ড্রাইভার আবার গাড়ি চালাতে লাগল। হর্ন বাজিয়েই চলেছে। কিন্তু লোকটা পথ থেকে সরছে না। গাড়ি যতই এগোচ্ছে লোকটা ততই জোরে হাঁটছে।
আশ্চর্য!
এতক্ষণে নান্টু দেখল লোকটা বেজায় লম্বা। প্রথম যখন গাড়ির একেবারে সামনে দেখেছিল তখন এত লম্বা মনে হয়নি। কিন্তু এখন
ড্রাইভার হর্ন বাজিয়েই চলেছে। তারপর হঠাৎই ড্রাইভার স্পিড তুলে দিল। নান্টু চেঁচিয়ে উঠল–করছ কী! চাপা পড়বে, গাড়ি থামাও। কিন্তু ড্রাইভার শুনল না। যতটা সম্ভব স্পিড তুলে গাড়িটাকে মাঝ পথ দিয়েই উড়িয়ে নিয়ে গেল।
না, লোকটা আর নেই। চাপাও পড়েনি। পাশে সরেও যায়নি। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
নান্টুর কপালে মিনমিন করে ঘাম ফুটে উঠল। ড্রাইভারকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল আর তখনই মনে হলো গিরির জ্ঞান ফিরে এসেছে। তার মুখের দিকে তাকাতেই দেখল গিরি গোল গোল চোখ মেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু তাকিয়ে থাকা নয়, যেন দুচোখ বিস্ফারিত করে তাকে চেনবার চেষ্টা করছে। যে মুহূর্তে চিনতে পারল তখনই তার চোখের ভাষা বদলে গেল। চোখের মণি দুটো আগুনের আঁটার মতো ঘুরতে লাগল। উঃ! কী ভয়ংকর সে চাউনি! নান্টু তাড়াতাড়ি অন্যদিকে মুখ ফেরাল। বুঝতে পারল গিরি তার চিরশত্রুকে যেন এত দিন পর হাতের মুঠোয় পেয়েছে।
কষ্ট হচ্ছে? সাহস করে নান্টু কথা বলতে চাইল। গিরি উত্তর দিল না। গোঙানিটা থেমে গেল। কিন্তু তার হিংস্র দৃষ্টি নান্টুর মুখ থেকে সরল না।
ভয় নেই। তোমায় কাটোয়া হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি বেঁচে যাবে।
গিরি তবু নিরুত্তর। একবার উঃ করে উঠল।
লাগছে? বলে নান্টু তাড়াতাড়ি তার পোড়া পিঠের নিচ থেকে হাতটা সরিয়ে নিল।
গিরি এবার চোখ বুজল।
নান্টু ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল কাটোয়া আর কতদূর ভাই?
অগ্রদ্বীপ পেরোয়নি এখনও।
ও বাবা! এখনও মাঝে দাঁইহাট আছে।
এদিকে সে আর পা ঠিক রাখতে পারছে না। গিরির দেহটা ক্রমেই তার পা থেকে সীটের নিচে নেমে যাচ্ছে। নান্টু ঘাড় নিচু করে গিরির দেহটা তুলতে যেতেই হঠাৎ গিরি দুহাত দিয়ে নান্টুর গলাটা আঁকড়ে ধরল।
নান্টু ভাবল বুঝি পড়ে যাবার ভয়ে গিরি ওর গলাটা ধরেছে। কিন্তু–একী! গিরির দুটো হাত যে ক্রমেই তার কণ্ঠনালীর দিকে এগিয়ে আসছে। নান্টু এক ঝটকা মেরে ঘাড়টা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করল। পারল না। কী শক্ত গিরির হাত দুটো। সেই শক্ত হাত দুটো হঠাৎ টিপে ধরল নান্টুর গলা টিপে ধরেই গিরি তার শেষ শক্তি দিয়ে উঠে বসবার চেষ্টা করল যাতে ওর মরণ টিপুনির থেকে নান্টু গলা বাঁচাতে না পারে।
নান্টু আর দয়া-মায়া না করে বাঁচবার জন্যে তার হাত দুটো জোর করে ঠেলে দিল। দুহাতে গলিত কুষ্ঠের মতো চটচটে রস লেগে গেল। একটা আর্তনাদ করে গিরি কোলের ওপর এলিয়ে পড়ে ক্রমাগত গোঙাতে লাগল।
শয়তান কোথাকার! মরতে বসেও শয়তানি যায় না। বজ্জাত গয়লানী, তুই ভালো হয়ে ফিরে আয়। এবার তোকে জেলে পুরব। নইলে আমার নাম নান্টু নয়।
.
ভোরবেলায় চিপ কাটোয়া হাসপাতালে ঢুকল। গিরিকে ভর্তি করিয়ে নাম-ঠিকানা লিখে ডাক্তারদের বলে এল–এ গরিব মানুষ বলে অবহেলা করবেন না। এর নিজের কেউ নেই। কিন্তু জানবেন আমি আছি। বলে দৃপ্ত পায়ে গটগট করে জিপে এসে বসল।
জিপে বসতেই তার শরীরটা কিরকম করে উঠল। গা গুলোতে লাগল। শরীরে কেমন কাঁপুনি।
ড্রাইভার ভাই, একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে দাও। শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে।
.
০৪.
বেলা প্রায় নটার সময়ে নান্টু বাড়ি ঢুকল। সবাই বসে আছে তার পথ চেয়ে। এমনকি বিয়েবাড়ি থেকেও দু-একটা ছেলে ছুটে এসেছে খবর নিতে। নান্টুকে ফিরতে দেখে সবাই নিশ্চিন্ত।
রুমা ছুটে গিয়ে বলল–তোর আক্কেল কিরে নান্টুদা?
নান্টু উত্তর দিল না। সোজা নিজের ঘরের দিকে চলল। নান্টুর আদরের বেড়ালটা ল্যাজ তুলে নান্টুর পায়ের কাছে ঘুরছিল। নান্টু এক লাথি মেরে সরিয়ে দিল। এমন নিষ্ঠুর আচরণ সে কখনো করেনি।
এতক্ষণে বাড়ির সকলের লক্ষ্য পড়ল নান্টুর দিকে।
ইস! এ কী অবস্থা! চুল উস্কখুস্ক, চোখ নেশাখোরের মতো লাল, উদভ্রান্ত দৃষ্টি। জামায় এখানে-ওখানে বিশ্রী ছোপ।
সারা রাত কোথায় ছিলি? কি হয়েছে?
পরে বলব। আগে একটু শোব।
কোনোরকমে জামাটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্যান্ট পরেই সে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। প্যান্টটা ছাড়ারও দরকার ছিল। কিন্তু পারেনি।
আধঘণ্টা পর সে উঠে বসল। তখন সবাই তার পাশে বসে। বার বার জিজ্ঞেস করায় সে শুধু সংক্ষেপে গিরি গয়লানীকে কাটোয়া হাসপাতালে ভর্তি করে দেবার কথা বলল। আর কিছু বলল না।
মামীমা বললেন–কিছু খাবি? সারারাত তো কিছু খাসনি।
নান্টু মাথা নাড়ল।
খাবিনে কেন?
খেতে ইচ্ছে করছে না।
তবে একটু চা করে দিই খা।
রুমা তখনই চা করে এনে দিল। চায়ের সঙ্গে চিড়ে ভাজা।
চিড়ে ভাজা ছুঁলো না। চা-টা মুখে দিতে গিয়ে নামিয়ে রাখল।
কি হলো? চা খাবি না?
না। পোড়া গন্ধ।
পোড়া গন্ধ! সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
তোমরা এখন বিরক্ত কোরো না। বলে গুম হয়ে বসে রইল।
হঠাৎ নান্টুর কি যে হলো কেউ বুঝতে পারল না।
যা চান করে নে গে।
নান্টু তেল মেখে বাঁশবাগানের ধারের পুকুরে ডুব দিতে গেল। কিন্তু ডুব দিল না। ফিরে এল।
চান করলি না?
বাড়িতে করব।
