গিরি গয়লানীর কথা রুমা অনেক বার শুনেছে। একবার দেখেও ছিল। কালো মোটা। চোখগুলো গোল গোল। ঠোঁটটা পুরু। ঝুলে পড়েছে। মাথার চুলে জট। ভয়ানক বদমেজাজী। এমনিতে ওর হাতটান আছে। কারো বাড়িতে ঢুকলে ঘটিটা-বাটিটা হাতিয়ে নেয়। সেইজন্যে কেউ ওকে বাড়ি ঢুকতে দেয় না। একবার পাড়ার একটা বাচ্চা ছেলেকে চুরি করে বাইরে পাচার করার চেষ্টা করেছিল। নান্টু তার দলবল নিয়ে ছেলেটাকে উদ্ধার করে। সেই থেকে নান্টুর ওপর তার বেজায় রাগ। একবার তো ওকে কাটারি ছুঁড়ে মেরেছিল। একটুর জন্য নান্টু বেঁচে গিয়েছিল। আবার এই নান্টুই তাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। সাবধান করে দিয়ে বলেছিল–ফের যদি চুরি-চামারি কর তাহলে গাঁ থেকে তোমায় তাড়াব। কেউ ঠেকাতে পারবে না।
গিরি গয়লানী সেদিন নান্টুর মৃত্যু কামনা করে শাপশাপান্ত দিয়েছিল। তাই শুনে নান্টুর মা কেঁদেকেটে বলেছিল–কেন তুই ডাইনিটাকে ঘাঁটাতে যাস? তোকে গাল-মন্দ করে। আর আমার বুক কাঁপে।
নান্টু মায়ের কথায় কান দেয় না। শুধু হাসে।
সেই গিরি আজ একটা ছেলের মাথা ফাটিয়েছে। নান্টু তো ছুটল। আবার কি অনর্থ। বাধায় কে জানে!
রুমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
.
০২.
রুমা আমায় তার এবারের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল।জেঠু, সব ঘটনাটা শোনার আগে আমার মামার বাড়িটা কিরকম জানতে হবে।
বলে একটা কাগজ টেনে নিয়ে একটা ঘর আঁকল। ঘরটা বেশ বড়ো। পাশেই একটা ছোটো ঘর। বড়ো ঘরের পেছনে লাগোয়া রান্নাঘর। উল্টোদিকে বাথরুম।
দুটো ঘরের সামনে অনেকখানি উঠোন। উঠোনের মাঝখানে ধানের মড়াই। ডানদিকে গোয়াল। তার পাশেই ধান কোটার চেঁকি। উঠোনের পাশ দিয়ে বাইরে যাবার দরজা। দরজাটা বেশ মজবুত। সমস্ত উঠোন ঘিরে উঁচু পাঁচিল। যাতে চোর পাঁচিলে উঠতে না পারে।
আর এই দরজা দিয়ে বেরিয়েই বাঁ দিকে বাঁশঝাড়। ওপাশে পুকুর। এবার বাড়ির পেছন দিকটা দেখুন।
বলে একটা দোতলা বাড়ি আঁকল। তারপর বলতে শুরু করল–এটা বহুদিনের পুরনো বাড়ি। কিন্তু মাঝে মাঝে মেরামত হয় বলে এখনও টিকে আছে। দোতলার ঘরের জানলাগুলো সব বন্ধ। দোতলার ঐ দিকের বারান্দাটা দেখুন ভেঙে পড়েছে। তাই বারান্দার দিকের দরজাটা পেরেক দিয়ে আঁটা। অন্যমনস্ক হয় কেউ খুলতে পারবে না। এত বড়ো বাড়ি কিন্তু লোকজন নেই। দরজায় দরজায় তালা। এটা দত্তবাবুদের বাড়ি। তারা কলকাতায় থাকেন। শুধু পুজোর সময়ে মাসখানেকের জন্যে আসেন। নিচে বিরাট পুজো-দালান। এখনো সে আমলের ঝাড় লণ্ঠন ঝোলে। এ বাড়িতে দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো ছাড়া দীপান্বিতার রাতে হয় ছিন্নমস্তার পুজো। সে বড়ো সাংঘাতিক পুজো। গাঁয়ের লোকে বলে ঐ পুজোয় একটু খুঁত হলে নাকি রক্ষে নেই। দুবার বলি বেধে গিয়েছিল। সেই দুবারই এবাড়ির দু-দুটো জোয়ান ছেলে মরেছিল। একজন জলে ডুবে আর একজন সাপের কামড়ে। শুনেছি সেবারও সেই ডাক নাকি শোনা গিয়েছিল। এই পুজো যে কত কালের তা কেউ বলতে পারে না। পুজো-দালানের এক কোণে যে বিরাট হাঁড়িকাঠটা রয়েছে সেটা দেখলেই বোঝা যায় এক সময়ে এখানে মোষ বলি হতো।
আমি অবাক হয়ে রুমার কথা শুনছিলাম। ও বলতে লাগল–মামার বাড়ির বড়ো ঘরের এই জানলাটা দিয়ে দত্তবাবুদের পুজো-দালানটা স্পষ্ট দেখা যায়। মামীমা বলেন কত রাত্রে ঐ নির্জন দালানে ঘণ্টা বাজতে শোনা গেছে। কখনও বলিদানের বাজনা বেজে ওঠে।
এসব আমি অবশ্য বিশ্বাস করি না। আসলে বহুদিন ধরে একই জায়গায় থাকতে থাকতে, নানা কাহিনী শুনতে শুনতে মানুষের ইন্দ্রিয়গুলো সেইসব ব্যাপারে সহজেই বিশ্বাসে সজাগ হয়ে থাকে। মামীমাদেরও তাই হয়েছে আর কি।
একটু থেমে বলল–যাক ও কথা। এই বড়ো ঘরে মামা-মামী শোন। অন্য দিকটায় একটা চৌকি পাতা আছে। কেউ এলে ঐ চৌকিতে শোয়। যেমন আমি শুই। চৌকির ধারেই জানলা। যে জানলা দিয়ে রাস্তার ধারের বাঁশঝাড়টা দেখা যায়।
পাশের ছোটো ঘরটায় ওরা দুভাই শোয়। সেখানেও জানলা দিয়ে যেমন বাঁশঝাড় দেখা যায় তেমনি অন্য জানলা দিয়ে ঐ পুজো-দালানটাও দেখা যায়। এছাড়া ঐ পাশে একটা ছোট্ট ঘর আছে। সেখানে পুরনো জিনিসপত্তর থাকে। এই ঘরেরই দেওয়ালে টাঙানো আছে কাপড় জড়ানো একটা তরোয়াল। তরোয়ালটা কার ছিল, কবে থেকে আছে তা কেউ জানে না। তবে বাড়ির সবার কাছে তরোয়ালটা খুব পবিত্র।
জেঠু, বাড়ির পজিশানটা আপনার কাছে ক্লিয়ার হলো তো?
যদিও খুব পরিষ্কার হয়নি তবু বললাম হ্যাঁ, হয়েছে। এবার ঘটনাটা বলো।
রুমা এবার যা বলে গেল তা এইরকম–
পাড়ায় নান্টুর এক বন্ধুর বোনের বিয়ে। দরকারি কিছু জিনিস কেনাকাটার দায়িত্ব পড়েছিল নান্টুর ওপর। নবদ্বীপ থেকে বেলাবেলি কিনে আনতে হবে। সকালবেলায় বেরিয়ে গেল ও। বলে গেল বেলা একটার মধ্যে ফিরবেই।
জিনিসপত্তর কিনে বিয়েবাড়িতে রেখে একটার মধ্যে ফিরতেই হবে। কেন না বাড়ি ফিরে স্নান করে প্রস্তুত হয়ে আবার বিয়েবাড়ি যেতে হবে। ওখানেই দুপুরের খাওয়া। তারপর বিয়েবাড়ির তদারকি, বরযাত্রী আসবে, তাদের আপ্যায়ন করা। নষ্ট করার মতো সময় নেই।
কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল নান্টু ফিরল না। বাড়ির সবাই ভাবল নিশ্চয় নবদ্বীপ থেকে ফিরতে দেরি হয়েছে, তাই বিয়েবাড়িতেই স্নানটান সেরে নিয়েছে। একেবারে সব কাজকর্ম মিটিয়ে সেই রাতের বেলা ফিরবে।
