তাড়াতাড়ি উঠে দরজার কাছে গেলাম। চেপে বন্ধ করতে যাচ্ছি, দেখলাম হাঁটু পর্যন্ত তোলা ধুতি পরা একটা পা চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। ভয়ে আমি চিৎকার করতে যাচ্ছি, এবার গোটা মানুষটাকে দেখতে পেলাম। খাবার থালা হাতে শংকর অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দরজা বন্ধ করছেন কেন? খাবেন না?
ও! হ্যাঁ!
নিজের এই দুর্বলতায় খুব লজ্জা পেলাম। সরে এলাম। শংকর টেবিলের ওপর আমার রাতের খাবার রেখে চলে গেল।
.
০২.
জায়গাটার নাম পোড়া মাঠ। লোকবসতি কম। মেন রাস্তা থেকে দক্ষিণে নেমে এলেই দেখা যাবে অনেকখানি জায়গা জুড়ে শুধু মাঠ আর মাঠ। এত জায়গা থাকতে কেন যে দাদামশাই এখানে এই বাড়িটা কিনেছিলেন তা আজ আর জানার উপায় নেই। দাদামশাই মানুষটি খুব খেয়ালি স্বভাবের ছিলেন। টাকাপয়সাও ছিল ভালো রকম। শুনেছি তিনি উন্মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে থাকতে ভালোবাসতেন, তাই হয়তো এই জায়গাটাকে পছন্দ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন পাকাপাকিভাবে বাস করার জন্যে বাড়িটা নেননি। মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে এসে হৈ-হুঁল্লোড় করতেন। বাড়ির নাম দিয়েছিলেন বিলাস-নিকেতন। থাকতেন মধ্য কলকাতার একটা ভাড়াবাড়িতে। কলকাতাতেই চাকরি। তবে উনি নাকি চাইতেন ছুটি-ছাটায় এখানে এসে থাকতে। পাকাপাকিভাবে থাকার অভিপ্রায় কোনোদিনই ছিল না।
এই যে একসঙ্গে এত বড়ো মাঠ এরকম খুব একটা দেখা যায় না। অবশ্য এখন আর টানা মাঠ নেই। বন্যায়, ঝড়ে, বৃষ্টিতে কিংবা ভূমিকম্পে বিশাল মাঠটা যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে। আরও অদ্ভুত ব্যাপার মাঠে কোথাও শুধু বালি, কোথাও পাহাড়ি জায়গার মতো শুধু পাথর। আর এখানে-ওখানে বাবলার ঝোপ।
এসব ছিল দাদামশাই যখন এখানে বাড়ি কিনেছিলেন তখন। আমরা যখন এখানে আসি তখন অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। অনেকখানি মাঠ জুড়ে লোকবসতি গড়ে উঠেছে। ছেলেদের খেলবার মাঠ তৈরি হয়েছে। মাঝে মাঝে সার্কাসপার্টি এসে তাঁবু ফেলে। লাইট, ফোন সবই এখন হয়েছে এখানে।
দাদামশাই যে কেন এখানে মাঝে মাঝে আসতেন তার কারণ জানতে পেরেছিলাম তার মৃত্যুর পর তাঁর কাঠের বাক্স থেকে পাওয়া একটা খাতা বা ডায়েরি থেকে। আসলে তিনি ছিলেন এক ধরনের গবেষক। পুরোনো পরিত্যক্ত কোনো জায়গা দেখলেই সেখানকার ইতিহাসের খোঁজ করতে শুরু করেন। এইভাবেই তিনি পোড়ো মাঠের হারিয়ে যাওয়া কাহিনি খুঁজে বের করেন। কিন্তু কাউকে বলেননি। লিখে রেখে গিয়েছিলেন। মলাটে লাল কালিতে লিখে রেখেছিলেন অতি ভয়ঙ্কর।
কী ভয়ঙ্কর লেখেননি। কিন্তু আমি আমার জীবন দিয়ে তা অনুভব করেছি। এবার সেই কথাই বলি।
মাঠের পূর্বদিকটার জমিদার ছিলেন জয় পাল। আর পশ্চিমদিকের মালিক ছিলেন দশরথ মণ্ডল। ঝগড়া হত আবার মিটেও যেত। দুপক্ষের মধ্যে যত মারামারিই হোক নববর্ষের দিন দুপক্ষই সাদা নিশান উড়িয়ে জানিয়ে দিত এবার সন্ধি। সেদিন একপক্ষ থেকে আর একপক্ষের কাছে যেত আঁকা ঝকা ফল, টিন টিন মিষ্টি। জমিদারের জন্যে পাঠানো হত ফাইন ধুতি, মলমলের পাঞ্জাবি আর পাগড়ি। এমনি পাগড়ি কেউ পরত না, কিন্তু উপহারের পাগড়ি মাথায় একবার দিতেই হত দুই জমিদারকে। ঐ একদিনই পাগড়ি পরা হত। বাকি সময় পাগড়ি তোলা থাকত আলমারির মাথায়।
একদিন ঘটল একটা ঘটনা! এমন ঘটনা, যে তা একরকম ইতিহাস হয়ে উঠল।
জয় পালের ছিল একটি পরমাসুন্দরী কন্যা। নাম আত্রেয়ী। বারো বছর বয়েস। ওই অল্পবয়েসেই নানা জায়গা থেকে বিয়ের ভালো ভালো সম্বন্ধ আসতে লাগল। কিন্তু আত্রেয়ীর বাবা-মা এত অল্প বয়েসে বিয়ে দিতে রাজি নন। আত্রেয়ীও বিয়ের কথা ভাবে না। তার ভালো লাগে একা একা ঘুরে বেড়াতে। দেখতে ইচ্ছে করে দুপা দূরে দশরথ মণ্ডলের রাজ্যপাট। ঐ তো দেখা যাচ্ছে পশ্চিম প্রান্তের সার সার তালগাছ। গাছগুলো যেন সীমান্তের প্রহরী। দুই জমিদারেরই কড়া হুকুম ছিল কেউ যেন অনুমতি ছাড়া ভিন রাজ্যে না ঢোকে। এই আদেশ অমান্য করলেই কয়েদ করে রাখা হবে। ফলে কোনো পক্ষেরই মানুষ সীমান্তের ধারে-কাছে যেত না।
আত্রেয়ীর এই আদেশের কথা জানত, কিন্তু ও নিয়ে মাথা ঘামাত না। সীমান্তের ওপারে যাবার কথা তার বন্ধুদের কাছে বললে তারা আঁৎকে উঠে সাবধান করে দিত, তোর বাবার আদেশের কথা জানিস না?
আত্রেয়ী বলত, জানি। কিন্তু আমি তো গুপ্তচর নই। কাজেই কোনো পক্ষেরই ভয় পাবার কিছু নেই। বরং দুপক্ষেরই লাভ। ভোলা মনে মিশতে পারলে পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় হয়।
আত্রেয়ী ভালো লাগত গভীর রাতে চুপি চুপি বেরোতে। চারিদিক নিঝুম নিস্তব্ধ। কেউ দেখছে না। আত্রেয়ী মনের আনন্দে চলে যেত সীমানা পেরিয়ে দশরথ মণ্ডলের এলাকায়। আবার ভোর রাতে ফিরে আসত। এ যেন একরকম অ্যাডভেঞ্চার। খুব ভালো লাগত। সারা রাত ঘুরত যেন স্বপ্নের ঘোরে। তারপর সারা দুপুর ঘুমোত। এইভাবে দিন কাটছিল।
যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে সময়ে এই অঞ্চলের মানুষের দুটি ব্যাপারে ভয় ছিল। এক–বিষধর সাপ, দুই-ভূত। সাবধানে চলাফেরা করলে সাপকে তবু এড়ানো যায়। কিন্তু ভূত খুবই ভয়ংকর। তখন ভূতের আড্ডা নাকি ছিল গোটা পোড়া মাঠ জুড়ে। তবে সহজে তারা দেখা দিত না। বিশেষ বিশেষ তিথিতে বিশেষ বিশেষ ভাবে তাদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত। কখনও কখনও দেখা যেত গভীর রাতে ঐ পোড়া মাঠে একটা ছায়া ছায়া মূর্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার কখনও গভীর রাতে হঠাৎ হঠাৎ ঝড় উঠত। তারপর দেখা যেত জলস্তম্ভের মতো বালির স্তম্ভ। প্রায় আকাশ-ছোঁওয়া। পরক্ষণেই বিকট শব্দ করে আছড়ে পড়ত মাঠের ওপর। এসবই যে ভৌতিক ব্যাপার তা সবাই জানত। তাই দরজা-জানলা বন্ধ করে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকত মশারির মধ্যে। আবার কখনও গভীর রাতে হয়তো দেখা গেল বিকট একটা মূর্তি লম্বা লোমশ দুটো হাত দোলাতে দোলাতে মাঠের মধ্যে এদিক ওদিক ঘুরছে। যে কজন দেখেছে তারা কেউই আর সুস্থ স্বাভাবিক নেই।
