পৌনে দুটো। রাস্তার দিকের জানলাটা একটু ফাঁক করে দেখতে লাগলেন।
কই? এখনও তো আসছে না? আসবে তো শেষ পর্যন্ত?
ওঁর খুব জলতেষ্টা পেল। চৌকির নিচ থেকে কুঁজো টেনে নিয়ে ঢকঢক করে এক গেলাস জল খেয়ে নিলেন। তাঁর কাঁচা-পাকা দাড়ি বেয়ে খানিকটা জল গড়িয়ে পড়ল। উঠে দাঁড়িয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখটা মুছলেন। ঘড়িতে টং টং করে দুটো বাজল। আর ঠিক তখনই দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ।
মৃগেন্দ্রনারায়ণের দু চোখ হিংস্র বাঘের চোখের মতো জ্বলজ্বল করে উঠল।
যাক, এসেছে তা হলে। মেয়েটা তো খুব পাচুয়াল। হাজার হোক সাহেব-বাচ্চা তো!
মৃগেন্দ্রনারায়ণ সন্তর্পণে দরজা খুলতে এগিয়ে গেলেন।
.
ঘটনাটা শেষ করে সুন্দর শীলমশাই জোরে কয়েকবার হুঁকোয় টান দিলেন।
–এই হলো এ বাড়ির এক সময়ের মালিক, প্রাক্তন জমিদার–পাগল মৃগেন্দ্রনারায়ণের কাহিনী।
অনেকক্ষণ চুপ করে আছি দেখে শীলমশাই নিস্তব্ধতা ভাঙলেন।–কিছু বলছেন না যে?
–কি আর বলব? লোকটা ধরা পড়ল?
–সেও একটা ব্যাপার। পুলিশ মোটেই সন্দেহ করেনি মৃগেন্দ্রনারায়ণকে। কিন্তু মেয়েটির জুতোের ছাপ দেখে বুঝেছিল যে কোনো কারণেই হোক মেয়েটি এই বাড়িতে ঢুকেছিল। পুলিশও ঢুকল। দেখল সব ঘরই বন্ধ ব্যবহার করা হয় না। শুধু একটি ঘরে বিছানা পাতা। পুলিশ তালা ভেঙে সেই ঘরে ঢুকল। হত্যার কোনো চিহ্নই নেই। হতাশ হয়ে পুলিশ ফিরে আসছিল–ইনস্পেক্টর নিশ্বাস টেনে বললেন–ভারি সুন্দর সেন্টের গন্ধ তো ঘরে! সাধুবাবা সেন্টটেন্ট মাখতেন নাকি?
তখনই খটকা বাধল। মৃত মেয়ের মাকে এই ঘরে আনা হলো। তিনি বললেন, এই সেন্টটাই আমার মেয়ে মাখত।
তখনই পুলিশ বুঝল, মেয়েটি এই ঘরে এসেছিল। তারপর আর সে ফিরে যায়নি। কিন্তু–সাধুবাবা কোথায়?
তাকে আর খুঁজতে হলো না। তিনি তখন থানায় গিয়ে নিজেই ধরা দিয়েছেন।
ধরা দিয়েছেন? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যাঁ, বড় দেরিতে মৃপেন্দ্র জানতে পেরেছিলেন মেয়েটি মোটেই ইংরেজ নয়, একেবারেই ইন্ডিয়ান। পাঞ্জাবী মেয়ে। এখানকার এক অফিসারের কন্যা। সেই অনুতাপে ধরা দিলেন মৃগেন্দ্রনারায়ণ। তারপর সব ঘটনা বলে গেলেন–যাকে বলে স্বীকারোক্তি।
এই পর্যন্ত বলে সুন্দর শীল থামলেন। আমিও চুপ করে রইলাম।
একটু পরে সুন্দরবাবু হেসে বললেন–ঘটনাটা বোধ হয় আপনার মনঃপূত হলো না। কি করা যাবে–সত্যি ঘটনা তো তাই রঙচঙ নেই। একটু থেমে বললেন–আর যাই হোক, এর মধ্যে ভূত-প্রেত অলৌকিকতার বালাই নেই। তাই না?
–তা বটে। কিন্তু কিন্তু ঘটনাটা অবিশ্বাস্য।
–কেন? সুন্দরবাবুর হৃদুটো লাফিয়ে উঠল।
–কেননা আপনি এমন অনেক কথা বললেন যা কারও জানার কথা নয়।
–যেমন?
–যেমন নিজের ঘরের মধ্যে যখন মৃগেন্দ্র মেয়েটির জন্যে অপেক্ষা করছে তখন তার মনের ভাব–জল খাওয়া–জানলা দিয়ে দেখা–এসব কি কেউ স্বচক্ষে দেখেছে?
–আরে মশাই, এসব তো মৃগেন্দ্র নিজেই পুলিশের কাছে বলেছেন। তার পর তো বুঝতেই পারছেন–লোকমুখে মুখে ছড়িয়েছে।
আমি হেসে বললাম–ঘটনাটা যা শুনলাম সে তো বোধহয় ১৯৪৮-৪৯ সালের কথা। অর্থাৎ আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগের ব্যাপার। এত কাল ধরে যা জনশ্রুতি তাতে অনেক রঙ চড়েছে। কাজেই আমি বিশ্বাস করি না।
সুন্দর শীল একটু বিরক্ত হয়ে বললেন–তা আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন তাতে কিছু এসে যায় না।
এই বলে শীলমশাই হুঁকো হাতে উঠে পড়লেন।
ভদ্রতা করে ওঁকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। ওঁর রাগ ভাঙাবার জন্যে হেসে বললাম যাক, তবু ভূতের গল্প শোনাননি এর জন্যে ধন্যবাদ। সত্যি কথা বলছি শীলমশাই, ভূতের গল্প শুনলে এ বাড়িতে একা রাত কাটাতে পারতাম না।
শীলমশাই উত্তর দিলেন না। চটির শব্দ করতে করতে নিচে নেমে গেলেন।
.
রাত গভীর। কোথাও এতটুকু শব্দ নেই। মাথার ওপর শুধু পুরনো ফ্যানটা একটা বিশ্রী শব্দ করে ঘুরছে।
শীলবাবুর মুখে ঘটনাটা শুনে বিশ্বাস না করলেও অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমোতে পারিনি। কেবলই সেই অচেনা না-দেখা মেয়েটির কাল্পনিক মুখ চোখের সামনে ভাসছিল। কিছুতেই মন থেকে ঘটনাটা দূর করতে পারছিলাম না।
আচ্ছা জ্বালাতন! যত গাঁজাখুরি গল্প শুনে এ তো হলো ভালো!
মনে মনে গজগজ করতে করতে পাশ ফিরে শুলাম আর ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো খুটখুট। কেউ যেন খুব আস্তে কড়া নাড়ছে।
ধড়মড় করে উঠে বসলাম। এত রাত্রে আবার কে এল? শীলমশাই নাকি?
না, আর শব্দ নেই। শোনার ভুল মনে করে শুতে যাচ্ছি–আবার সেই শব্দ খুটখুটখুট
–কে?–একটা বিশ্রী খ্যাসূখেসে স্বর গলা থেকে বেরিয়ে এল।
নিশ্চয় শীলমশাই নয়, তাহলে সাড়া দিতেন।
অগত্যা উঠতে হলো। দেওয়াল হাতড়ে সুইচ অন করলাম। ভোলটেজ ডাউন। কোনোরকমে একটুখানি আলো জ্বলল। এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে। খিল খুললাম। কি একটা অজানা ভয়ে বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে।
দরজাটা খুলে দিলাম। কেউ কোথাও নেই। শুধু অন্ধকারে ঢাকা সিঁড়িটা থমথম করছে।
আমার সর্বাঙ্গে কাটা দিয়ে উঠল। শব্দটা তো আমি নিজে কানে শুনেছি। একবার নয়, তিন তিন বার। তা হলে?
তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে ঘরে এসে ঢুকলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলাম–সেন্টের গন্ধ। সারা ঘরে সেন্টের গন্ধ ভুরভুর করছে। মনে হলো এই মুহূর্তে দরজা দিয়ে কেউ সেন্ট মেখে ঘরে ঢুকেছে। ঢুকে এই ঘরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
