তা হলে গেল কোথায়?
তাই তো ভাবছি। বলতে বলতে শংকর এগিয়ে চলল। পেছনে আমি। বাইরের দরজার কাছে গিয়ে টর্চের আলো ফেলতেই চমকে উঠলাম। দেখলাম দরজায় ভেতর থেকে খিল আঁটা।
তার মানে বাইরে থেকে কেউ ঢোকেনি।
শংকর ঢুকেছিল। নিশ্চয়ই তখন দরজা খোলা ছিল। তারপর ঢুকেই ভেতর থেকে খিল লাগিয়ে দিয়েছিল সে।
ইচ্ছে করেই শংকরকে জিগ্যেস করলাম, ঢুকে দরজা বন্ধ করেছিলি তো?
ও মাথা নিচু করে বলল, না। খেয়াল ছিল না।
নাও ঠ্যালা।
সিঁড়িতে জুতো পরে যিনি আসছিলেন–তিনি তো বাড়িতে ঢুকেছেন অনেকক্ষণ আগেই। কী করে ঢুকেছিলেন এর উত্তরও আমার জানা নেই।
.
০৪.
শুধু মনের নয়, বাইরেও পরিবর্তন হতে লাগল। সেটা বুঝতে অবশ্য দেরি হয়েছিল। প্রথম প্রথম বুঝতে পারতাম না। শুধু দেখতাম ইদানিং শংকর হঠাৎ আমার সামনে এসে পড়লে কেমন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার সে সময়ের চোখের ভাষা ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝতাম কেমন যেন ভয়-মেশানো অবাক চাউনি।
মাঝে মাঝে আমি বিরক্ত হয়ে ওকে ধমকে উঠতাম, হাঁ করে কী দেখছিস?
শংকর উত্তর দিতে পারত না। কারণ উত্তর দেবার কিছু ছিল না। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চলে যেত।
.
কয়েকদিন কাটল। তারপর লক্ষ করলাম ও যেন আর আমার সামনে আসতে চায় না। ডাকলে কোনোরকমে দূর থেকে হুঁ-হাঁ করে সাড়া দিয়ে কাছে এসে চোখ নিচু করে দাঁড়াত। যেন আমার মুখ দেখতে চায় না।
কেন এরকম আচরণ? আমার মুখটা কি কদিনের মধ্যে বদলে গেছে? কী বা বদলাতে পারে! ভালো হলে বড়োজোর বোগা মুখটা ভরাট হতে পারে। খারাপ হলে মুখটা আরও শীর্ণ হয়ে যাবে। তার বেশি কিছু নয়। যাক সে কথা ভেবে লাভ নেই। বরঞ্চ একবার আয়নার সামনে দাঁড়ালেই সঠিক বোঝা যাবে।
এখানেও মুশকিল। একটা ছোটো আয়না আছে বটে কিন্তু তা আমি ব্যবহার করি না। দরকারও হয় না। আয়না ছাড়াই আমার চুল আঁচড়ানো হয়ে যায়। আয়না ছাড়াই দাড়ি কামানো সুসম্পন্ন হয়।
যাই হোক শংকরকে নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে আর ইচ্ছে করে না। ভাবলাম কাল বুল্টু এলে দেখব ও কী করে।
কিন্তু পরের দিন বুল্টু এল না।
কেন এল না?
নিজেকেই নিজে উত্তর দিই। কেন আবার? রোজ আসা কি কারও পক্ষে সম্ভব?
সাধারণত বুল্টু এলে সঙ্গে দু-তিনটে বন্ধুও আসে। বাড়ির সংলগ্ন বাগানে একটা দোলনা টাঙানো আছে। বুল্টুরা এলে ঐ দোলনায় চড়ে। কোনোদিন ক্যারামবোর্ডটা নিয়ে বসে। আমার ভালো লাগে। এরা না এলে বাড়িটা যেন বড্ড শূন্য লাগে।
পরের দিন দুপুর থেকেই আমি অপেক্ষায় রইলাম কখন বুল্টুরা আসে। এমনভাবে কোনোদিন ওদের জন্য অপেক্ষা করি না। আজ করলাম। তার কারণ মনটা অস্থির হয়ে ছিল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ওরা কিছু বলে কিনা জানার জন্যে। সে দিন ওরা এত দেরি করে এল যে আমি অধৈর্য হয়ে উঠেছিলাম। তাই ওরা আসতেই আমি ধমকে উঠলাম, এত দেরি?
বুল্টু খুবই অবাক হল। কেননা আমি কোনোদিন ওদের আসা-যাওয়া নিয়ে কিছু বলি না। দেখলাম বুল্টু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ওর অবাক হওয়া দেখে আমি ভয় পেলাম। জিগ্যেস করলাম, কী দেখছিস?
ও মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, কিছু না।
সত্যি করে বল।
বুল্টু থতমত খেয়ে বললে, তোমার ডান দিকের গালে কালো মতো একটা দাগ।
চমকে উঠলাম-কালো দাগ!
হ্যাঁ। কিছু লেগেছে বোধ হয়।
আমি ভয় পেলাম। আমি তো জানি কিছু লাগার দাগ নয়। ওটা অন্য জিনিস।
দুপুরবেলা টেবিলের ড্রয়ার থেকে আয়নাটা বের করলাম। তারপর জানলার ধারে গিয়ে ভালো করে লক্ষ করলাম।
হ্যাঁ, দাগই। চামড়ার ভেতর থেকে ফুটে উঠেছে। দেখলে মনে হয় কোনো চর্মরোগ। সপ্তাহখানেক পরে লক্ষ করলাম দাগটা অনেকখানি বেড়ে গেছে। থুতনি থেকে চোখের কোণ পর্যন্ত।
কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারি না। নিজের সঙ্গে নানা তর্ক করি। সব যেন গুলিয়ে যায়। যত গুলিয়ে যায় ততই ভয় পাই। কিসের ভয় তা জানি না। শুধু মনে হয় ভয়ংকর কোনো অশুভ ঘটনা ঘটতে চলেছে।
সেদিন বিকেলে বুল্টু এল। যাক, একাই এসেছে। ও এ বাড়ির ছেলের মতোই। ঠিক করলাম ওকে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করব, দাগটা কমেছে না কি এখনও আছে? যদি কমে গিয়ে থাকে তাহলে ভালোই। আর যদি এখনও দাগ থাকে তা হলে কী হবে জানি না। ডাক্তারের কাছেও যেতে ইচ্ছে করে না।
যাই হোক চা খাওয়া শেষ করে অন্য দিনের মতো খুব সহজভাবে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম ও ক্যারামবোর্ডটা নিয়ে একা একা হিট করছে।
কী বুল্টুবাবু, একা যে? আজ তোমার বন্ধুরা কোথায়?
বুল্টু আমার দিকে তাকিয়েই কেমন যেন হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ক্যারাম ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল।
আশ্চর্য! আমার কথার উত্তর পর্যন্ত দিল না? খুব রাগ হল। কড়া গলায় ডাকলাম– বুল্টু! ডেকেই চমকে উঠলাম। এ কার স্বর? এত কর্কশ! ততক্ষণে বুল্টু নীচে নেমে গেছে। ও সাড়া পর্যন্ত দিল না।
আমি তাড়াতাড়ি শংকরকে ডাকলাম। শংকর ওপরে উঠে এল। কিন্তু আমার মুখের দিকে তাকাল না। মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। জিগ্যেস করলাম, বুল্টু চলে গেল?
হ্যাঁ, গম্ভীর ভাবে উত্তর দিল শংকর।
হঠাৎ চলে গেল কেন?
শংকর খুব সহজভাবে বলল, বোধ হয় ভয় পেয়েছে।
মনে মনে এবার আমিই ভয় পেলাম। তা হলে বুল্টুও আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে! কিন্তু কেন? শংকরকে জিগ্যেস করতে ভরসা পেলাম না। কারণ ও কী বলবে জানি। ও যে সব কিছুই বাড়িয়ে বলতে ভালোবাসে।
