার অ্যান্টনি! বলিহারি যা হোক!
পাদ্রীবাবা হাসলেন। বললেন, কবরের মাটি খুবই পবিত্র। শেষ পর্যন্ত ঐখানেই তো আমাদের গতি! আরে! অন্ধকার হয়ে এল যে!
দেখতে দেখতে কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল।
পাদ্রীবাবা ব্যস্ত হয়ে বললেন, মাটি তোলো, আর দেরি নয়। এখুনি ঝড় উঠে সব লণ্ডভণ্ড করে দেবে।
তখনই একসঙ্গে কোদাল, শাবল, গাঁইতি কবরটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। দশ মিনিটের মধ্যেই শাবলের ঘা লাগল কফিনের গায়ে। আর তখনই উঠল ঝড়। চারিদিক ধুলোয় ধুলো।
