কেন পুকুরে স্নান করবে না সে কথা জিজ্ঞেস করতে কারও সাহস হলো না। বাড়িতে স্নান করে খেতে বসল। কিন্তু খেতে পারল না। বলল–পোড়া গন্ধ।
তারপরই বিছানায় শুয়ে পড়ল।
সবাই বুঝল গিরির পোড়া দেহটা অতদূর নিয়ে গিয়েছিল, সেই গন্ধটাই লেগে রয়েছে।
বিকেলে ঘুম থেকে উঠল। এখন অনেকটা স্বাভাবিক। রুমা ওর কাছে-কাছেই রয়েছে। খুব ইচ্ছে সারা রাত নান্টুদা একা ঐ মুমূর্ষ মেয়েটাকে নিয়ে কীভাবে গেল সব কথা শোনার। গিরিকে কেউ পছন্দ করে না। বিশেষ করে নান্টুদার ওপর গিরির কীরকম রাগ সকলেই তা জানে। সেই গিরিকে বাঁচাবার জন্যে একমাত্র তার নান্টুদাই ছুটল এ কী কম কথা! তবু এই মুহূর্তে ওকে জিজ্ঞেস করতে সাহস পাচ্ছিল না।
বেড়ালটা অভিমান ভুলে নান্টুর গা ঘেঁষে বসল। নান্টু আদর করতে লাগল।
সকালে তুই ওকে এমন লাথি মারলি–রুমা বলল।
লাথি মেরেছিলাম নাকি?
বাঃ! এরই মধ্যে ভুলে গেলি?
মনে পড়ছে না তো।
অন্য দিন পুকুরে সাঁতার কাটিস। আজ পুকুরে গিয়েও ফিরে এলি কেন?
এ কথার উত্তর দেবার আগেই নান্টু হঠাৎ বেড়ালটার গা থেকে হাতটা টেনে নিল।
কি হলো?
বেড়ালটার মুখে কালো দাগটা দেখেছিস?
হ্যাঁ। ও দাগ তো ওর জন্ম থেকে।
নান্টু একটু গম্ভীর হয়ে বলল–বোধহয় কোনোদিন পুড়ে গিয়েছিল।
পুড়ে গিয়েছিল! তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নান্টুদা। কেবলই পোড়া দেখছিস।
নান্টু চুপ করে রইল। তারপর বলল–আমিও বোধহয় পুড়ে মরব কোনো দিন।
কী যে বলিস!
পোড়া যে কী ভয়ংকর তা না দেখলে বুঝতে পারবি না।
খুব পুড়েছে?
না। তেমন নয়। শুধু মুখের অর্ধেক, গলা, পিঠের খানিকটা।
তবে হয়তো বেঁচে যাবে।
নান্টু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–নাঃ বাঁচবে না।
কেন?
আমি বুঝতে পারছি।
তুই ডাক্তার না গণৎকার?
ওসব কিছু নয়। কিন্তু আমি জানি।
রুমা আর কিছু বলল না। সবই যেন তার হেঁয়ালি বলে মনে হচ্ছে।
নান্টু হঠাৎ যেন নিজের মনেই বলতে লাগল–একটা ঢ্যাঙা মতো লোক গভীর রাতে রাস্তার মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে। একটা গাড়ি বার বার হর্ন দিচ্ছে, কিন্তু সে পথ ছাড়বে না। রাস্তার মাঝখান দিয়েই হাঁটছে লম্বা লম্বা পা ফেলে। ড্রাইভার আর কি করবে, চোখ বুজিয়ে টপ স্পিডে সোজা গাড়ি চালিয়ে দিল। কিন্তু লোকটা চাপা পড়ল না। পাশেও সরে যায়নি। অথচ তাকে আর দেখা গেল না।
কথা শেষ করে নান্টু কেমন একরকম ভাবে পিছনের পুজো-বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
এমনি সময়ে বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। রুমা দরজা খুলে দিল। ফিরে এসে বলল-নান্টুদা, তোকে ডাকছে।
যেন চমকে উঠে নান্টু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল।
মিনিট দুই পরে রুমা শুনল নান্টুদা রেগে উঠে বলছে–না, আমি পারব না। তোরা যা।
যারা এসেছিল তারা অবাক হয়ে ফিরে গেল।
কি বলছিল ওরা? রুমা জিজ্ঞেস করল।
গিরি আজ সকালে মরেছে। বডি নিয়ে আসতে হবে। না, না, আমি পারব না। বলে নান্টু ঘরে ঢুকে পড়ল।
যে ছেলে দুপুরে খেয়েদেয়ে বেরিয়ে যেত আর ফিরত রাত নটায়, সেই ছেলেই সেই যে ঘরে এসে ঢুকল আর বেরোল না।
সবাই লক্ষ্য করল নান্টুর গোটা মুখ কিরকম কালো হয়ে গেছে। নিজের ঘরে চৌকির ওপর বসে আছে উবু হয়ে। একেবারে চুপ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ও ভয় পেয়েছে।
বাড়ির মধ্যে একমাত্র রুমাই নান্টুর মেজাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সাহস করে কথা বলতে পারে। তাই ওই সাবধানে বলল–কি হয়েছে তোর? একটু বাইরে থেকে ঘুরে আয় না। আমিও না হয় তোর সঙ্গে যাচ্ছি।
তুই যাবি? তবে চল।
দুজনে বেরোতে যাচ্ছিল, নান্টু বলল–তুই থাক, আমিই যাচ্ছি। বলে টর্চটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
পিছন থেকে রুমা বলল–আজ যেন রাত করিস না।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল নান্টু।–কেন?
এমনি বললাম। কাল ধকল গেছে। আজ ভালো করে খাসনি—
ঠিক আছে। বলে নান্টু বেরিয়ে গেল।
কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে এল। অবাক রুমা জিজ্ঞেস করল–এরই মধ্যে বেড়ানো হয়ে গেল?
নান্টু উত্তর দিল না। শুধু বলল–সদর দরজাটা বন্ধ করে দে। আর দ্যাখ তো কেউ ওখানে ঘুরছে কিনা।
কোথায় ঘুরছে?
দেখলাম কেউ যেন বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে আমার পিছু পিছু এসে পুজো-বাড়িটার দিকে চলে গেল।
সে আবার কী! আচ্ছা, দেখছি। বলে রুমা টর্চ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পিন্টু বলল– দাঁড়া রুমাদি। আমিও তোর সঙ্গে যাব।
পনেরো মিনিট পরে দুজনেই ফিরে এল। রুমা বলল–দূর! কেউ কোত্থাও নেই।
নান্টু গম্ভীর মুখে বলল–সে কি আর তোদের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবে? সে আমাকেই চায়।
রাত্রে শোবার সময়ে মাকে বলল–মা, আজ রাত্রে তোমাদের ঘরেই শোব। মামীমা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন–বেশ তো শুবি। ওরে রুমা, তোর নান্টুদার বিছানাটা আমাদের ঘরে করে দে।
রুমা বিছানাটা করতে যাচ্ছিল, নান্টুর বুঝি লজ্জা হলো। বলল–থাক। আমার ঘরেই শুই। কি আর হবে!
মামী বললেন–হ্যাঁ হ্যাঁ, কিসের কি হবে? তা ছাড়া পিন্টুটা একা শোবে?
ও ঘর থেকে পিন্টু বলে উঠল–একলা শোব তোকি হবে? ভূতে ধরবে?
পিন্টুর এই সামান্য কথায় নান্টু যেন চমকে উঠল। কিন্তু কিছু বলল না। শুতে চলে গেল।
ঘণ্টাখানেক পর। রাত প্রায় এগারোটা। রুমা ডাকল-মামীমা!
হুঁ।
আমার মনে হচ্ছে যে কোনো কারণেই হোক নান্টুদা খুব ভয় পাচ্ছে। নইলে ওর মতো সাহসী ছেলে–ও এ ঘরে শুলেই পারত।
