এদিকে বাতাসে প্যাডেল করতে করতে এক পা এক পা করে চারুর হিংস্র প্রেতাত্মা আমার গলা টেপবার জন্যে এগিয়ে আসছে। তার দুই চোখের শূন্য কোটরে দপ্ দপ্ করে জ্বলছে আগুনের শিখা।
এগিয়ে আসছে…..ক্রমেই এগিয়ে আসছে মূর্তিমান বিভীষিকার মতো। মৃত্যু তাহলে নিশ্চিত এল সাঁইত্রিশ বছর বয়েসেই।
ভয়ে চোখ বুজলাম।
আর তখনই শুনলাম নকুলের চিৎকার–পাদ্রীবাবা, ঐ যে–ঐ যে–স্বচক্ষে দেখুন।
আমি চোখ খুললাম। দেখলাম পাদ্রীবাবা গায়ে তার সেই জোব্বা চাপিয়ে ক্ৰসখানি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছেন চারুর প্রেতাত্মার দিকে।
চারুও আমাকে ছেড়ে এক পা এক পা করে পিছোতে লাগল।
নির্ভীক প্রৌঢ় পাদ্রীবাবাও পবিত্র ক্রসটি হাতে নিয়ে চারুর মুখোমুখি হলেন। তিনি ভেবেছিলেন এই ক্রসটি প্রেতাত্মার সামনে ধরলেই অশুভ শক্তি পিছু হটবে।
কিন্তু তা হল না। মৃত্যুর পর কুড়ি বছর ধরে চারু অজেয় হয়ে ওঠার জন্যে কী কঠোর সাধনা করেছিল কে জানে! আমাদের হতচকিত করে দিয়ে সে হঠাৎ হাত দুটোকে দুটো বিরাট কালো ডানায় রূপান্তরিত করে লাফিয়ে ওপরে উঠে গেল। তারপর ডানার ঝাঁপটায় পাদ্রীবাবাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে বাতাসে ভেসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড একটা শব্দ হল।
মনে হল কাছেই কোথাও বাজ পড়ল। কিন্তু কোথায় বোঝা গেল না।
পাদ্রীবাবা উঠে দাঁড়ালেন। বিমর্ষভাবে বললেন, এমন দুর্ঘটনা আমার জীবনে কখনও ঘটেনি। পবিত্র ক্রসকেও মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিল! হাত দুটো ওর জ্বলে গেল না?
একটু থেমে বললেন, নকুল যখন ছুটতে ছুটতে গিয়ে আমায় সব কথা বলল তখন ভাবতে পারিনি আমাকে এমন একটা দুর্ধর্ষ আত্মার মুখোমুখি হতে হবে। তা হলে প্রস্তুত হয়ে আসতাম।
ভয়ে ভয়ে বললাম, তাহলে এখন আমরা কী করব? বাড়িতে তো শুধু আমি আর নকুল।
পাদ্রীবাবা বললেন, সেটা আজ রাত্তিরে ভেবে দেখব। কাল সকালে যা হয় করবেন, তার আগে এখুনি চলুন বাজটা কোথায় পড়ল দেখি।
বাজ! নকুল বলল, শব্দ শোনা গেল বাড়ির মধ্যে অথচ রাস্তার কেউ শুনতে পেল না! এ কেমন বাজ?
পাদ্রীবাবা বললেন, চলো তো ভালো করে দেখি। অত জোর শব্দ হল অথচ বাড়ির ক্ষতি হল না। আশ্চর্য!
তখনই দুটো লণ্ঠন হাতে নিয়ে ঘরগুলো দেখলাম। না, কোথাও একটা ইটও ভেঙে পড়েনি।
পাদ্রীবাবা হঠাৎ আমার হাত থেকে লণ্ঠনটা নিয়ে উঁচু করে তুললেন।
ঐ যে দ্যাখো! ওর আক্রোশ যার ওপর তার ক্ষতি করবেই।
দেখলাম আলমারির ওপর থেকে পড়ে বায়া-তবলাটা ফেটে চৌচির হয়ে পড়ে রয়েছে।
.
১০.
সে রাত্রে খুব ভয়ে ভয়ে শোবার ঘরে ঢুকে খিল লাগালাম। মনে হল, মৃত চারু আজ যে শক্তি সঞ্চয় করেছে তাতে ঐ কাঠের দরজা দূরের কথা লোহার দরজাও তাকে ঠেকাতে পারবে না।
অমন যে নানা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী পাদ্রীবাবা–তিনিই পারলেন না চারুর সঙ্গে। তিনিই বলে গেলেন চারু হয়তো আবার আসবে আরও ভয়ংকর শক্তি নিয়ে আমাকে শায়েস্তা করতে। অথচ তাকে ঠেকাবার কোনো উপায়ই বাৎলাতে পারলেন না। শুধু ভরসা দিয়ে গেলেন কাল সকালে এসে ব্যবস্থা করবেন।
কাল সকাল! তার আগে গোটা রাতটা কাটবে কী করে?
ঘরের মধ্যে উৎকট নাক ডাকার শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে নকুল। সাধারণত সে আমার পাশের ঘরে শোয়। আজ যে এ ঘরে এসে শোবে তার জন্যে আমার অনুমতি নেওয়াও দরকার মনে করেনি। সন্ধের মুখে এই বাড়িতেই প্রেতাত্মার ভয়ংকর হানার পরও কেউ যে একা একটা ঘরে শুতে পারে তা ভাবা যায় না। আমিও ভাবিনি। একবার ভেবেছিলাম নকুলকে ডেকে নেব। তা দেখি নকুল নিজেই এসে বেছে বেছে অপেক্ষাকর নিরাপদ জায়গা হিসেবে টেবিলের আড়ালে বিছানা পেতে নিয়েছে।
ও দেখছি আরও একটি কাজ করে রেখেছে। সব জানলাগুলি বন্ধ করে রেখেছে। এমনকি জানলার ফাঁকগুলোতে কাগজ গুঁজে দিয়েছে।
এতক্ষণে ঘুমে চোখ তুলে আসছিল। বালিশের পাশে টর্চটা ঠিক মতো আছে কিনা দেখে নিয়ে ভগবানের স্মরণ করে চোখ বুজলাম।
কতক্ষণ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিলাম জানি না। হঠাৎ দড়াম করে একটা শব্দ হল। ধড়মড় করে উঠে বসে টর্চ জ্বালোম। দেখি উত্তর দিকের জানলার একটা পাট খুলে গেছে। ঝড় নেই, বৃষ্টি নেই জানলার পাটটা খুলে গেল কী করে? আপনাআপনি?
নকুলেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ভয়ে ভয়ে ডাকল, দাদা।
অভয় দিয়ে বললাম, ও কিছু নয়। জানলাটা খুলে গেছে।
মশারির ভেতর থেকেই নকুল বলল, কিন্তু আমি তো দাদা, সন্ধেবেলাতে সব জানলার ছিটকিনি এঁটে দিয়েছিলাম।
তার কোনো উত্তর না দিয়ে বিছানা থেকে নেমে টর্চ জ্বেলে জানলাটা ভালো করে বন্ধ করে দিলাম।
এতক্ষণে মনে হল ঘরটা যেন বড্ড বেশি অন্ধকার। অথচ স্পষ্ট মনে আছে শোবার আগে ডিম লাইটটা জ্বেলে রেখেছিলাম।
সুইচবোর্ডে টর্চের আলো জ্বেলে দেখি সুইচটা অফ করা আছে। কী আশ্চর্য! আমি হলপ করে বলতে পারি ঐ সুইচ আমি নিজের হাতে অন করে আলো জ্বেলে তবে শুয়েছি।
তাহলে? তাহলে ওটা অফ করে গোটা ঘর অন্ধকার করে রাখল কে? কেনই বা করল?
নকুল ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল, কিছু গোলমাল?
বললাম, না। তুমি ঘুমোও।
সকালে ধড়মড় করে উঠেই যখন দেখলাম আমার হাত, পা, ঘাড়, গলা ঠিক আছে আর নকুল ঘরের জানলাগুলো সাবধানে খুলছে তখনই মনে পড়ল সকালবেলাতেই পাদ্রীবাবার আসার কথা। তার আসাটা যে কতখানি দরকার তা শুধু আমিই জানি। সারা রাত্রি চিন্তা ভাবনা করে তিনি আজ আমাকে জানাবেন এই ভয়ংকর প্রেতাত্মার হাত থেকে কী ভাবে নিষ্কৃতি পাব। তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে, চা খেয়ে অপেক্ষা করে রইলাম। অপেক্ষা করছি তো করছিই। পাদ্রীবাবার পাত্তা নেই।
