জলেশ্বর বলল, কি ভাবছ এত? ওটা আমায় দাও। পুরো টাকা আর একদিন এসে দিয়ে যাব।
আমি পরিষ্কার গলায় বললাম, না, ওটা আমি দিতে পারব না।
জলেশ্বর যেন গালে চড় খেয়ে থমকে গেল, মুখটা রাগে, অপমানে থমথম করতে লাগল। বললে, ঠিক আছে। তোমার জিনিস তোমারই থাক। এই বলে জলেশ্বর গুম হয়ে বসে রইল।
বসে রইল তো বসেই রইল। ওঠার আর নামই করে না। এদিকে বেলা পড়ে আসছে। একটু পরেই সন্ধ্যে হবে। তখন ও যাবে কি করে? অথচ ও আমার সঙ্গে থাকুক আমি তা মোটেই চাই না।
এমনি সময়ে ও গা-ঝাড়া দিয়ে উঠল। হেসে বলল, আজ রাতটা যদি তোমার কাছে থাকি অসুবিধে হবে?
আমাকে বলতেই হলো, কিছুমাত্র অসুবিধে হবে না।
তবু জলেশ্বরের মতো সাংঘাতিক একটা লোককে নিয়ে একসঙ্গে রাত্রিবাস করা যে কী ভয়ংকর ব্যাপার তা অন্যে বুঝতে পারবে না। ভয়ে ভয়ে প্রায় গোটা রাতটা জেগে কাটালাম।
মুখের ওপর রোদ এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। দেখি জলেশ্বর আগেই উঠে গেছে। নিজেকে ধিক্কার দিলাম, ছি ছি অতিথি আগে উঠে যাবে আর বাড়ির কর্তা পড়ে পড়ে ঘুমোবে? ছিঃ! ওর মুখ ধোওয়ার জল দিতে হবে, সকালের জলযোগের ব্যবস্থা করতে হবে–
ভাবতে ভাবতে ওর খোঁজ করতে গেলাম। কিন্তু দোতলা একতলা কোথাও তার দেখা পেলাম না। ভাবলাম হয়তো নদীর ধারে গেছে। অপেক্ষা করে রইলাম। কিন্তু সে আর ফিরল না।
অবাক কাণ্ড! এভাবে না জানিয়ে চলে যাবার কারণ কি?
একতলায় এসে ঘুরতে ঘুরতে কোণের ঘরের সামনে এসে দেখি দরজাটা খোলা। কঙ্কালটা নেই।
কঙ্কালের কি হলো বুঝতে বাকি রইল না। জলেশ্বরকে খুব দোষ দিই না। সে চেয়েছিল, আমি দিইনি। কাজেই চুরি করা ছাড়া তার উপায় ছিল না।
যাই হোক কঙ্কালটার একটা গতি হলো। সৎপাত্রে পড়েছে। তবুও নির্মম সত্য এই যে, জলেশ্বর ওটা চুরি করেছে। ও চোর। আমারই কাছে এক রাত থেকে আমারই সাধনার ধন নিয়ে পালিয়েছে। ও বিশ্বাসঘাতক! ওর ক্ষমা নেই।
.
বেশ কিছুদিন কেটে গেছে।
জলেশ্বরের আর দেখা নেই। দেখা দেবেই বা কোন লজ্জায়? কিন্তু আমার কৌতূহল ক্রমশ বেড়েই উঠছে। এটা নিয়ে ও কি করছে? সিদ্ধি হয়েছে? নাকি চড়া দামে কোথাও বেচে দিয়েছে? ওর তো অসাধ্য কিছুই নেই।
আর দৌলত খাঁ সাহেব? তিনি কি একটার পর একটা জীবহত্যা করেই চলেছেন?
সেটা ছিল বুধবায়। ভোরের দিকে মেঘ করেছিল বলে বেলা বুঝতে পারিনি। হঠাৎ বাইরের দরজায় জোর ধাক্কাধাক্কি। ধড়মড় করে উঠে নিচে নেমে গেলাম। দেখি বেশ কয়েকজন লোক জড়ো হয়েছে। উত্তেজনায় তারা থমথম করছে।
কি ব্যাপার?
মুদির দোকানের রাজেন ঘোষ, র্যাশনের দোকানের কমল গড়াই, আরও কয়েকজন এগিয়ে এসে বলল, একটা ডেড বডি পড়ে আছে।
ডেড বডি! চমকে উঠলাম।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কার?
তা তো জানি না। আপনার বাড়ির পিছনে তেঁতুল গাছটার তলায়। আপনি চেনেন কিনা দেখে যান।
ভয়ে ভয়ে গিয়ে দেখলাম।
না দেখলেই ভালো হতো। বীভৎসভাবে বিকৃত একটা মৃতদেহ। ঘাড়টা ভেঙে ঝুলছে। মুখ-চোখ ক্ষতবিক্ষত। চেনার উপায় নেই। তবু যে চিনলাম তা তার বিরাট দেহ আর দাড়ি গোঁফ দেখে।
কিন্তু মুখে বললাম, না, চিনি না।
বাড়ি ফিরে নিচের ঘরের দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম দরজা খোলা। জলেশ্বরকে শেষ করে মাটিতে শুয়ে আছে দৌলত খাঁর কঙ্কালখানা….আগের মতোই।
.
শেষ গতি
কিন্তু এভাবে একটা ভয়ংকর কঙ্কালকে নিয়ে তো চলতে পারা যায় না। প্রতি রাত্তিরেই ও বেরিয়ে যায়। আবার রাত থাকতে থাকতেই এই ঘরে অধিষ্ঠান করে। এখানেই যেন ওর ডেরা। অবশ্য ওর সৃষ্টির মুহূর্ত থেকেই ও তো এই ঘরটাকেই জানে। এটাই ওর সূতিকাগার–এটাই ওর নতুন জন্মভূমি।
এখন আর এক দুশ্চিন্তা–এটাকে নিয়ে কি করব? কোথায় ফেলব?
সেদিন অনেক রাতে গায়ে একটা হিমশীতল স্পর্শ পেয়ে ঘুমটা অতর্কিতে ভেঙে গেল। চমকে উঠলাম। এ কী! ঘরের মধ্যে বুড়িমা। ফিক ফিক করে হাসছে।
কি এঁত ভাবছিস? ওটা আমাকে দিয়ে আঁয়। সঁদগতি করে দেব।
ধড়মড় করে উঠে বসলাম। বুড়িমা যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে। একি স্বপ্ন? হতে পারে। কিন্তু তার বরফের মতো ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শটা যে এখনও গায়ে লেগে রয়েছে।
যাই হোক দু-একদিন পরেই আমি গোরুর গাড়ি করে কঙ্কালটা নিয়ে বুড়িমার সেই শ্মশানে এসে হাজির হলাম। যেখানে আমি দিনের পর দিন কাটিয়েছি।
আশ্চর্য! বুড়িমা যেন জানত আমি আসব। হেসে বলল, এঁসেছিস! আঁয়! শখ মিটেছে? দে ওটা।
কম্বলে ঢাকা কঙ্কালটা বুড়িমার সামনে রাখলাম। বুড়িমা বলল, ঐ যে একটা চিতা জ্বলছে। ওখানে শুইয়ে দে। দাঁড়া দাঁড়া, আগের কাজটা আগে সারি। বলে একটা কাঠ দিয়ে কঙ্কালটার মাথায় জোরে আঘাত করল। অমনি ফাটা মাথা থেকে একরাশ কালো কালো পোকা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
ভঁয় পাস নে। এবার দে চিতায় তুলে।
তাই দিলাম। আর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বামনের কঙ্কালটা ধোঁয়ায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
[অগ্রহায়ণ ১৪০৮]
ভয়
০১.
রেলপথ ও বাসরাস্তা থেকে অনেক ভেতরে যেখানে গোরুর গাড়ি কিংবা সাইকেল ছাড়া যাওয়া রীতিমতো কষ্টসাধ্য, সেসব গ্রামে এখনও এমন সব অলৌকিক ঘটনা ঘটে যা প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া আর কেউ জানে না। খবরের কাগজে বা কোনো লেখকের কলমে সত্য ঘটনা বলে তা ছাপা হয় না।
