তবে ডাক।
রুমা মশারি থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে নান্টুকে ডাকতে গেল। দেখল এই গরমে ও ঘরের সব জানলা বন্ধ। নান্টুদা ঘুমোয়নি। খাটে বসে এক মনে গায়ত্রী জপ করছে যা সে কখনো করে না। পাশে পিন্টু নিশ্চিন্তে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে।
নান্টুদা এমন একাগ্র মনে গায়ত্রী জপ করছে যে তার ধ্যান ভাঙাতে ইচ্ছে হলো না। রুমা পা টিপে টিপে নিজের ঘরে ফিরে এল।
এটা ছিল সোমবার। গিরি গয়লানীর মারা যাবার প্রথম দিন।
.
০৫.
মঙ্গলবার।
আজ বন্ধুর বোনের বৌভাত। কাছেই শ্বশুরবাড়ি। ওরা বিশেষ করে এদের দুভাইকে যেতে বলেছে।
বিকেল পর্যন্ত নান্টু টানা ঘুম দিয়েছে। শরীরটা এখন বেশ ঝরঝরে।
মা বলল–বৌভাতে যাবি। তাড়াতাড়ি সেজেগুজে নে।
মুহূর্তে নান্টুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল–না, আমি যাব না।
মা অবাক হয়ে বলল–কেন?
তুমি বুঝতে পারছ না মা, আমার সামনে ভয়ানক বিপদ।
কিসের বিপদ?
তা আমি বোঝাতে পারব না।
তুই কি সত্যি ভয় পেয়েছিস?
হ্যাঁ।
রুমা কান খাড়া করে রইল। এবার যদি ও সব ঘটনাটা বলে।
কিসের ভয়?
তা জানি না। শুধু এইটুকু বলতে পারি কাল সন্ধ্যে থেকে কেউ যেন আমাকে লক্ষ্য করছে–আমাকে ডাকছে একটা ভয়ংকর কালো মুখ।
ওসব মনের ভুল।
মনের ভুল নয় মা। তুমি তো জান আমি আজ পর্যন্ত কত মড়া নিয়ে গিয়েছি, পুড়িয়েছি, সারা রাত জেগে ঐ সদানন্দ স্যাকরার মড়া আগলেছি। তখন তো এমন ভয় পাইনি।
এখনই বা ভয় কিসের? বিয়েবাড়ি গেলেই পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলে সব ভুলে যাবি।
তা হয়তো যাব। কিন্তু তারপর? ফেরার সময়ে ঐ গিরি গয়লানীর বাড়ির কাছ দিয়েই তো ফিরতে হবে। বৌভাত তো গিরির পাড়াতেই। অন্ধকারের মধ্যে ওর শেকলতোলা শূন্য ঘর আর আম গাছটা দেখলেই–নান্টুর শরীরটা কেঁপে উঠল।
মা তবুও অভয় দিয়ে বলল-ওদিক দিয়ে না এসে একটু ঘুরে যমপুকুরের পাশ দিয়ে আসবি। তাছাড়া পিন্টুও তো তোর সঙ্গে থাকবে।
তাই যা নান্টুদা। নে–নে দেরি করিস না।
অগত্যা পিন্টুকে নিয়ে নান্টু বেরিয়ে পড়ল।
রাত প্রায় এগারোটা। দুভাই নির্জন রাস্তা দিয়ে হনহন করে আসছে। পাশেই যমপুকুর। গভীর কালো জল। নান্টুর মনে হলো–পুকুরটার ঐ রকম বিশ্রী নাম রাখা হলো কেন?
অদ্ভুত ব্যাপার। এই গ্রামেই তার জন্ম। এই পুকুরের পাশ দিয়ে ও কতবার গিয়েছে। কোনো দিন এইরকম কৌতূহল হয়নি। হঠাৎ আজই।
কি রে দাদা, কথা বল কিছু?
কথা? কথা যোগাচ্ছে নারে। আচ্ছা যমপুকুর নাম হলো কেন? নিশ্চয় অনেক লোক ডুবেছে। তুই কি বলিস?
হতে পারে।
অপঘাতে মৃত্যু তো।
তাছাড়া কি।
নান্টু চুপ করে হাঁটতে লাগল। তারপরই হাঁটার বেগ বাড়িয়ে দিল।
কি রে দাদা, অমন করে ছুটছিস কেন?
গন্ধ পাচ্ছিস না? একটা মানুষ-পোড়ার চিমসে গন্ধ?
নিশ্বাস টেনে পিন্টু বলল-কই না তো?
তবে হয়তো আমারই মনের ভুল।
হঠাৎ পাশের ঝোপটা যেন জোরে নড়ে উঠল। নান্টু চাপা উত্তেজনার চেঁচিয়ে উঠল– কে? কে ওখানে?
সঙ্গে সঙ্গে পিন্টু টর্চের আলো ফেলল। ঝোপঝাপ দুলিয়ে কিছু যেন একটা পুকুরের দিকে চলে গেল।
দেখতে পেলি?
পিন্টু বলল– না।
কি মনে হয়?
বোধহয় শেয়াল।
শেয়াল! শেয়াল এখন আর আছে নাকি?
দু-একটা থাকতে পারে। তুই হাঁট তো।
সারা পথ আর কেউ কথা বলেনি। বাড়ি যখন পৌঁছল রাত তখন বারোটা বাজে।
.
০৬.
বুধবার।
আজ সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। একটা শোঁ শোঁ করে বাতাস ক্রুদ্ধ অপদেবতার নিশ্বাসের মতো বাঁশঝাড়ের পাতা কাঁপয়ে দাপাদাপি করছিল।
ঘুম থেকে উঠল নান্টু। বেজার মুখ। চা খেল। কিন্তু কারো সঙ্গেই কথা বলছিল না।
সবাই ঘরে বসেছিল। একসময়ে নান্টু বলল কাল রাতে কোনো পুজো ছিল?
রুমা বলল–এখন পুজো থাকার তো কথা নয়। তবে এখানে এসময়ে কোনো বিশেষ পুজো হয় কিনা জানি না। কেন?
নান্টু বলল কাল অনেক রাতে ঢাকের শব্দ পাচ্ছিলাম। অনেকগুলো ঢাক বাজছিল। ঠিক যেন বলিদানের বাজনা!
নান্টুর মা ধমক দিয়ে বলল–তুই ওঠ তো। বুড়োদের মতো সকাল থেকে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে ঢাকের শব্দ শুনছে।
নান্টু উঠল না। কেমন অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রইল সেই পুজোবাড়ির দিকে। অস্বাভাবিক আতংকে ভরা চোখ।
রুমা বলল–নান্টুদা, তুই একটু ও পাড়ায় যা। আজ হাটবার। কিছু বাজার করে আন তো।
দূর বাজার! তোরা যাস। বলেই মাটিতে শুয়ে পড়ল।
বেলা এগারোটা।
এই একটা জিনিস রুমা লক্ষ্য করছে আজ নান্টুদা খুবই অনমনস্ক। সবসময়েই কি যেন ভাবছে আর যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়ছে।
মামীমা অধৈর্য হয়ে বললেন–তোর কী হয়েছে বল তো? কি ভাবছিস? ওরকম ঢিস ঢিস করে শুয়ে পড়ছিস কেন?
সে কথার উত্তর না দিয়ে নান্টু যেন আপন মনেই বলল–অপঘাতে মৃত্যু। তিনদিন হলো। আজ ওর ঘাট।
তাই নিয়ে তোর ভাববার কী আছে?
তারও কোনো উত্তর না দিয়ে নান্টু বলতে লাগল–গভীর রাত। নির্জন রাস্তা। একটা গাড়ি ছুটছে। সামনেই একটা লম্বা মতো লোক। রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে হাঁটছে…পাশেও সরে যায়নি..তাকে আর দেখা গেল না। তারপরেই একটু মুমূর্য রুগী কটমট করে তাকাল..দুহাত দিয়ে গলাটা টিপে ধরল…
বলেই নান্টু ধড়মড় করে উঠে পড়ল–কেউ কড়া নাড়ছে না?
রুমা বলল–তুই বোস। আমি দেখছি।
ভালো করে দেখে খুলবি। বলেই সে একছুটে ঘরে গিয়ে ঢুকল–যেন লুকোতে চাইল।
দরজা খুলে রুমা দেখল নান্টুর দুই বন্ধু। তারা জিজ্ঞেস করল–নান্টু কোথায়?
