সুভাষ ডাক্তার নান্টুকে পরীক্ষা করে গম্ভীর হয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি দুটো ইনজেকশন দিলেন। তারপর বসে রইলেন নান্টুর মাথার কাছে।
সারা রাত কাটল এইভাবে। ভোরর দিকে নান্টুর নিশ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল।
সুভাষ ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–আর ভয় নেই। একটা জোর ধাক্কা খেয়েছিল। সেটা সামলে গেছে। তবে পিন্টু আমাকে ডেকে না নিয়ে এলে ওকে বাঁচানো যেত না।
চা খেয়ে হাসিমুখে সুভাষ ডাক্তার ভোরবেলা বেরিয়ে এলেন।
হঠাৎ উনি চমকে উঠলেন–ইস্! এ কী!
সবাই দেখল এতদিনের বেড়ালটা দরজার পাশে মরে পড়ে আছে। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত।
কেউ যেন গত রাত্রে প্রচণ্ড আক্রোশে ওটাকে গলা টিপে মেরেছে।
[আষাঢ় ১৪০৫]
ভয় পেয়েছিলাম
বহুদিন পর নানা তীর্থস্থান ঘুরে শেষে আবার কী হলো মৃগেন্দ্রনারায়ণ ফিরে এলেন নিজের দেশের জঙ্গলমহলের পরিত্যক্ত বাড়িতে।
ফেরার ইচ্ছে ছিল না। জীবনে যে কয়েকটি নৃশংস কাজ ধীরে-সুস্থে পূর্ণজ্ঞানে করেছেন তারই প্রায়শ্চিত্তর জন্যে–আর নিশ্চয় পুলিশের ভয়েও তিনি নিজের দেশ, রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়িঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। প্রায় ত্রিশ বছর বাইরে বাইরে ঘুরে আবার কি এক অদৃশ্য টানে তিনি স্বস্থানে ফিরে এলেন। না ফিরলেই বোধ হয় ভালো হতো।
যাই হোক এই তিরিশ বছরে তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এক মুখ দাড়ি, সন্ন্যাসীর মতো জটা, মসৃণ তেল-চুকচুকে ত্বকের জায়গায় খসে চামড়া, পরনে গেরুয়া আলখাল্লা। তিনি তাঁর বিরাট মহলে ঢুকে একবার চারিদিকে তাকালেন। সব খাঁ খাঁ করছে। অবশ্য এ শূন্যতা নতুন নয়।
বাড়ি ফিরে এসে কোমরে বাঁধা চাবি দিয়ে অনেক কষ্টে মর্চেধরা তালা খুলে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। জানলাগুলো বন্ধ। ভ্যাপসা গন্ধ। একটা বেড়াল ঘরে আটকা পড়ে মরে পচে গিয়েছিল। তার কিছু লোম আর শিরদাঁড়াটা পড়েছিল, মৃগেন্দ্র বাঁ হাতে করে সেটা তুলে নিয়ে চোখের কাছে এনে দেখলেন। দেখে যেন খুশি হলেন। তারপর সেটা জানলা খুলে বাইরে ফেলে দিলেন।
ঘরের একপাশে বিরাট একটা আয়না। মৃগেন্দ্র আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিজের চেহারা দেখে নিজেই আঁৎকে উঠলেন। বোধহয় ভাবলেন কী ছিলেন–আর কী হয়েছেন!
তারপরেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ভাবলেন হয়েছে তা ভালোই হয়েছে। কেউ আর চট্ করে চিনতে পারবে না। যদি বা কেউ সন্দেহ করে তাহলেও তারা বুঝবে সেই নিষ্ঠুর প্রতিহিংসাপরায়ণ মৃগেন্দ্র আর নেই। তার বদলে এক সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী ফিরে এসেছে।
তিনি বড় একটা বাড়ি থেকে বেরোন না। সারা দিন মহলের শূন্য ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ান। তাঁর মনে পড়ে কত সুখের দিনের কথা–সেই সঙ্গে কত দুঃখের দিনের স্মৃতি। ভাবতে ভাবতে ভঁর দুচোখে কখনও জল ভরে ওঠে, কখনও আগুন জ্বলে ওঠে।
এখানে ফিরে এসে এক মাসও কাটল না, মৃগেন্দ্রনারায়ণ ছটফট্ করতে লাগলেন। এই শূন্য বাড়িটার মধ্যে মৃত আত্মারা যেন তাকে কেবলই ধিক্কার দিয়ে বলে–এরই মধ্যে প্রতিশোধ নেওয়া হয়ে গেল? সব ভুলে আজ তুমি সাধু হয়েছ? ছিঃ!
মৃগেন্দ্র তাঁর হাত দুটোর দিকে একবার তাকালেন। তাই তো! হাত দুটো কি ঠুটো হয়ে গেল?
তারপর থেকেই আবার তাঁর খুনের নেশা জেগে উঠল। হিসেব করে দেখলেন পাঁচটা খুন করেছেন। এখনও অন্তত একটা বাকি। তা হলেই পুরোপুরি প্রতিশোধ নেওয়া হয়।
কিন্তু যাকে-তাকে খুন করলে তো হবে না। সাহেব হওয়া চাই। অথচ সাহেব মেলা ভার। দেশ স্বাধীন হবার পর সাদা চামড়ার দল তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়েছে সাগরপারে।
তবে একেবারেই কি দেশ সাহেবশূন্য হয়ে গেছে? না, তা হয়নি। দু-একটা নিশ্চয়ই আছে। খুঁজে বার করতে হবে। মৃগেন্দ্র সেই আশায় পথ চেয়ে রইলেন।
সুযোগ একদিন মিলেও গেল।
সেদিন মৃগেন্দ্র বেরিয়েছিলেন চাল-ডাল কিনতে। ইচ্ছে করেই দুপুরের দিকে বেরিয়েছিলেন যাতে রাস্তায় লোকজন কম থাকে। শটকাট করে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, দেখলেন একটি উনিশ-কুড়ি বছরের ফর্সা ধবধবে মেয়ে ছেলেদের মতো চুল কাটা, কটা চুল, পরনে ফুলপ্যান্ট, গায়ে শার্ট–একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেসান দিয়ে বসে ছবি আঁকছে।
এই তো একটা ক্ষুদে মেম! মৃগেন্দ্রর দু চোখ ঝিকিয়ে উঠল। তিনি খুব সন্তর্পণে মেয়েটির কাছে এসে দাঁড়ালেন। মেয়েটি তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। মৃগেন্দ্র দেখলেন মেয়েটির কটা চোখে এতটুকু ভয় নেই। কেমন অবাক হয়ে দেখছে।
-তুমি যোগী? মেয়েটি ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে সশ্রদ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ, মেমসাহেব, আমি যোগী আছি।
মেয়েটি তখনই উঠে দাঁড়িয়ে মৃগেন্দ্রকে অভিবাদন করল।
–তুমি এখানে কি করছ?
—আমি আর্টিস্ট। জঙ্গলের ছবি আঁকছি।
কই দেখি।
বলেই মৃগেন্দ্র ধপ করে মেয়েটির পাশে বসে পড়লেন। ভারি সুন্দর সেন্টের গন্ধ মেয়েটির গায়ে। একবার ভাবলেন, এখুনি গলাটা টিপে ধরেন। অতিকষ্টে লোভ সামলালেন। না না খুন-খারাপির কাজ এরকম খোলামেলা জায়গায় করা ঠিক হবে না। তিনি অর্ধেক-শেষ হওয়া ছবিটা হাতে তুলে নিলেন।
বাঃ! চমৎকার হচ্ছে।
প্রশংসা শুনে মেয়েটির দু চোখ চক্ করে উঠল।
–আপনার একটা ছবি আঁকতে দেবেন?
–আমার ছবি! মৃগেন্দ্ৰ হা-হা করে হেসে উঠলেন।
