আত্রেয়ী নিশ্চয়ই একথা জানত। তবু সে বেরোত রাতের বেলা। প্রায় রাত্তিরেই তার মনে হত মাঠের অন্য প্রান্ত থেকে কারা যেন তাকে ডাকে। সে ডাকে সাড়া না দিয়ে পারত না আত্রেয়ী। কিন্তু একদিন সে আর ফিরল না। কোথায় যেন হারিয়ে গেল। যে রাতে সে হারিয়ে গেল সে রাতে না কি ঐ অঞ্চলের সব বাড়িতে আলো নিভে গিয়েছিল।
এসব অনেক দিন আগের কথা। ক্রমে এ অঞ্চলের মানুষ ভুলে গেল জয় পাল আর দশরথ মণ্ডলের কথা। কিন্তু জমিদারকন্যা আত্রেয়ীর কথা আজও মুখে মুখে ফেরে। কী হল মেয়েটার? বাড়ির কাছে অতি পরিচিত মাঠ থেকে উধাও হয়ে গেল কেমন করে?
শোনা যায় জমিদার জয় পাল মেয়ের খোঁজে দেশে দেশে লোক পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সন্ধান পাননি।
শেষে এক গুণিন এসে ছক কেটে হিসেব করে জানিয়ে গেল ঐ পোড়া মাঠ বড়ো অভিশপ্ত। অশরীরী আত্মার কোপ আছে। সাবধান।
অনেকদিন তো আছি এ বাড়িতে, কিন্তু এত সব কথা আমি কিছুই জানতাম না, জেনেছি এই সবে–দাদমশায়ের সেই খাতাখানি পড়ার পর থেকে। আর তারপরেই যে কীসব ঘটে চলেছে চারদিকে! চারদিকে নাকি আমার মনের মধ্যেই? কী জানি, সেটাও তো ভালো বুঝতে পারি না ছাই।
তবে এটাও কিন্তু ঠিক, লোকজনও বেশ সাবধান হয়ে গিয়েছে এখন। অবশ্য সাবধান আর কী হবে? দু অঞ্চলের মানুষজন খুব দরকার না হলে কেউ আর ঐ মাঠে পা দিত না। সূর্য ডোবার পর তো নয়ই।
.
০৩.
হঠাৎ চমক ভাঙল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে বারোটা।
কী সর্বনাশ! এত রাত পর্যন্ত জেগে কী করছিলাম?
ক্রমে ক্রমে মনে পড়তে লাগল সব কথাই। ঐ তো টেবিলের ওপর আমার রাতের খাবারের থালাটা পড়ে রয়েছে। শংকর রেখে গিয়েছিল। মুখে দেওয়া হয়নি। আমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?
না। আসলে নানা কথা ভাবতে ভাবতে অনেক দূর পিছিয়ে গিয়েছিলাম।
এবার থালাটা টেনে নিলাম। খাওয়ার ইচ্ছে নেই। খেতে পারলাম না। রুটিগুলো শুকিয়ে চামড়ার মতো হয়ে গেছে।
থালা নামিয়ে রেখে হাতমুখ ধুয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম এল না। কেবলই মনে হতে লাগল আজও হঠাৎ কেন সন্ধ্যেবেলায় আলো নিভল! আর আলো নেভা মাত্রই ব্যাপারটা ভূতুড়ে কাণ্ড বলে মনে হল? কেনই বা সন্ধ্যেবেলা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটা ঘোরের মধ্যে রইলাম! কেনই বা এতকাল বাদে পোড়া মাঠ-এর কাহিনিটা মনের মধ্যে জেগে উঠল! আর আত্রেয়ী নামে সেই হতভাগিনী মেয়েটি–যার কথা আজ অনেকেই ভুলে গেছে, তার কথা মনে পড়ল? আমার অস্বস্তি আরও বাড়ছিল সেই ছায়ামূর্তির কথা মনে পড়ায়, যে নাকি গভীর রাতে লম্বা লম্বা পা ফেলে দুহাত দোলাতে দোলাতে পোড়া মাঠের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসত। এগিয়ে আসত এই দিকে, মানে–দাদামশাইয়ের বাড়ির দিকে–যে বাড়িতে এখন একা আমি থাকি।
এত দিক থাকতে কেন যে সে এই বাড়িটার দিকেই আসত তা আমি বুঝতে পারি না। যেমন বুঝতে পারি না কত দিনে মাঠ থেকে উঠে এসে সে পৌঁছবে এখানে। তারপর কী করবে তাও অজানা। তবে এটুকু জানি তাকে ঠেকাবার শক্তি আমার নেই। সে কি তাহলে আজই এসে পৌঁছেছে? সন্ধ্যেবেলায় আলো নিভিয়ে দিয়ে কি সে-ই ঢুকেছে এ বাড়িতে?
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। তাকাতেই দেখলাম একটি মেয়ের ছায়া যেন ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আশ্চর্য! কে এই মেয়ে? ঘরে ঢুকল কী করে? দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ।
চমকে উঠে বসলাম। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা গলায় বললাম, কে তুমি?
উত্তর দিল না। পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে রইল।
এবার চেঁচিয়ে বললাম, উত্তর দিচ্ছ না কেন? কে তুমি?
মেয়েটি এবারও উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে ঘাড় ফেরাল।
উঃ কী ভয়ংকর! মাথার সামনের দিকটা জুড়ে বীভৎস একটা গর্ত। যেন হিংস্র কোনো জন্তু ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার মুখের ওপর। মাথা ঘোেরাবার সঙ্গে সঙ্গে একগাদা বালি পড়ল মাথা থেকে। এত বালি এল কোথা থেকে?
এমন সময়ে ভোরের পাখি ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বীভৎস মূর্তিটা যেন সচেতন হল। আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে হঠাৎ তার কংকালসার একটা হাত তুলে সামনের মেঝেটা দেখিয়ে দিয়ে কিছু যেন বোঝাতে চাইল। তারপরেই বাতাসের একটা ঝাঁপটা তুলে বেরিয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, ও এখন এখানেই থাকে।
আমি কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে রইলাম।
এই কি সেই বহুযুগ আগে পোড়া মাঠে হারিয়ে যাওয়া আত্রেয়ী? ওর মাথা থেকে বালি ঝরে পড়ল কেন? তবে কি সে বালির মধ্যে তলিয়ে গিয়েছিল? তাই যদি হয় তবে এ কথা আজ কাকে বলব?
এই এতক্ষণ ধরে আজ রাতে যা ঘটল তা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে দাদামশাই-এর এই বাড়ি তৈরি হয়েছিল পোড়া মাঠ-এর সেই জায়গায় যেখানে আত্রেয়ী চোরাবালিতে ডুবে গিয়েছিল।
এতদিন এখানে আছি একদিনের জন্যেও ভয় পাইনি। কিন্তু এখন সর্বত্র এক অশরীরীর অস্তিত্ব অনুভব করছি। দিনের বেলাটা একরকম কাটে। কিন্তু সন্ধে হলেই হয়ে যাই অন্যরকম। তখন একবার মনে হয় এই সময়ে ঘরে থাকা ঠিক নয়। হয়তো অঘটন কিছু ঘটবে। ছটফট করে ঘরের বাইরে চলে আসি। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় এই ভরসন্ধ্যায় বাইরে থাকা ঠিক নয়। বরঞ্চ ঘরটাই নিরাপদ। আর তখনই আবার ঘরের দিকে পা বাড়াই। এ এক অদ্ভুত অবস্থা মনের। মনটা যেন আমার নয়, অন্য কেউ তার লাগাম ধরে আছে। মনের এই অদ্ভুত অবস্থা এমনি-এমনি হয়নি। বিপদ ঘটবার চান্স ছিল। হ্যাঁ ছিল। যেমন–
