কদিন আর আয়না হাতে করলাম না। যা হচ্ছে হোক ভেবে নিয়ে চোখ বুজিয়ে রইলাম। ঘর থেকেও বেরোলাম না। বুল্টুরা নিজেরা খেলা করে বাড়ি চলে যায়। আমার সঙ্গে আর দেখা করে না। গল্প শুনতেও চায় না।
তারপর একদিন বিকেলে বিছানা থেকে জাম্প দিয়ে নেমে পড়লাম। ওরা এসেছিল সেদিন। ছেলেরা হঠাৎ আমার মতো আধবুড়ো একজন মানুষকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে চমকে উঠল। বুঝলাম আমাকে দেখে ওরা ভয় পেয়েছে। খুব মজা লাগল। তারপর আমি, এত বড়ো মানুষটা, ছাদে ছোটাছুটি শুরু করলাম। ছেলেরা আমায় এরকম করতে দেখে চেঁচামেচি করে ছুট লাগলো। আমি খুব জোরে হেসে উঠলাম। জীবনে কখনো বোধহয় এত জোরে হাসিনি।
.
সেদিন দুপুরবেলা
রাস্তায় হঠাৎ হইহল্লা। এর আগে আমার বাড়ির কাছে কোনোদিন হইহল্লা তো দূরের কথা দু-চারজন মানুষকে একসঙ্গে গলা উঁচু করে কথা বলতেও শোনা যায়নি। তো আজ হঠাৎ হল্লা কেন?
উঠে গিয়ে দাঁড়ালাম রাস্তার দিকের জানালায়। দেখলাম বুল্টুর বাবা রমণীবাবু কয়েকজনের সঙ্গে কী নিয়ে আলোচনা করছে। সবার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।
এদের আবার কী হল? কৌতূহল চেপে বিছানায় গিয়ে বসলাম। হয়েছে ভালো। নিজেকেই জিগ্যেস করলাম, বুল্টুর বাবার মতো আমিও কেন রাস্তায় গিয়ে ওদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারি না? এরও কোনো উত্তর নেই।
যাই হোক, কী হয়েছে বিকেলে জানা যাবে। বিকেল পর্যন্ত আমায় অপেক্ষা করতেই হবে।
ঠিক করেছিলাম বিকেলে বুল্টুরা এলে ওদের মুখ থেকেই শোনা যাবে। কিন্তু বুল্টুরা এলই না। তবে শংকর জানাল, গতকাল বুল্টুর এক বন্ধু বিকেলে খেলতে বেরিয়ে আর বাড়ি ফিরে আসেনি। যেখানে যেখানে যাওয়া সম্ভব সর্বত্র খোঁজ করা হয়েছে। কিন্তু কেউই বলতে পারেনি। তা সে তো গতকালের ব্যাপার। আজ আবার ওদের হল কী?
একটু দেরি করেই এল মাত্র দুজন–গোপাল আর কেষ্ট। বেশিক্ষণ থাকল না। জিগ্যেস করলাম, আর সবাই কোথায়?
গোপাল বলল, জানি না।
ওরা ঘরে ঢোকার পর থেকেই পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিল। তারপরেই চলে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল।
বললাম, তোমরা এখনই চলে যাচ্ছ?
হ্যাঁ। বলেই নীচে নেমে গেল। কেন, কিছুই বুঝলাম না।
কদিন পর।
আমি হঠাৎ আবার এমন একটা কাণ্ড করে বসলাম যে নিজেই আবাক। আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল একটা বাঁশ গাছ। তার একটা ডাল (কঞ্চি) বাড়তে বাড়তে আমাদের ছাদ পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিল। একেবারে নাগালের মধ্যে। দেখে খুব ইচ্ছে করল, ডালটা ধরে ঝুলে পড়ি। মারলাম লাফ। অত বড়ো গাছটা কেঁপে উঠল। আমার খুব মজা লাগল। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি রাস্তায় লোক জমে গেছে। তারা অবাক হয়ে আমার কাণ্ডকারখানা দেখছে।
এবার আমি যখন শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে মাটিতে লাফিয়ে পড়লাম তখন যারা দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল তারা সবাই ছুট লাগল। আমি হা হা করে হাসতে লাগলাম। একটু পরে নিজের অপকীর্তি দেখে নিজেকেই ধমকে উঠলাম।
আমি কি পাগল হয়ে গেছি!
.
০৫.
পাগল এখনও পুরোপুরি হইনি। তবে হতে বোধহয় দেরি নেই। বুঝতে পারি ক্রমশই আমি যেন কেমন হয়ে যাচ্ছি। কখন কী যে করে ফেলি তা বুঝতে পারি না।
অথচ আমি আগে তো এমন ছিলাম না। এ বাড়িতে এসে দাদামশাই-এর সেই খাতাখানা পড়ার পর থেকেই আমার পরিবর্তন শুরু। প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি। তারপর যেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ শুধু আমার বাড়ির আলো নিভে গেল আর বুল্টু ভয় পেল সেদিন থেকেই শুরু হল আমার পরিবর্তন। এত ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে লাগল যে আমি খেয়াল করতেও পারিনি। একেই বোধহয় বলে চিত্তবিকার। কোন একটি ইংরেজি বই-এ পড়েছিলাম যে খারাপ চিন্তা, খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে থাকতে সুস্থ মানুষও ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। অবশ্য সাইকিয়াট্রিক ট্রিটমেন্ট আছে। এখানে সেসব চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।
মনে হয়, একটানা ভৌতিক পরিবেশে থাকার ফলেই আমার এইসব অদ্ভুত পরিবর্তন। আর এর ফলে আমি ক্রমশই যেন অস্বাভাবিক হয়ে উঠছি।
এই যেমন ছুটে ঘরে ঢুকেও নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। দরজায় তো খিল দিয়েছিই। তিনটে জানলার সব কটাই বন্ধ করে দিয়েছি। তবু কেবল যেন শুনতে পাচ্ছি একদল লোক আমায় তাড়া করে আসছে। অথচ এও জানি বুল্টুকে ভয় দেখিয়ে চলে আসবার সময় একটা লোকও তাড়া করে আসেনি। ভাবতে ভাবতে আমার মাথার ভেতরে কেমন করে উঠল। দাঁড়িয়ে ছিলাম, মাটিতে বসে পড়লাম। তারপর একসময়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কতক্ষণ পর শুনতে পেলাম শংকরের ডাক।
দরজা খুলুন। খেতে দিয়েছি।
উঠলাম। দরজাও খুলে দিলাম। কিন্তু শরীরটা বড়োই দুর্বল। এসবই করছি যেন ঘোরের মধ্যে। লক্ষ করছিলাম বুল্টু যেন ইদানিং আমাকে এড়িয়ে চলছে। ও যেন আমায় কেমন ভয় পাচ্ছে।
আমার সবচেয়ে ক্ষতি হল যখন ও আমার বাড়ি আসা বন্ধ করে দিল। অন্য কেউ না আসুক তাতে কষ্ট নেই। কিন্তু বুল্টুকে আমি খুব ভালোবাসতাম, রোজ বিকেলে আমি ওর পথ চেয়ে থাকতাম।
কিন্তু যে প্রতিদিন আসত সে যখন আর একদিনও আসে না তখন বুঝলাম, ভুল করে ফেলেছি। বুল্টুকে ঐভাবে ভয় দেখানো উচিত হয়নি। একটা বোবা কান্নায় আমার বুক ফেটে যেতে লাগল।
শেষে আর পারলাম না। একদিন চলে গেলাম বুল্টুদের বাড়ি। অন্তত একটি বার বুকে চোখের দেখা দেখতে চাই। এ বাড়িতে এর আগে অনেকবার এসেছি। কিন্তু এবার আসাটা যেন অন্যরকম। মনে হচ্ছে কোনো অচেনা লোকের বাড়ি যাচ্ছি, এমন একজন যাকে ও বাড়ির লোকেরা এড়িয়ে চলতে চায়। তার জন্য তাদের অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। আমার চেহারাটাই যে বদলে গেছে।
