আমি মশারির মধ্যে দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে কাঠ হয়ে বসে রইলাম।
বসেই রইলাম সকাল হওয়া পর্যন্ত যতক্ষণ সেন্টের গন্ধটা ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
চমক ভাঙল দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে। উঠে দরজা খুলে দিলাম।
দেখি হাসিমুখে শীলমশাই দাঁড়িয়ে।
–কি ব্যাপার! এত বেলা পর্যন্ত বিছানায়! ঘুম হয়েছিল তো?
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলাম হ্যাঁ।
কিন্তু সেইদিনই আমি জঙ্গলমহল ছেড়ে ফিরে এসেছিলাম।
ভর
০১.
অনেকেই আমাকে জিগ্যেস করে আমি কি সত্যিই বিশ্বাস করি ভূত বলে কিছু আছে?
এ প্রশ্ন শুধু আজকের নয়, বহুকাল আগের। আর সত্যি কথা বলতে কি এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারেনি। পারবেও না।
ইদানিং ক্লাস টেন-এ পড়া আমার এক প্রতিবেশীর ছেলে বুল্টু আমার ভূতের গল্পের পাঠক ও শ্রোতা হয়ে উঠেছে। তার মনেও অজস্র প্রশ্ন। জিগ্যেস করে, আমি যতগুলি ভূতের গল্প লিখেছি তা কি সবই সত্যি?
কঠিন প্রশ্ন।
তবু উত্তর দিতে হয়। বলিনা, কোনো গল্পই পুরোপুরি সত্য হয় না। সত্যি-মিথ্যে মিলিয়েই গল্প।
বুল্টু জিগ্যেস করে, সত্যি বলো তো কখনও ভূত দেখেছ?
ঢোঁক গিলে বলি, না, তা দেখিনি। তবে
তবে কি? বুল্টু কৌতূহলে ঝুঁকে পড়ে।
বললাম, তবে কিছু অনুভব করি।
সে আবার কী?
বললাম, সে এখন তোরা বুঝবি না। বড় হ তখন বুঝবি।
খুব বুঝব। তুমি বলো না।
মুশকিল! এ তো পরীক্ষার পড়া বোঝানো নয়, এ হচ্ছে অনুভূতির ব্যাপার। কতবার যে ঘটেছে আমার জীবনে! এই যেমন–এক একটা এমন নির্জন জায়গা আছে সেখানে একা গেলেই মনে হয় আমি আর একা নই, আরও কেউ যেন আছে। তাকে দেখতে পাই না, কিন্তু শব্দ শুনতে পাই। পিছনে শুকনো পাতা মাড়িয়ে কেউ যেন আসছে।
শুধু নির্জন জায়গাতেই নয়, নিজের বাড়িতেও অন্ধকার ঘরে আমি হয়তো উঠে দেশলাইটা আনতে যাচ্ছি, স্পষ্ট টের পেলাম কেউ যেন আমার গা ঘেঁষে সাঁৎ করে সরে গেল। না, পুরো মানুষ নয়, মানুষের একটা ছায়া।
বুল্টু হঠাৎ আমাকে আঁকড়ে ধরল।
কী হল?
ও বলল, ঐ দ্যাখো আলোর জোর কীরকম কমে যাচ্ছে। এখুনি লোডশেডিং হবে। বলে আঙুল তুলে বালা দেখিয়ে দিল।
কী হয়েছে?
দ্যাখো না।
দেখলাম আলোটা আস্তে আস্তে নিভে আসছে। কথা বলতে বলতেই গোটা বাড়ি অন্ধকার হয়ে গেল।
বুল্টু আরও কাছে এসে ভয়ে ভয়ে বলল, কী করে বাড়ি যাব?
পিঠে হাত রেখে বললাম, ভয় পাবার কিছু নেই। একটু পরে যাস।
ও কোনোরকমে বলল, বড্ড অন্ধকার!
বললাম, লোডশেডিং। অন্ধকার হবে না?
বুল্টু বলল, লোডশেডিং না ছাই! ঐ দ্যাখো সব বাড়িতেই আলো জ্বলছে। শুধু এই বাড়িতেই
তাকিয়ে দেখি, তাই তো। সব বাড়িতে আলো জ্বলছে। শুধু আমাদের বাড়িতেই
অবশ্য এটা কিছু নতুন নয়। এমনটা আজকাল প্রায়ই ঘটছে। সন্ধের পর থেকে শুতে যাবার আগে পর্যন্ত হঠাৎ-হঠাৎ আলো নিভে যায়। অথচ লোডশেডিং নয়। কেননা অন্য সব বাড়িতে তখন দিব্যি আলো জ্বলে।
বারে বারে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ডেকেছি। তারা এসে যা হোক ব্যবস্থা করেছে কিন্তু লাইন আর ঠিক হয় না। শেষে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি যখন বলল, গোটা বাড়িটায় নতুন করে ওয়্যারিং করতে হবে তখন আমি পিছিয়ে এলাম। কারণ অত টাকা খরচ করার সামর্থ্য আমার নেই।
তা ছাড়া ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলাম, লাইনই যদি খারাপ হবে তাহলে সারাদিন কারেন্ট থাকে কী করে? আর রাত্তিরে আলো নিভে যায় কিছুক্ষণের জন্য। আলো নেভে, কিন্তু পাখা চলে। এ তো বড়ো তাজ্জব ব্যাপার! কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? তবে কেউ না জানুক আমি বিশ্বাস করি, এ সবই ভৌতিক কাণ্ড। কিন্তু এ কথা কাউকে বলা যাবে না।
বাড়িটা আমার দাদামশাইয়ের। দাদুর ছেলে ছিল না। আমার মা তার একমাত্র মেয়ে, আমি একমাত্র নাতি। দাদু মারা যাবার কিছুকাল আগে মাকে আর আমাকে কাছে এনে রাখলেন। আর আমাকেই উত্তরাধিকারী করে গেলেন।
অনেকখানি ফাঁকা জায়গার ওপর বাড়িটা। আমাদের ছোটো সংসারের পক্ষে যথেষ্ট। অনেকখানি কম্পাউন্ড। মধ্যে ফুলের বাগান। পিছনে কলা বাগান, নারকেল বাগান। বেশ শান্ত পরিবেশ। তবে বাড়ির উত্তর দিকে একটা পরিত্যক্ত মাঠ। সেখানে কোনো ছেলে খেলা করে না। এমনকি গরু-ছাগলও চরে না। ঘাসই হয় না তো গরু চরতে যাবে কোন দুঃখে? আসলে ওটা একটা পুরনো পরিত্যক্ত কবরখানা। ঐ মাঠ দিয়ে চলাফেরা করা বারণ ছিল। কিন্তু ছেলে-ছোকরারা শুনত না। শর্টকাট করতে মাঠের ওপর দিয়ে হাঁটত। মাঝে মাঝে অসাবধানে জলে-ধসে যাওয়া কবরের গর্তে পা ঢুকে যেত। গাটা কেমন করে উঠত। বাড়িতে বলা যেত না। বললেই স্নান করতে হবে। শীত করলেও রেহাই নেই।
দাদামশাই ছিলেন একটু অন্য প্রকৃতির মানুষ। সে বিষয়ে বলার আগে বাড়িটার কথা বলে নিই।
বাড়িটার একতলায় তিনটি ঘর। যে ঘরটিতে দাদু থাকতেন সে ঘরটায় অন্য কেউ আসা যাওয়া করে দাদুর তা পছন্দ ছিল না। কেউ ওখানে ঘোরাঘুরি করলেই দাদু হাঁকতেন–
কী চাই?
না, কিছু না। এমনিই।
যাও! পালাও।
দাদু একটু রাগী মানুষ ছিলেন। আমরা তাই দাদুর ঘরের ত্রিসীমানায় যেতাম না। ভাবতাম কী এমন ও ঘরে আছে যে দাদু কাউকে ও ঘরে ঢুকতে দিতে চাইতেন না!
মাকে জিগ্যেস করলে মা বলত, কী দরকার দাদুর ঘরের কথা ভেবে? আমাদের থাকতে দিয়েছে এতেই আমরা খুশি।
এক-একদিন সকালবেলায় দাদু বেরিয়ে যেতেন। ফিরতেন অনেক রাতে।
