সে দিন বিকেলে শংকর গুটিগুটি এসে দাঁড়াল। ওকে এই অবস্থায় এসে দাঁড়াতে দেখলেই বুঝতে পারি কোনো মতলব আছে। বললাম, কী রে? কিছু বলবি?
ও সসংকোচে বলল, আমার কাকার ছেলে এসেছে। দেখা করে আসব?
জিগ্যেস করলাম, কোথায়?
শংকর বলল, টাউনে।
মনে মনে ভাবলাম, ও বাবা! সে তো অনেক দূর। মুখে বললাম, তাড়াতাড়ি ফিরবি তো?
শংকর ভালো করেই জানে ওকে না হলে আমার একবেলাও চলে না। তাই বিনয়ে ভেঙে পড়ে বললে, যাব আর আসব।
আশ্বস্ত হয়ে বললাম, তবে যা। ও খুশি হয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, দরজাটায় খিল দিয়ে দিন।
শংকর চলে গেল। যাবার সময়ে আমাকে সাবধান করে দিয়ে বলল, কেউ ডাকলেও দরজা খুলবেন না। মনে মনে একটু যেন চমকে উঠলাম। শংকর এরকম কথা তো কোনোদিন বলে না, আজ কি তবে আমার কোনো বিপদের আশঙ্কা করছে ও! হেসে বললাম, আর তুই যখন আসবি তখন?
ও বলল, আমি রাস্তা থেকে ডাকব আপনাকে।
ঠিক আছে। তুই যা।
একটু পরেই সূয্যিদেব তালগাছগুলোর আড়ালে নেমে পড়লেন। মনে হল যেন আকাশ জননী দুহাত বাড়িয়ে শ্রান্ত-ক্লান্ত সন্তানকে কোলে টেনে নিলেন।
এটা কিছু নতুন ব্যাপার নয়। শংকরের ওপর আমার নির্ভর করে থাকতে হয় ঠিকই, তা বলে ও আমাকে একা রেখে কখনও কোথাও যায় না, এমনও তো নয়। কাছেই একটা পুরোনো কালীবাড়ি আছে। সন্ধেবেলা কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি হয়। শংকর প্রায় দিনই আরতি দেখতে যায়। আরতি শেষ হলে ফিরে আসে। এই সময় আমাকে প্রায় আধঘণ্টা একা থাকতে হয়। তা নিয়ে কোনোদিন কিছু ভাবিনি। কিন্তু এই কিছুদিন আমার যে কী হয়েছে একা থাকলেই ভয় করে। কিসের ভয় তা বুঝতে পারি না।
এই যেমন আজ সন্ধেবেলা ঘরে চুপচাপ বসে আছি। শংকর ফিরলেই একটু ঘুরে আসব বলে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে রেডি হচ্ছি, এমন সময় খিড়কির দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল।
আমার কাছে বড়ো একটা কেউ আসে না। বিশেষ করে সন্ধেবেলা। তাই অবাক হলাম। কিন্তু তখনই সাড়া দিলাম না। মিনিট কয়েক পরেই আবার শব্দ। এবার যেন কেউ অধৈর্য হয়ে কড়া নাড়ছে।
যাচ্ছি। বলে উঠে পড়লাম।
আর তখনই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেলাম। যে কড়া নাড়ছিল সে যেন নিজেই উঠে আসছে।
বিরক্ত হলাম। বলা নেই কওয়া নেই একেবারে উপরে উঠে আসছে।
আমি ঘরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এরই মধ্যে ভেবে নিলাম যদি তেমন কেউ হয় তা হলে তো এক কাপ চাও খাওয়াতে পারব না। কারণ ওসব দায়িত্ব শংকরের।
তা হলে–এমনিভাবে মিনিট পাঁচেক সময় গেল।
আচ্ছা, কোন ঘরে বসাব?
সে না হয় দেখা যাবে। আগে তো আসুক। কিন্তু জুতোর শব্দে আর পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হল যে আসছিল সে যেন হঠাৎ থেমে গেছে। আমার কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। দেখতে চাইছে আমি গিয়ে রিসিভ করি কি না।
ততক্ষণে চারিদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমি সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিছু একটা হয়েছে মনে হচ্ছে।
কী হল ব্যাপারটা?
বাইরের দরজায় কেউ কড়া নেড়েছিল একটু আগে। একবার নয়, দু-দুবার। কিন্তু সে উপরে উঠে এল কী করে? শংকর বেরিয়ে যাবার পর আমি তো নিজের হাতে ভেতর থেকে খিল নিয়ে এসেছি।
তা হলে?
আমার মাথাটা টলে গেল। দেওয়াল ধরে কোনোরকমে সামলে নিলাম। মনে হল এখনই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়া দরকার। ভাবার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে চলে এলাম। তারপর বিছানা থেকে বালিশটা টেনে নিয়ে তার মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লাম। আমি নিশ্চিত, যে বেশিক্ষণ চোখ বুজে ছিলাম না। একটু পরেই শংকরের হাঁকডাক শুনে উঠে বসলাম। যাক, শংকর এসে গেছে।
কখন এলি?
এই তো আসছি। বলে আলোটা জ্বেলে দিল সে।
কোথাও বেরোচ্ছিলেন নাকি?
বেরোচ্ছিলাম। আমি! কই না তো?
ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছেন।
মনে পড়ল কিছুক্ষণ আগে আমি বেরোব বলে তৈরি হয়েছিলাম। তারপর
আচ্ছা, আপনাকে আমি বার বার করে বলে গেলাম বাইরের দরজায় খিল দিতে ভুলবেন না। তবু ভুলে গেলেন। কোন দিন বিপদ ঘটবে দেখবেন।
অবাক হয়ে বললাম, কে বলল আমি দরজা বন্ধ করিনি?
বলবে আবার কে? আমিই তো প্রমাণ। দিব্যি গড় গড় করে ওপরে উঠে এলাম।
তাই তো। আমি হতভম্বের মতো শংকরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
একটু আগেও সিঁড়িতে জুতোর শব্দ শুনেছি। ঐ কথাটাই ভাবছিলাম। বাইরের দরজা আমি তো নিজের হাতে বন্ধ করে এসেছি। তাহলে?
রাতে কী খাবেন? ভাত না রুটি?
আমার এখন অন্য চিন্তা–খিল খুলল কে? সিঁড়িতে কার পায়ের শব্দ শুনেছিলাম? কে সে? ওপরে উঠে এল না কেন?
বললাম–যা হোক কর গে।
শংকর চলে গেল। কিন্তু তখনই হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, যা ভেবেছিলাম তাই।
কী?
কেউ একজন কখন বাড়িতে ঢুকে পড়ে সিঁড়িতে লুকিয়ে আছে।
সে কী!
মনে হল চোর।
চোর! আমি চমকে উঠে বসলাম।
হতে পারে বটে, নীচে নেমেছিলাম একবার। হঠাৎ দেখি সিঁড়িতে কী যেন নড়ছে। ছাগল কুকুর নয়। একটা আস্ত মানুষই। গুঁড়ি মেরে বসেছিল অন্ধকারে। আমার সাড়া পেয়েই কুঁজো হয়ে লাফাতে লাফাতে বাইরের দরজার দিকে চলে গেল। কথাটা শংকরকে বলা চলবে না। ভয় পাবে। তাই বললাম, বলিস কী? চল তো দেখি।
বলতে বলতে টর্চ জ্বেলে নীচে নেমে গেলাম।
কই রে। কেউ তো নেই।
শংকর মাথা চুলকে বলল, এখন নেই। কিন্তু একটু আগেও ছিল। আমি নিজের চোখে দেখেছি।
