–হ্যাঁ, আমার অনেক দিনের ইচ্ছে একজন ইন্ডিয়ান যোগীর ছবি আঁকি।
–বেশ এঁকো।
তা হলে দয়া করে বসুন। এক ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যাবে।
মৃগেন্দ্র বললেন–এখন পারব না। বাজার যাচ্ছি। তুমি বরঞ্চ কাল আমায় বাড়িতে এসো দুপুর দুটোর সময়ে। ঐ যে আমার বাড়ি-জঙ্গলমহল।
মেম রাজি হলো। মৃগেন্দ্র হেসে বললেন–আসবে কিন্তু। ঠিক দুটোয়।
নিশ্চয় যাব।
–আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকব।
.
ঘটনাটা বলছিলেন Jungle View Hotel-এর মালিক সুন্দর শীল। বয়েস ষাট-পঁয়ষট্টি। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। মাথার তিন দিক ঘিরে টাক। খুব গল্প করতে পারেন।
আমি এসেছিলাম জঙ্গলের মাপজোখ করার কাজে। শুনলাম জঙ্গল এখন আর তেমন নেই। থাকবে আর কি করে? গাছ কেটে কেটে সাফ করে দিচ্ছে।
এখানে এসে যে এমন একটা হোটেল পাব ভাবতে পারিনি। বিরাট বাড়ি। বড়ো বড়ো ঘর। বোঝাই যায় সাবেক কালের বাড়ি। সারিয়ে-সুরিয়ে ভাড়া দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এত বড়ো হোটেল। কিন্তু প্রায় বেশির ভাগ ঘরই ফাঁকা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চার-পাঁচ জন। আমি সরকারি কাজে এসেছি জেনে একটু বিশেষ খাতির করে যে ঘরটি দেওয়া হয়েছে সেটি একেবারে একটেরে–আলাদা। অ্যাটাচড় বাথ। দক্ষিণ খোলা। পশ্চিমের জানলা খুললেই দেখা যায় সেই বিরাট জঙ্গলটা। রাতের অন্ধকারে মনে হয় যেন কোনো অজানা রহস্য বুকে করে রুদ্ধ নিশ্বাসে কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছে।
ঘরটায় যে-সব আসবাবপত্র তার কোনোটাই হালফ্যাশানের নয়। দেখলেই বোঝা যায় সাহেবী আমলের–এমনকি বিরাট আয়নাটা পর্যন্ত।
হোটেলের মালিক সুন্দরবাবু বারেবারেই খোঁজ নিচ্ছিলেন আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা।
–অসুবিধে আর কি! আমি বলি, সন্ধ্যের পর থেকে একেবারে চুপচাপ একা। গল্প করার লোক নেই।
সুন্দরবাবু বিনয়ে গলে গিয়ে বলেছিলেন–আপনাদের মতো মানুষের সঙ্গে গল্প করা কি সবার সাধ্যে কুলোয়?
যাই হোক, সারাদিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বিভিন্ন গাছের নাম আর সংখ্যা ডায়েরিতে লিখে সন্ধ্যের ঢের আগেই হোটেলে ফিরে এসে নিজের ঘরটিতে কলাম। এখন হাতে কোনো কাজ নেই। তাই চুপচাপ ঘরটা দেখি। বড়ো বড় জানলা। কাচের শার্শি, নকশা কাটা মেঝে, উঁচু শিলিং। না জানি এ ঘরে কোন সাহেব বা কোন জমিদার বিলাসে ডুবে থাকত! এই যে। বিরাট আয়নাটা–এটাই কি কম পুরনো? এইসব ভাবতে ভাবতে রাত নটা বেজে যায়। হোটেলের ঠাকুরটি গরম গরম মাংস-ভাত দিয়ে গেল। সাড়ে নটার মধ্যেই খাওয়া শেষ।
এরই মধ্যে চারিদিক থমস্থ করছে। জন-মানুষের সাড়া নেই। শুধু মাঝে মাঝে জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে কি একটা পাখির অদ্ভুত ডাক। শুনলে গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায়।
দশটা বাজতেই আমি জানলা-দরজা বন্ধ করে মশারি খাঁটিয়ে শুয়ে পড়লাম। ভাবলামযা নির্জন জায়গা–মানে মানে কটা দিন কাটলে বাঁচি।
সবে পাশ ফিরে শুয়েছি, দরজায় ঠুক চুক শব্দ।
চমকে উঠলাম। জায়গাটা যেরকম তাতে গভীর রাতে যে কোনো ঘটনাই ঘটতে পারে। ভূতের আবির্ভাবও অসম্ভব নয়। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আবার কড়া নাড়ার শব্দ।
কে?
–স্যার, শুয়ে পড়েছেন নাকি?
–না। যাই। বলে চটিতে পা গলিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম।
–এলাম একটু গল্প করতে।
–আসুন ভালোই হলো।
–আপনি তো দেখছি মশারি টাঙিয়ে
–কি করব? মুখটি বুজে–তার ওপর যা মশা
সুন্দরবাবু আমার বিছানায় পা তুলে বসে খোশগল্প শুরু করলেন। প্রথমে আমার ঘর-বাড়ির খোঁজখবর নিলেন–তারপর বমি করার মতো হড়হড় করে নিজের কীর্তিকলাপের একঘেয়ে ফিরিস্তি দিয়ে গেলেন; শেষে আমি যখন এই বাড়িটার কথা জানতে চাইলাম তখনই শুরু হলো আসল গল্প।
তিনি যখন জাঁকিয়ে বসে এ বাড়ির কথা শুরু করতে যাচ্ছেন, আমি তখন তাড়াতাড়ি বললাম–ভূতের ব্যাপার-ট্যাপার নয় তো?
উনি হা-হা করে হেসে উঠলেন।
–আপনার বুঝি ভূতের ভয় খুব?
আমি লজ্জিত হয়ে বললাম–তা নয়, এ জায়গাটাই এমন যে গা ছমছ করে।
উনি অভয় দিয়ে বললেন না, মেটেই ভূতের গল্প নয়। তা ছাড়া এখানে কেউ কোনোদিন ও জিনিসটি দেখেনি।
এই বলে উনি এ বাড়ির ইতিহাস শুরু করলেন। বাড়িটায় শেষ পর্যন্ত যিনি ছিলেন তিনি হলেন এক পাগলা জমিদার। পাগল অবশ্য হয়ে গিয়েছিলেন যেদিন একদল মাতাল ইংরেজ হঠাৎ তার বাড়ি আক্রমণ করে বাড়ির দুজনকে গুলি করে মেরে টাকাপয়সা লুঠ করে পালিয়েছিল। তারপর থেকেই শুরু হয় প্রতিহিংসা নেওয়া। একটির পর একটি করে পাঁচজন সাহেব মেরে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। বহুকাল পর সন্ন্যাসী হয়ে ফেরেন, ভেবেছিলেন মনের পরিবর্তন হয়েছে। আর রক্তপাতে রুচি নেই। কিন্তু
.
বেলা দুটোয় মেমটির আসবার কথা ছবি আঁকতে। মৃগেন্দ্রনারায়ণ তাঁর ঘরে অপেক্ষা করছেন। কি ভাবে খুন করবেন সে পরিকল্পনাও হয়ে গেছে। কোনো হাঙ্গামা নয়, শুধু একটুকরো কাতার দড়িতেই নিঃশব্দে কাজ শেষ হয়ে যাবে। টু শব্দটি পর্যন্ত হবে না।
তারপর অবশ্য আর একটা কাজ থাকবে–লাশ সরানো। সেটা কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। বাড়ির পিছনে অঢেল পোড়ো জমি। কোদালও আছে একটা। এ বয়েসেও গায়ে যথেষ্ট শক্তি। সন্ধ্যের অন্ধকারে মাটি কুপিয়ে মেয়েটাকে পুঁতে ফেলবেন। ব্যস্! কারও সাধ্য নেই ধরে।
দেওয়ালে গির্জের মতো সাবেকি ঘড়িতে দেড়টা বাজল। মৃগেন্দ্রনারায়ণ ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত। খুন করার জন্যে আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারছেন না। হাতে কাতার দড়ির ফাঁস তৈরি। ঘরে ঢুকলেই–
