তবু ওরই মধ্যে রুমা নান্টুকে আটকে দেয়। বলে–কত দিন পর এলাম। সামনের সপ্তাহে চলে যাব। তুই কি আমার সঙ্গে গল্পও করবি না?
তখন হয়তো নান্টু একজন রোগীকে ভালোভাবে দেখবার জন্যে হেলথ-সেন্টারের ডাক্তারকে চিঠি লিখছে। হেসে বলে–আমার কোনো গল্প নেই।
রুমা ঐ ডাকের কথাটা জিজ্ঞেস করে। নান্টু বলে–ও নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। বলেই আবৃত্তি করে–জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথা কবে। পড়েছিস তো?
তা পড়েছি। তার সঙ্গে ঐ ডাকের সম্পর্ক কি?
যে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে মৃত্যু আছে তা সে স্বাভাবিক হোক আর অপঘাতই হোক সে কোনো কিছুতেই ভয় পায় না।
কিন্তু ঐ যে ডাকের কথা সবাই বলে? রুমা তার পয়েন্ট থেকে সরে আসতে চায় না।
নান্টু বলে–বললাম তো ডাক নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।
আবার তুই এড়িয়ে যাচ্ছিস। তুই মাথা ঘামাতে না পারিস, ডাকটা তো শোনা যায়?
তা যায়!
রুমা যেন একটু শিউরে উঠল। তার এই দুর্দান্ত দুঃসাহসী দাদাটিও তাহলে স্বীকার করে ডাক শোনা যায়।
তুই শুনেছিস?
তা একবার-দুবার শুনেছি।
কোথায়?
এখানে-ওখানে। রাত্তিরবেলায় ডাকে। কে আর তার খোঁজ করতে যায়?
কিসের ডাক বলে তোর মনে হয়?
কোনো পশু-পক্ষী হবে। কত বন-জঙ্গল তো কাটা হচ্ছে। কিছু দুর্লভ পশু-পাখি হয়তো কোথাও ছিল। এখন প্রাণ বাঁচাতে এখানে-এখানে ছটকে পড়েছে।
রুমা যেন এই যুক্তিতে খুশি হলো না। বলল–তাহলে কেবল বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেই তোর ভাষায় পশু-পক্ষীটি ডাকবে?
নান্টু বিরক্ত হয়ে বলল–অতশত আমি জানি না। জানতে চাইও না। একটু চা কর দিকি।
তা করছি। কিন্তু তুই একটা সত্যি কথা বল, এই যে এত রাত্তিরে একা একা বাড়ি ফিরিস, ভয় করে না?
নান্টু এদিক থেকে ওদিক মাথা নাড়ল। বলল–নাঃ।
কখনো ভয় পেয়েছিস?
নান্টু একটু হাসল। তারপর যেন অনেক দিন আগের কোনো স্মৃতি হাতড়ে নিয়ে। বলল–তা একবার পেয়েছিলাম।
বল বল।
আগে চা নিয়ে আয়।
.
চা খেতে খেতে নান্টু যে ঘটনাটা শোনাল তা এইরকম–
একবার ও পাশের গ্রামে গিয়েছিল এক বিয়ে উপলক্ষে। তবে নেমন্তন্ন খেতে নয়, বরপক্ষ যাতে দরিদ্র কন্যাদায়গ্রস্ত বাপের ওপর জুলুম না করে তার ব্যবস্থা করতে। ওর দলবল আছে, দুষ্টু লোকে তাই খুব ভয় পায় ওকে।
বিয়েবাড়ি থেকে ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল। একটা সাইকেল করে আসছিল। পল্লীগ্রামের নির্জন পথ। দুপাশে ঝোপ-ঝাড়। নিস্তব্ধ পরিবেশ। হঠাৎ সাইকেলের চেনটা গেল খুলে।
সাইকেল থেকে নেমে ও অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে চেনটা লাগাল। তারপর সাইকেলে উঠতে যাবে হঠাৎ সামনের দিকে তাকাতেই চমকে গেল। কি ওটা?
দেখল বাঁ দিকের বটগাছের ডাল থেকে সাদা কাপড় জড়ানো কি যেন ঝুলছে। বেশ লম্বা। দুটো পা-ও যেন দেখতে পেল। ওর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কাঁধের ঝুলি থেকে টর্চটা বের করে জ্বালল। দেখল সাদা কাপড় জড়ানো একটা দেহ। বাতাস নেই। তবু দুলছে। যেন বলছে–এই যে আমি।
ও বুঝল কেউ গলায় দড়ি দিয়েছে। কিন্তু লোকটা কি গলায় দড়ি দেবার জন্যে গ্রাম ছেড়ে এত দূরে এসেছিল? আর মুখটাই বা কাপড় জড়ানো কেন?
ওর বদ্ধমূল ধারণা হলো, লোকটাকে খুন করে কয়েকজনে মিলে এখানে ঝুলিয়ে রেখে গিয়েছে।
ও মশাই! দাঁড়ালেন কেন? বেশ তো যাচ্ছিলেন, যান না।
চমকে উঠেছিল ও। গলার স্বরটা যেন কেমন জড়ানো।
তখনই টর্চের আলো ফেলল শব্দ লক্ষ্য করে। দেখল রাস্তার উল্টোদিকে একটা তেঁতুল গাছের তলায় জনা পাঁচেক লোক শুয়ে রয়েছে।
এই পর্যন্ত বলে নান্টু থামল। বলল–ঐ একবারই গায়ে কাঁটা দিয়েছিল। হ্যাঁ, কেমন যেন ভয় পেয়েছিলাম।
রুমা বললে, তারপর কি হলো?
কি আর হবে? সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। রাত তখন দুটো।
কিন্তু লোকগুলো?
নান্টু হেসে বললে–ওরা দূর গ্রাম থেকে মড়া নিয়ে আসছিল। ক্লান্ত হয়ে পড়ায় মড়াটা রেখে গাছতলায় একটু শুয়ে ছিল। শেয়াল-কুকুরে খাবে তাই মড়াটা গাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল।
ওঃ এই! রুমা যেন হতাশ হলো। কিন্তু নান্টু কেমন একরকম গলার স্বর করে বলল তবে একটা জিনিস, কিছুতেই বুঝতে পারলাম না একটা মড়া কি ভাবে অত উঁচু ডালে ঝোলানো সম্ভব হলো? কথাটা মনে হলো আরো খানিকটা এগিয়ে এসে। আর, তখনই যেন স্পষ্ট শুনতে পেলাম–বলো হরি হরি বোল। সেই সঙ্গে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। আর আশ্চর্য ঠিক আমার সাইকেলের পেছনে।
এত তাড়াতাড়ি মড়া নামিয়ে কি করে আমার ছুটন্ত সাইকেলের পিছনে এসে পড়তে পারে ভেবে পেলাম না।
রুমা কি বলতে যাচ্ছিল এই সময়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল তিনটে ছেলে।
নান্টুদা, গিরি গয়লানী হরিপদর ছেলেটার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। শীগগির এসো।
নান্টু লাফিয়ে উঠে বললে–মাথা ফাটিয়েছে কেন?
গিরির গাছের দুটো আম পেড়েছিল। তাই
দুটো আম পেড়েছিল বলে ও মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে! ওর তো বড় বাড় বেড়েছে।
ও একমাত্র তোমাকেই ভয় করে। তুমিই ওকে শায়েস্তা করতে পার।
তার আগে ছেলেটার ব্যবস্থা করি। হ্যাঁ রে, খুব রক্ত বেরোচ্ছে?
হ্যাঁ। অনেকটা কেটে গেছে।
তাহলে তো এখুনি কাটোয়া হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। মা, আমি বেরোচ্ছি। কখন ফিরব ঠিক নেই। বলেই নান্টু ওদের সঙ্গে বেরিয়ে গেল।
রুমা নিজের মনেই বলে উঠল–ব্যস! নান্টুদার খাওয়া-দাওয়া এ বেলার মতো হয়ে গেল।
