নদীয়া জেলার এমনি একটি গ্রাম মুকশিম পাড়া। ঝোপ-জঙ্গল, বাঁশঝাড়, ভাঙাচোরা বাড়ি, পুরনো মসজিদ, জীর্ণ কবরখানা আর গোটা দশেক পুকুর ছাড়া আর কিছু নেই। তবু এখানেই বংশানুক্রমে বাস করে চাষাভুষো, মিস্ত্রি-মজুর আর মধ্যবিত্ত মানুষ।
গ্রামে একটা মারাত্মক প্রবাদ–না শুধু প্রবাদ নয়, বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে গ্রামে কোনো অপঘাত মৃত্যু হলে গভীর রাতে একটা অদ্ভুত হাড়-কাঁপানো ডাক শোনা যায়। সে ডাক যে কিসের আজ পর্যন্ত কেউ তা বলতে পারেনি। কেউ বলে কোনো পাখির ডাক, কেউ বলে অন্য কিছুর। পাখির ডাক যদি হবে তাহলে কেবল ঐ অঘটন ঘটার দিনেই? পাখির এমন অলৌকিক ক্ষমতা?
যাই হোক এ ডাকের রহস্য ভেদ করার সাহস আজ পর্যন্ত কারো হয়নি। সবাই ভাবে একটা কথাই-কী দরকার?
শুধু এইটুকুই নয়–ঐ ডাক শোনা গেলে সে বছর গ্রামে তিনটে অপঘাতে মৃত্যু হবেই। তার মধ্যে দুজন মানুষ, একটা প্রাণী।
যেবার হরেকেষ্ট কামারের বৌটা শাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া করে, এক ক্রোশ পথ হেঁটে গিয়ে লাইনে মাথা দিল, সেবারও রাতের অন্ধকারে বন-বাদাড় কাঁপয়ে ঐ ডাক শোনা গিয়েছিল। আর তার তিন মাস পর জনার্দন চক্রবর্তীর ছোটো ছেলে সন্ধ্যেবেলায় কাটোয়া থেকে তার ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে আসতে পোলের ওপর উঠেই মুখ থুবড়ে পড়ল। আর উঠল না। ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ার দুজনেই শেষ। অথচ ঘোড়াটা ছিল যেমন তেজি, ছেলেটাও ছিল তেমনি জোয়ান। সে রাত্রেও নাকি ঐ ডাক শোনা গিয়েছিল। চমকে উঠেছিল গ্রামের লোক– আবার কে গেল? চমকাননি শুধু জনার্দন চক্রবর্তী। বাড়িতে বসে হঠাৎ অসম্ভব কিছু একটা দেখেছিলেন। না, চোখের ভ্রম নয়। তখন ঠিক সন্ধ্যে। ইজিচেয়ারে শুয়ে তিনি তামাক খাচ্ছিলেন। হঠাৎ বাইরে শুনলেন ঘোড়ার খুরের শব্দ। সে শব্দ তার চেনা। বুঝলেন কাটোয়া থেকে ছেলে দেখা করতে আসছে। আনন্দে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। শব্দটা এগিয়ে আসছে বাইরে থেকে দেউড়ির ভেতর। কিন্তু কী আশ্চর্য ঘোড়াটা দেখা যাচ্ছে না। শব্দটা আরও এগিয়ে এল–আরও। থামল দরজাটার সামনে।
তারপর যেন দেখলেন একটা কালো ঘোড়া দাঁড়িয়ে। তার চোখ দিয়ে জল অর মুখ দিয়ে ফেনা গড়িয়ে পড়ছে।
তিনি হাঁকলেন–ভৈরব! সোমশঙ্কর কোথায়? তুমি একা কেন?
উত্তরে কাঁপতে কাঁপতে ভৈরব মাটিতে পড়ে গেল।
চিৎকার করে উঠেছিলেন জনার্দন চক্রবর্তী। আলো নিয়ে ছুটে এসেছিল বাড়ির লোকজন। কিন্তু কাছেপিঠে ঘোড়ার চিহ্নমাত্র নেই।
এই গ্রামেরই একটা ঘটনা শুনেছিলাম আমার প্রতিবেশীকন্যা রুমার মুখে। আমার বাড়ি বর্ধমান জেলার একটা মহকুমা শহরে। রুমা সেবার পার্ট টু পরীক্ষা দিয়ে তার মামার বাড়ি ঐ মুকশিম পাড়ায় গিয়েছিল দিন পনেরোর জন্যে। গ্রামের ওসব কাহিনী তার জানা। মাথা ঘামায় না বিশেষ। মামীমাকে বলে–এত বার আসি, একবারও ঐ ডাক শোনার সৌভাগ্য হলো না।
মামীমা বলে ওঠেন–সে ডাক শুনে কাজ নেই মা। থাকো শহরে, লেখাপড়া, গানবাজনা নিয়ে। তুমি কি করে বুঝবে কী ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে হয় আমাদের! একটা অপঘাত মৃত্যু আর তারপরেই ঐ মরণডাক! তারপরেই আবার একটা, হয় মানুষের নইলে কোনো পোষা জন্তুর মৃত্যু।
এ বাড়িতে রুমার মামা-মামী ছাড়া আছে দুই মামাতো ভাই–নান্টু আর পিন্টু। নান্টু রুমার চেয়ে বছর দুএকের বড়ো। বয়েস বছর বাইশ। পিন্টু তিন বছরের ছোটো। মাধ্যমিক পড়ে।
নান্টু কাটোয়া কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করে গ্রামেই থাকে। চাকরি-বাকরির আশা নেই। বেকার জীবন। তাই পরোপকার করে বেড়ায়।
মামার আছে প্রচুর ধানজমি, বাঁশবাগান, পুকুর। এর আয়েতেই সংসার চলে। কয়েকমাস হলো তিনি গম ভাঙার মেশিন কিনেছেন। ইচ্ছে–পরে ছেলেরা যদি ওটা চালিয়ে যায়।
রুমা এখানে এলে ওর যত গল্প নান্টুদার সঙ্গে। যত ভাব তত ঝগড়া। হাজার হোক পিঠোপিঠি ভাই-বোন তো!
কিন্তু নান্টুদাকে বাড়িতে বেশিক্ষণ পাওয়া যায় না। দুপুরে সেই যে খাওয়া-দাওয়া করে বেরিয়ে যায়, ফেরে রাত নটা-সাড়ে নটায়।
ওর আড্ডা দেবার জায়গা অন্য পাড়ায়। সেটা প্রায় বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরে। আসলে সেই পাড়াটাই এই গ্রামের যাকে বলে প্রাণকেন্দ্র তাই।
অত রাতে যখন সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরে তখন বাড়ির লোকের দুর্ভাবনার শেষ থাকে না। কেন না তাদের বাড়ির কাছাকাছি জায়গাটা শুধু নির্জনই নয়, কেমন গা-ছমছমে। ঐ যে বাঁশবন, ঐ যে ভেঙে পড়া বাড়িগুলো, ঐ যে জোড়া পুকুর–মনে হয় ওরই আশেপাশে কী এক অজানা রহস্য ঘাপটি মেরে বসে আছে। কখন কার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে কেউ তা জানে না।
এ অঞ্চলে ছিঁচকে চোরের উৎপাত থাকলেও বড়ো ধরনের চুরি-ডাকাতি বা খুন-খারাপি হয় না। খুন-খারাপি না হলেও এখানে অপঘাত মৃত্যু খুব বেশি। এ যেন গ্রামের ওপর একটা অভিশাপ।
বাড়ির লোকের ভয় করলেও, নান্টুর ভয়-ডর বলে কিছু নেই। বর্ষার সন্ধ্যায় অন্য পাড়ায় কেউ মরেছে। গরিব-দুঃখীর ঘরের মড়া। ফেলবার লোক নেই। সেই রাত্তিরেই দু তিনটে ছেলে নান্টুকে খবর দিয়ে যায়। বাড়ির আপত্তি নান্টু শোনে না। একটা গামছা কাঁধে ফেলে চলে মড়া ফেলতে। তাও শ্মশানটা কি কাছেপিঠে? তারপর আবার পল্লীগ্রামের শ্মশান জনমানবশূন্য।
তাই রুমা নান্টুকে বেশিক্ষণ পায় না। সকালে নান্টু ওঠে একটু বেলা করে। চা-মুড়ি খেয়েই আবার বেরিয়ে যায়।
