.
কিছু বললে জ্যেঠু?
কই না তো!
মনে মনে বিড়বিড় করছিলে যে।
তখনই আমার মাথায় দুর্বুদ্ধি চাপল। নিরীহ ছেলেটাকে ভয় দেখাবার জন্য গলার স্বর বিকৃত করে বললাম, আলো নিভল কেন? ভৌতিক ব্যাপার নয় তো!
সামান্য কথা। কিন্তু বুল্টু আঁৎকে উঠল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আমি বাড়ি যাব।
যাবে তো নিশ্চয়। আলোটা জ্বলুক।
বুল্টু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, না আমি এখুনি যাব। বলেই উঠে পড়ল।
বললাম, দাঁড়াও। একা যেও না। বলে ডাকলাম, শংকর–দু-তিনবার ডাকাডাকির পর শংকর এলো। বললাম, একে বাড়ি দিয়ে এসো। আমার টর্চটা নিয়ে যাও। বলে টর্চটা দিলাম।
শংকর বুল্টুকে নিয়ে নেমে গেল।
ও চলে গেলে ভাবলাম ভয় না দেখালেই হত। ছেলেমানুষ। কিন্তু হঠাৎ ভূতের কথাটা মুখে এসে গেল কেন? আলো নিভে যাওয়া নতুন কিছু নয়। ইদানিং প্রায় প্রতিদিনই তো…। বেশ কিছুক্ষণ ঐ একটা কথাই মনের ভেতর ঘোরাফেরা করতে লাগল–হঠাৎ ভূতের কথা মনে এল কেন?
এমনি সময়ে নীচ থেকে বুল্টুর ডাক শুনতে পেলাম–জ্যেঠু।
চমকে উঠলাম। কী হল বুল্টুর?
যাই। বলে মুহূর্তমাত্র দাঁড়িয়ে না থেকে অন্ধকার ঘরের মধ্যে দিয়ে ছুটে বারান্দায়। তারপর দেওয়াল ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে একেবারে রাস্তার দরজায়।
অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। আন্দাজেই বুল্টুকে ডাকলাম, তুই কোথায়? টর্চটা জ্বালা।
টর্চ তো জ্বালা হলই না। বুল্টুর কাছ থেকে সাড়াও পাওয়া গেল না। শংকরই বা গেল কোথায়? ডাকলাম, শংকর
সাড়া পাওয়া গেল না। ফের ডাকলাম–শংকর
এবার যেন অনেক দূর থেকে সাড়া পেলাম।
এই যে আমি এখানে।
কোথায়?
এবার আর সাড়া পাওয়া গেল না। আমি দরজার দিকে যাবার জন্য কানামাছি খেলার মতো নিজেরই বাড়িতে ঘুরপাক খেতে লাগলাম। পথ আর খুঁজে পাই না।
কতক্ষণ এইভাবে ঘুরেছি জানি না। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। চোখ কচলে তাকালাম। এ কী! সিমেন্ট বাঁধানো উঠোন থেকে কখন নেমে এসে দাঁড়িয়েছি পাতকুয়োর কাছে। আমার কি মাথার গণ্ডগোল হয়ে গেল নাকি? ডাকলাম, শংকর
শংকর বোধহয় কাছেই কোথাও ছিল। সাড়া দিল–বলুন। তারপর আমার দিকে চোখ পড়তেই বলে উঠল, একী! আপনি কুয়োতলায় কী করছেন?
আমি সলজ্জভাবে উত্তর দিলাম, কী জানি বুঝতে পারছি না। বুল্টুকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিস তো?
কখন! এতক্ষণে খেতে বসে গেছে।
এরই মধ্যে খেতে বসেছে!
শংকর বলল, এরই মধ্যে বলছেন কেন? এখন কটা বাজে জানেন?
জানি না। জানতে চাই না। বুঝতে পারি আমার মাথার মধ্যে কিছু গোলমাল হয়েছে।
দাঁড়াতে পারছিলাম না। পা দুটো কাঁপছিল। আস্তে আস্তে ওপরে উঠে এলাম।
ওপরে এসে অনেকক্ষণ খাটে বসে রইলাম। শরীরটা কেমন দুর্বল লাগছে। মনে হল যেন অনেক দূর থেকে হেঁটে আসছি।…আশ্চর্য! এমন তো কোনোদিন হয়নি। আমি খাটের বাজুতে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইলাম। গোড়া থেকে সব ব্যাপারটা ভাবতে শুরু করলাম। এমন অদ্ভুত ব্যাপার কেন ঘটল?
বুল্টুকে হঠাৎ আজই ভয় দেখাতে ইচ্ছা করল কেন? এটা হচ্ছে প্রথম প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্ন : বুল্টুকে শংকরের হেপাজতে দেবার পর থেকে আমি একা নীচে কী করছিলাম? কেনই বা সিমেন্ট বাঁধানো উঁচু রক থেকে কুয়োতলার ভিজে মাটিতে নেমে গেলাম–যেখানে বড় একটা নামার দরকার হয় না। কুয়ো থেকে জল তোলার দরকার হলে রক থেকেই কপিকলের সাহায্যে তোলার ব্যবস্থা আছে। তা ছাড়া আমিই বা জল তুলতে যাব কেন? দরকার মতো শংকরই জল তুলে দেয়।
আরও একটা ভাবনা আমায় চিন্তায় ফেলেছিল, বুল্টুকে বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্যে শংকর যখন নীচে নেমে গেল, আমিও প্রায় তখনি নীচে নেমেছিলাম। গিয়ে দেখি শংকর অনেক আগেই বুল্টুকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসেছে।
বেশ। মানলাম শংকর ঠিকই বলছে। কিন্তু শংকরকে যখন আমি জিগ্যেস করলাম বুল্টুকে পৌঁছে দিয়েছে কিনা তখন শংকর বললে–অনেকক্ষণ। এতক্ষণে বোধহয় বুল্টু রাতের খাবার খাচ্ছে।
তাই যদি হয় তা হলে এতক্ষণ আমি কী করছিলাম? কোথায় ছিলাম?
কোনো প্রশ্নেরই উত্তর পেলাম না। দূর ছাই! আর ভাবতে পারি না বলে আলিস্যি ভেঙে উঠে বসলাম। কটা বেজেছে দেখবার জন্যে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম। অবাক হয়ে গেলাম। পাঁচটা বেজে দশ মিনিট! ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। আশ্চর্য! আমার ঘড়িটা তো কখনও এমন আলটপকা বন্ধ হয় না। তাহলে কি দম দেওয়া হয়নি? দম দিতে ভুলে গেছি?
না, এমন ভুল আমার হয় না। বেশ মনে পড়ছে নিয়মমতো আজও ব্রেকফাস্ট সেরেই দম দিয়েছি। ঘড়িতে দম দেওয়ার পর শুরু হয় প্রতিদিনের কাজকর্ম। আজও তার যে ব্যতিক্রম হয়নি তার প্রমাণ রয়েছে ঐ যে টুলটা। পাশের ঘর থেকে টুলটা টেনে নিয়ে এসে তার উপর দাঁড়িয়ে আমি পুরোনো দেওয়াল ঘড়িটায় দম দিই।
সবই তো দেখছি ঠিকঠাক হয়েছে। তবু কেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে?
এর কারণ কী?
উত্তর একটাই–জানি না।
একা বসে এই সব ভাবছি, হঠাৎ একটু বেশি মাত্রায় সচেতন হয়ে উঠলাম। সিঁড়িতে কার পায়ের শব্দ! কেউ যেন খালি পায়ে নীচ থেকে ওপরে উঠে আসছে। শব্দটা ২ স্পষ্ট হতে লাগল ততই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেতে লাগল। কে আসছে? কোথা থেকে আসছে? কেন আসছে? এখন তাহলে আমি কী করব?
দরজাটা ভেজানো ছিল। মনে হল এই মুহূর্তে আমার কর্তব্য হচ্ছে দরজার খিল দিয়ে দেওয়া।
