কিন্তু ডাকটা ঐ মুহূর্তের জন্যে। রুমা নিজে কানে শুনেছে। এই কি সেই মরণডাক? নান্টুদা শুনতে পায়নি তো?
বিছানা পাতা হয়ে গেছে। মশারি টাঙানো হচ্ছে..বাইরে চাপা অন্ধকারের মধ্যে অটুট স্তব্ধতা যেন স্থির হয়ে চেপে বসে আছে।
রুমা উত্তরের জানলা দিয়ে পুজো-দালানটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল ঝনঝন করে যে শব্দটা একটু আগে সে নিজেও কানে শুনেছিল আর এখনি যে বিকট শব্দটা শুনল সে দুটো কিসের শব্দ হতে পারে!
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মনে হলো চারিদিক যেন কেমন থমথম করছে যেমন ঝড়ের আগে হয়। এতক্ষণ ঝোপেঝাড়ে দুএকটা ঝিঁঝি ডাকছিল, সে ডাকটাও হঠাৎ থেমে গেল। গাছগুলোর পাতা একটু একটু নড়ছিল, তাও যেন থমকে গেল। আর–এ কী! নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কেন? শুধু কি তারই না সকলের?
হঠাৎ বাঁশঝাড় কাঁপিয়ে যমপুকুরের দিক থেকে একটা অদ্ভুত হাড়-কাঁপানো শব্দ ভেসে এল–ওঁওঁওঁ…হু-হুঁ-হুঁ
শব্দটা ক্রমেই এই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে…
যাতে নান্টু শুনতে না পায় সেইজন্যে রুমা এক ঝটকায় জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে ছুটে গেল পাশের ঘরে। দেখল নান্টু চৌকিটা চেপে ধরে থরথর করে কাঁপছে।
মামীমা…মামা..পিন্টু..শীগগির এসো।
কিন্তু কে আসবে? সেই ভয়ংকর অপার্থিব শব্দে সবাই নিস্পন্দ হয়ে গেছে। তারা জানে এই সেই মরণডাক। এই ডাক শোনা যায় তখনি গ্রামের কেউ একজন অপঘাতে মরবে। তারপর মরবে আর একজন মানুষ–পুরুষ কিংবা স্ত্রী, শিশু কিংবা বৃদ্ধ। তারপর কোনো গৃহপালিত জীব।
নান্টু-নান্টু, কি হয়েছে? মা পড়িমরি করে ছুটে এল।
মা-মা, ও আমায় নিতে এসেছে। তুমি আমায় বুকের মধ্যে চেপে ধরো। আমায় যেতে দিও না।
নান্টুর মা অতবড়ো ছেলেকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে রইল।
শব্দটা যেন শূন্য থেকে নেমে এবাড়ির দক্ষিণ দিকের বন্ধ জানলায় ঝাঁপটা মেরে পুজো দালানের মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে গেল।
.
একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে নান্টু মায়ের বুক থেকে মাটিতে ঢলে পড়ল।
ও মা! কী হলো গো! আর্তনাদ করে উঠল নান্টুর মা।
একটু জল জল নিয়ে আয় পিন্টু।
পিন্টু ছুটে গিয়ে এক ঘটি জল নিয়ে এল। জলের ঝাঁপটা দিতে দিতে নান্টুর জ্ঞান অল্প অল্প ফিরে এল। কিন্তু তারপরেই শুরু হলো পেটের যন্ত্রণা। পেটের যন্ত্রণা থেকে মাথার যন্ত্রণা, মাথার যন্ত্রণা থেকে পিঠ।
ও মা! এ আমার কী হলো?
স্থাণুর মতো চৌকির ওপর বসে আছেন নান্টুর বাবা।
রুমা উত্তেজিতভাবে বলল–মামা, এখুনি ডাক্তার ডাকা দরকার।
বিহ্বল গলায় মামা বলল–এত রাত্রে ডাক্তার কোথায় পাবে?
এদিকে নান্টুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। অথচ কেউ বুঝতে পারল না একটা সুস্থ সবল ছেলে, হঠাৎ তার কী হলো?
তবু ডাক্তারের খোঁজে তো যেতে হবে। ঐ দেখুন গোটা মুখটা কিরকম ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে।
যাচ্ছি। বলে প্রৌঢ় মামা গায়ে পাঞ্জাবি চড়িয়ে, টর্চ লাঠি নিয়ে বেরোতে যাচ্ছিলেন, পিন্টু বললে–তুমি শোওগে। আমি যাচ্ছি।
চমকে উঠল রুমা।–তুই ছেলেমানুষ। এত রাতে একা যাবি?
যেতেই হবে। দাদাকে তো বাঁচাতে হবে।
বলে তাড়াতাড়ি জামা-প্যান্ট পরে নিয়ে কোণের ছোট্ট ঘরে গিয়ে দাঁড়াল।
নানা পরিত্যক্ত জিনিসের মধ্যে দেওয়ালে ঝুলছে তরোয়ালটা। ধীরে ধীরে সেটা পেড়ে নিল। কাপড়ের ঢাকাটা খুলে ফেলতেই তোয়ালের ইস্পাতটা ঝকঝক করে উঠল। সাইকেলটা নিয়ে পিন্টু বেরিয়ে পড়ল। রুমা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। দুহাত জোড় করে মনে মনে বলল–ঠাকুর, রক্ষে কোরো।
.
অন্ধকার, শুধু অন্ধকার। তারই মধ্যে দিয়ে দুচোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে সাইকেল চুটিয়ে চলেছে পিন্টু। বাঁ হাত দিয়ে চেপে ধরেছে হ্যাঁন্ডেল। ডান হাতে খোলা তরোয়াল। তরোয়ালটা ঘোরাচ্ছে বাঁ দিক থেকে ডান দিক। যেন সমস্ত পার্থিব-অপার্থিব বাধা কাটিয়ে পথ করে নিচ্ছে।
রাস্তার ধারের দোলা আমগাছটার একটা ডাল ঝুঁকে পড়েছিল রাস্তার ওপর। হঠাৎ কী যেন মাথার ওপর পাখা ঝাঁপটে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পিন্টু তরোয়ালের উল্টো পিঠ দিয়ে ডালে আঘাত করল। আর তখনই এক ঝাঁক বাদুড় জাতীয় কিছু পাখা জাপটে তার মাথার ওপর উড়তে লাগল।
পিন্টু জোরে সাইকেলটা চালাতে লাগল। কিন্তু সেগুলো যেন তার মাথা লক্ষ্য করেই এগিগে আসতে লাগল। পিন্টু এবার মাথার ওপর তরোয়ালটা ঘোরাতে লাগল।
এক মাইল দূরে ডাক্তারের বাড়ি। কেমন যেন আত্মভোলা হয়ে গিয়েছিল পিন্টু। বুঝতে পারছিল না কতদূর এসেছে।
হঠাৎ কাছেই জলের ওপর ঝপ করে কিছু পড়ার শব্দ শুনেই ডান দিকে তাকাল।
যমপুকুর।
হায়! এতক্ষণে যমপুকুর! তখনই সে একটা শব্দ শুনে চমকে গেল। কেউ যেন পুকুরটায় ডুব দিচ্ছে আর উঠছে।
আশ্চর্য! এত রাতে কে পুকুরে স্নান করছে?
পিন্টু সেদিকে তাকাল না। সোজা সাইকেল চালিয়ে চলল।
.
সত্যিই যে এত রাত্রে ডাক্তার আসবেন কেউ ভাবতে পারেনি। পরিচিত ডাক্তার। নান্টুর অসুখ গুরুতর শুনে না এসে পারেননি। তখনই ওষুধের ব্যাগ আর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন।
পিন্টুর হাতে খোলা তরোয়াল দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন–ও যে সত্যিকারের তরোয়াল! হঠাৎ তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছ।
পিন্টু বলল–সুভাষদা, এত রাতে একা আসতে ভয় করছিল। এ তরোয়াল আমাদের পূর্বপুরুষের। এর কোনো মহিমা আছে কিনা জানি না। তবে এটা হাতে তুলে নিতেই প্রচণ্ড সাহস পেলাম।
