রুমা ইতস্তত করে বলল–ঘরে আছে। শরীর ভালো নেই।
কেন? ওর আবার কী হলো?
বলতে বলতে ওরা ঘরে ঢুকে পড়ল।
জানিস নান্টু, তাজ্জব ব্যাপার। আজ সকালে দেখলাম গিরি গয়লানীর ঘরের সামনে ভিড়। তার অত সাধের আমগাছটার একটা শক্ত ডাল ভেঙে পড়েছে। কি করে ভাঙল কে জানে! কাল তো ঝড়ও হয়নি।
অন্য বন্ধুটি বলল–আরও অবাক কাণ্ড–ওর ঘরে শেকল তোলা ছিল। দেখা গেল দরজাটা হাট করে খোলা।
নান্টুর ভয়ার্ত উদভ্রান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রুমা তাড়াতাড়ি বলল–ও কিছু নয়। চোরটোর ঢুকেছিল।
চোর! বন্ধুরা বলে উঠল–ওর ছিল কী যে চোর চুরি করতে ঢুকবে? তাছাড়া গিরির জিনিস চুরি করে কেউ রেহাই পাবে মনে করেছ? পেত্নী হয়ে ঘাড় মটকাবে। যার ওপর ওর একবার রাগ হবে, মরেও তাকে রেহাই দেবে না। বেরোবি নাকি?
নান্টু মাথা নাড়ল।–না। শরীর খারাপ।
ওরা চলে গেল।
দুপুরে খেয়েদেয়ে নান্টু টেনে ঘুমল। এমন নিশ্চিন্ত ঘুমল যেন তার মনে আর ভয় নেই। বিকেলবেলা প্যান্ট আর হাওয়াই শার্টটা পরল।
নান্টুর মা খুশি হয়ে বলল–বেরোচ্ছিস?
হ্যাঁ। দেখি কি হয়।
হওয়া-হওয়ির আবার কী? যা ঘুরে আয়।
রুমা বলল–আমিও যাব?
না। তুই আর কতদিন পাহারা দিবি? পাহারা দিয়েও কি আমায় ধরে রাখতে পারবি?
বলেই বেরিয়ে গেল। কিন্তু পনেরো মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল।
কি রে, এর মধ্যেই ফিরে এলি?
নান্টু উত্তর দিল না।
রুমা জিজ্ঞেস করল কতদূর গিয়েছিলি?
এদিক থেকে ওদিক।
মানে?
একদিকে বাঁশঝাড়, অন্যদিকে দত্তদের পুজো-দালান। দুটোই দেখলাম।
হঠাৎ কি দেখতে গিয়েছিলি?
আমার বিপদটা কোনদিক থেকে আসবে। সেই রাস্তার ওপর অশরীরী মানুষটা আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিল গিরি বাঁচবে না। ঠিক তখনই গিরি আমার গলা টিপে মারতে গিয়েছিল। তার অর্থ ওর হাতেই আমার মৃত্যু আছে। কাল রাত্তিরে পুজো-দালানে বলির বাজনা আমায় জানিয়ে দিল–আমার মাথার ওপর খাঁড়া ঝুলছে।
নান্টুর মার মুখ শুকিয়ে গেল। রুমা আঁৎকে উঠল। এসব কথা কি কোনো সুস্থ ছেলের লক্ষণ? একি শুধুই একটা অলৌকিক ভয়, না আরও কিছু?
তখন সন্ধ্যেবেলা।
মা বলল–ছানাটুকু খেয়ে নে।
নান্টু উদাসভাবে বলল-দা-ও। খেয়েনি।
এমনভাবে বলল যেন শেষ খাওয়া খেয়ে নেবে।
খানিকটা খেয়ে বললউঃ! পোড়া গন্ধ।
বলে বাকিটা ফেলে দিল। বেড়ালটা বসে ছিল কাছে। চেটেপুটে খেয়ে নিল।
ঘরে টি.ভি. চলছিল।
বড়ো ঘরে বসে সবাই টিভি দেখছিল। এই ঘরেরই উত্তর দিকে জানলা দিয়ে দেখা যায় সেই রহস্যময় পুজো-দালানটা। একসময়ে যেখানে বলি বেধে গিয়ে সর্বনাশ হয়েছিল। আজও নাকি মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঢাক বাজে, ডিম ডিম করে। অনেকেই শুনেছে। দক্ষিণ দিকের জানলা দিয়ে দেখা যায় এবাড়ির উঠোনের ওপর মস্ত ধানের গোলাটা। তারই পাশ দিয়ে দুপা গেলেই সদর দরজা।
ঘরের মেঝেতে সবাই বসে। পিন্টু শুয়ে আছে খাটে। নান্টু বসে আছে খাটে দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে। বেড়ালটা রয়েছে মেঝেতে। সবাই টি.ভি. দেখছে। কিন্তু নান্টু দেখছে না। সে অন্যমনস্ক। তার চোখ ছুটছে একবার এ জানলার দিকে, একবার অন্য জানলা দিয়ে দরজার দিকে। বাইরে জমাট অন্ধকার। সে যেন সেই দুর্ভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছে।
ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত আটটা বাজল। দূরে জঙ্গলের মধ্যে কি একটা জন্তু ডেকে উঠল–যেন বড়ো কোনো সাপ কিছু ধরেছে।
হঠাৎ ঝন ঝন করে শব্দ। শব্দটা এল দরজার দিক থেকে। নান্টু চমকে উঠল। রুমাও।
নান্টুর চোখ দুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। অথচ অন্যেরা একমনে টি.ভি. দেখছে। বোধ হয় তারা শুনতে পায়নি।
কিসের শব্দ হলো? নান্টু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল।
ও কিছু না। সাহস দিয়ে রুমা বলল–গোয়ালে বালতি ছিল, বোধহয় গরুর পায়ে লেগে–
কিন্তু শব্দটা তো দরজার দিক থেকে এলো।
ঠিক আছে। আমি দেখছি।
না-না, তুই যাসনে। মামার বাড়ি দুদিনের জন্যে বেড়াতে এসে কেন প্রাণটা খোয়াবি?
তুই চুপ কর তো।
বলে রুমা টর্চটা নিয়ে উঠে পড়ল।
পিন্টু বলল–কিরে রুমাদি?
কিছু না। কিসের যেন একটা শব্দ হলো।
দাঁড়া আমিও দেখি।
ওরা দুজনে চলল। নান্টুর কি মনে হলো সেও পিছু পিছু চলল।
দরজা বন্ধই ছিল। খিল খুলে পিন্টু আর রুমা বাইরে বেরিয়ে তন্নতন্ন করে দেখল। কিছু চোখে পড়ল না। অথচ রুমা নিজেও শব্দটা শুনেছে। আর তা এই দরজার বাইরেই।
ঘরে ফিরে এল তিনজনেই।
হঠাৎ নান্টু তাড়াতাড়ি প্যান্ট ছেড়ে গামছাটা পরে নিল।
ওর মা বলল–গামছা পরছিস কেন? পায়খানা যাবি?
হ্যাঁ, শরীরটা কেমন করছে।
লণ্ঠনটা নিয়ে যা। আর পিন্টু না হয় দাঁড়াক।
পায়খানা একটা বাড়ির ভেতরে আছে। আর একটা বাইরে। নান্টু ভেতরের পায়খানায় যেত না। বলত–ওটা মেয়েদের জন্যে। রাত দুপুরেও কত দিন একা একা বাইরের পায়খানায় গিয়েছে। কিন্তু আজ দরজার খিল খুলেও যেতে পারল না।
তবে ভেতরের পায়খানায় যা।
নান্টু উত্তর না দিয়ে ওর ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। পায়খানা গেল না।
এ ঘরে আয় না।
নান্টু এল না।
রাত সাড়ে দশটা। সবাই খেয়ে নিল। নান্টু খেল না। বলল–শরীর খারাপ করছে।
কি হচ্ছে?
আমি জানি না মা-জানি না।
আজ আমাদের ঘরে শো।
একটু পরে।
হঠাৎ ভয়ংকর একটা শব্দ ভেসে এল। ঠিক কোন দিকে থেকে এল বোঝা গেল না। মনে হলো কিছু একটা শূন্যে ভাসতে ভাসতে ডেকে গেল। পাখির ডাক কি এইরকম হয়?
