রাত যখন এগারোটা তখন পিন্টু বাড়ি ফিরল একা।
সবাই অবাক।–দাদা কোথায়?
পিন্টু বলল–জানি না। সন্ধ্যেবেলা দাদাকে একবার ওখানে দেখেছিলাম। তারপর আর দেখিনি! বোধহয় খায়ওনি। সবাই খোঁজাখুঁজি করছিল। শেষে সবাই ভাবল বোধহয় বাড়ি চলে এসেছে। সারা দিন খুব খাটুনি গেছে তো।
সে আবার কী! জলজ্যান্ত ছেলেটা গেল কোথায়? যদি অন্য কোথাও যায়ই, বিয়েবাড়িতে তো বলে যাবে।
সে রাত্রে বাড়িতে কারো গলা দিয়ে ভাত গলল না। বিছানায় শুয়ে যে যার মতো চিন্তা করতে লাগল। আর কান পেতে রইল দরজায় কখন কড়া নাড়ার শব্দ শোনা যাবে।
রুমারও ঘুম আসছিল না। দেখল পিন্টুও ঘুমোয়নি। এপাশ-ওপাশ করছে। ও পিন্টুর কাছে গিয়ে বসল। রাত তখন দেড়টা। ঘরের এক কোণে ওদের পোষা বেড়ালটা চোখ বুজিয়ে ঝিমুচ্ছে। অনেক দিনের বেড়াল। খুব ভীতু। হুলো দেখলেই পালায়। কিন্তু চেনা মানুষের কাছে খুব সহজ।
রুমা জিজ্ঞেস করল–বিয়েবাড়িতে নান্টুদাকে কখন দেখিছিলি?
তখন ফার্স্ট ব্যাচ বসেছে। এই ধর রাত আটটা।
ও কি করছিল?
পরিবেশন করছিল।
তারপর?
তারপর মনে হলো বাইরে থেকে দুজন লোক এসে ওকে ডাকল।
দুজন লোক ডাকল?
হ্যাঁ।
চেনা লোক?
আমি চিনি না।
তারপর?
তারপর পরিবেশন করা রেখে তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেল। আর দেখিনি।
বেড়ালটা আস্তে আস্তে রুমার কোলে এসে বসল।
রুমা অনেকক্ষণ কথা বলতে পারল না। শেষে বলল–এ কথাটা তো এতক্ষণ বলিসনি?
বলে কি হবে? সবার দুর্ভাবনা আরো বাড়বে। শেষে আমাকেই এত রাতে খুঁজতে বেরোতে হবে। একটু থেমে বলল–বেরোতে আমি এখনি পারি। কিন্তু কোথায় খুঁজব? পিন্টু আবার একটা থামল। তারপর রুমার হাত দুটো চেপে ধরে বলল–কী যে ভয় করছে রুমাদি!
ভয় কিসের? এখানে তো ওর কোনো শত্রু নেই।
তা হয়তো নেই। তবে ওকে যে সবাই ভালোবাসে, সবার উপকার করার জন্যে ছুটে যায়–এটা হয়তো কারও কারও ভালো লাগে না। হিংসে করে। তাছাড়া গোপন রাগও থাকতে পারে।
.
০৩.
বিয়েবাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াতেই লোক দুটো বলল–নান্টু, একজন স্টোভ বাস্ট করে পুড়েছে। এখানে কিছু করা যাবে না। বিচ্ছিরিভাবে পুড়েছে–কেউ এগোচ্ছে না। ওকে কাটোয়ার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তুমি না নিয়ে গেলে ও আর বাঁচবে না।
নান্টু তখনই ওদের সঙ্গে চলে গেল। প্রায় একরকম দৌড়তে দৌড়তেই গেল। তাতেও প্রায় মিনিট পনেরো লাগল। গিয়ে দেখল এক জায়গায় বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে। জায়গাটা দেখেই নান্টু হকচকিয়ে গেল। ভাবতেও পারেনি এই গিরি গয়লানীর বাড়ি। লোকগুলো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে শুধু গোঙানি।
কে পুড়েছে?
ওর সঙ্গের একজন এতক্ষণে বলল-গিরি।
আমায় আগে তো বলনি?
লোকটা কঁচুমাচু হয়ে বলল–বলিনি ইচ্ছে করেই। যদি তুমি না আস। গিরি যে তোমায় কী চক্ষে দেখে তা তো আমরা জানি।
ভিড় ঠেলে নান্টু ঘরের মধ্যে ঢুকল। ঢুকতেই কেরোসিন তেল আর পোড়া চামড়ার উৎকট গন্ধ। দেখল ঘরের এক জায়গা কেরোসিন তেলে ভিজে গেছে। ভাঙা স্টোভের টুকরোগুলো ছড়িয়ে। মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে গিরি। তার চুলগুলো পুড়ে গেছে, মুখের চামড়া পুড়ে কালো হয়ে গেছে। গলার কাছে দগদগ করছে যেন পুরনো ঘা। সে বীভৎস দৃশ্য দেখা যায় না।
নান্টু তখনই একজনকে জিপ আনতে পাঠাল।–আমার নাম করে বলবি। এখুনি দরকার।
জিপ এল প্রায় এক ঘণ্টা পরে। গিরির সেই বিরাট বপুর অনেক জায়গাতেই পুড়ে গিয়েছিল। তাই কলাপাতায় জড়িয়ে ধরাধরি করে জিপে তোলা হলো।
তোমরা কে কে যাবে?
এত রাত্রে এরকম একজন রুগীকে নিয়ে কাটোয়া পর্যন্ত যেতে কেউ রাজী হলো না। ছলছুতো করে সরে পড়ল। নান্টু একবার ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাল। তারপর একাই অত ভারী দেহটা নিজের কোলের ওপর শুইয়ে নিয়ে চলল।
রাত একটা বেজে গেছে। বিশ্রী রাস্তা। জিপটা ঝকানি খেতে খেতে চলেছে। গিরি অসহ্য যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে তো গোঙাচ্ছেই।
জনপ্রাণীশূন্য রাস্তা। দুপাশে রেনট্রিগুলো অন্ধকারকে আরও যেন ভয়াবহ করে তুলেছে। মাঝে মাঝে দুপাশে ধানক্ষেত। বাবলা গাছের লাইন চলেছে তো চলেছেই। গাড়ির হেডলাইট অন্ধকারের বুক চিরে খানিকটা পথ করে নিচ্ছে। তার পিছনেই আবার জমাট অন্ধকার।
গিরি গয়লানীর বয়েস পাঁচের কোঠায়। শরীর বেশ ভারী। প্রায়ই নান্টুর কোল থেকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। তখনই আর্তনাদ করে উঠছে। নান্টু প্রাণপণ শক্তিতে গিরির পা দুটো সীটের ওপর তোলবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পা দুটো যেন শক্ত আর বেঁকে গেছে। নান্টু ভাবল–মহা মুশকিল, এখনও অর্ধেক পথ আসেনি। এইভাবে কতক্ষণ নিয়ে যাওয়া যায়? তারপর পোড়া দেহ থেকে রস গড়িয়ে তার জামা-প্যান্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে। দুহাতে বুঝি রসই লেগেছে। তাই চটচট করছে। শুধু তাই নয়। গিরির সারা গা থেকে বিশ্রী পোড়া গন্ধ ছাড়ছে। বমি আসছে।
এদিকে ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে তো চালাচ্ছেই। সেও যদি দুটো কথা বলে তা হলেও একটু অন্যমনস্ক হওয়া যায়। কিন্তু এমনই কর্তব্যপরায়ণ ড্রাইভার যে একবারও পিছু ফিরে তাকাচ্ছে না।
হঠাৎ গাড়িটা ঝকানি দিয়ে থেমে গেল। ড্রাইভার ব্রেক কষেছে।
নান্টু ঝুঁকে পড়ে দেখল একটা লোক একেবারে সামনে পড়ে গেছে। অল্পের জন্যে বেঁচে গেছে।
কিন্তু লোকটার ভ্রূক্ষেপ নেই। একবারও পিছন ফিরে তাকাল না। হন হন করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলল।
