চিনতে পারছেন কে উৎপাত করছে?
বললাম, প্রমাণ পাইনি। তবে আন্দাজ করছি।
পাদ্রীবাবা এবার আর কথা বললেন না। একটু চুপ করে থেকে উঠে পড়লেন। তারপর আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, ঘটনার যখন শুরু তখন বোধ হয় আপনার বয়েস ছিল ষোলো-সতেরো। তাই না?
বললাম, হ্যাঁ।
তারপর কুড়ি বছর কাটল। তাহলে এই মুহূর্তে আপনার বয়েস সাঁইত্রিশ। বড়ো সাংঘাতিক সময় শুরু হয়েছে আপনার জীবনে। এই মুহূর্তে আপনি ঐ অশরীরী আত্মার টার্গেট হয়ে আছেন। বাডড়া সাংঘাতিক আত্মাটি। কিছুতেই ছাড়বে না।
একটু থেমে বললেন, বলুবাবু ভাই, খুব সাবধানে থাকবেন। প্রমাণ না পেলেও আমারও অনুমান আত্মাটি আপনার সেই প্রথম বয়েসের বন্ধুটিরই। যা শুনলাম তাতে বুঝেছি মোটেই ভালো নয়। এরা এক ধরনের ঈর্ষাপরায়ণ, হিংসুটে, গোঁয়ার, সব সময়ে কর্তৃত্ব করতে চায়। মৃত্যুর পরও স্বভাব বদলাতে পারে না। এ নিশ্চয় আবার হানা দেবে।
হ্যাঁ, আর একটা কথা, বাঁয়া-তবলাটা কোথায়?
বাইরের ঘরে। যেখানে ছিল।
যদি পারেন ওটা পুড়িয়ে ফেলুন। নইলে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিন। ওটার ওপর আপনার বন্ধু চারুর বিষদৃষ্টি আছে।
বললাম, তা আমি পারব না। ওটা আমার দাদুর স্মৃতি।
পাদ্রীবাবা আমার এই স্পষ্ট কথা শুনে আর কিছু বললেন না। শুধু আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ডান হাতটা একটু তুলে চলে গেলেন।
.
০৯.
আমার সব কথা শুনে সেদিন পাদ্রীবাবা আমাকে সাবধানে থাকতে বলেছিলেন। সে নাকি আবার আমার বাড়িতে হানা দিতে পারে। কিন্তু কীভাবে তা প্রতিরোধ করব তার কোনো উপায় বলে দেননি তিনি। অশরীরী আত্মার আক্রমণ থেকে কোনো মানুষ শুধু বন্দুক দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারে এমন কথা শুনিনি। তাহলে!
সন্ধেবেলা বিমর্ষভাবে এইসব কথা ভাবছি, হঠাৎ দাদা-দাদা করতে করতে ভয়ে উত্তেজনায় নকুল বাইরের ঘরে এসে ঢুকল।
কী হয়েছে?
শীগগির আসুন। আবার সেইউঃ কী ভয়ংকর মুখ! তেড়ে এসেছিল। কোনোরকমে–
আমি তখনই উঠে পড়ে বললাম, চলো তো দেখি। বলে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। বেশি দূর যেতে হল না। দেখি দালানে ঢোকার মুখেই সেই ছায়ামূর্তি। এবার আরও স্পষ্ট। হাত দশেক তফাত থেকে দাঁড়িয়ে লক্ষ করলাম। হাইট প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট। মাথাটা নারকেলের মতো লম্বাটে। চুল নেই। এই হাইট দেখেই অনেকটা নিশ্চিত হলাম এ আমার সেই ছোটোবেলার শত্রু চারু, যে আমাকে বারে বারে হুকুম করত, শাসাত। কিন্তু সারা গায়ে এত মাটি কেন? শরীর ছাড়া ছায়ামূর্তিটি সর্বাঙ্গে এত ধুলো মাখল কোথা থেকে? সে দাঁড়িয়েছিল পিছন ফিরে। কেমন করে যেন বুঝতে পারল আমি এসেছি। তারপর ধীরে ধীরে মুখটা ফেরাল। মুখটা ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার ঘরে কোথা থেকে আবছা আলো এসে পড়ল। সেই আলোয় যা দেখলাম তা ভোলবার নয়।
মুখ কোথায়? একটা মড়ার খুলি। চোখ নেই, আছে শুধু দুটো গর্ত। গালে চামড়া নেই, এক চিলতে মাংস মুখে নেই, কিন্তু আছে বড়ো বড়ো হলদে ছোপধরা দাঁতের সারি। সেই দাঁতের সারির ফাঁক দিয়ে একটা অচেনা কর্কশ গলার স্বর শোনা গেল।
…..কুড়ি বছর শেষ….যেতে হবে আমার সঙ্গে। বলতে বলতে দুখানা সরু সরু পা সাইকেল চালাবার মতো বাতাসের মধ্যে দিয়ে প্যাডেল করে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমি আঁতকে উঠে দুপা পিছিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, না, আমি কোথাও যাব না।
খুলিটার মুখ দিয়ে ফ্যাসফেসে একটা হাসির মতো খানিকটা বাতাস সশব্দে বেরিয়ে এল।
স্পষ্ট শুনলাম করোটির মধ্যে থেকে আসা কথা, যেতে তোমাকে হবেই।
আমি খুব ভয় পেলাম। বললাম, কোথায় যেতে হবে শুনি।
যেখানে আমি আছি।
বিদ্রূপ করে বললাম, সেটা কোথায়? স্বর্গে না নরকে?
সে শুনে তোমার কী লাভ? তুমি তো আমার সঙ্গেই যাবে। তা যেখানেই থোক।
শোনবার দরকার নেই। তোমার গায়ে এত মাটি দেখে বুঝতে পারছি তুমি স্বর্গে থাকই না, নরকেও না। তুমি থাকো মাটির নীচে। অন্ধকারে কবরে। সেই কবর থেকে তুমি উঠে এসেছ।
হ্যাঁ, তাই। এখন আমার সেই কবরেই তোমাকে নেব। কবে থেকে অপেক্ষা করে আছি কুড়ি বছর। এই কুড়ি বছর পর্যন্ত আমার একটা গিট ছিল। যে গিট পেরিয়ে আমি এখন অনেক স্বাধীন, অনেক মুক্ত। আমার ইচ্ছাশক্তি, ক্ষমতা দুইই অনেক বেড়ে গেছে। চলো শীগগির। বলে আরও এগিয়ে এল।
আমি চিৎকার করে বললাম, তোমার সঙ্গে যাবার প্রশ্নই ওঠে না। তুমি মৃত। এ সংসারের সঙ্গে তোমার আর কোনো বন্ধন নেই। তুমি যেখানে খুশি যেতে পার, যেখানে খুশি থাকতে পার, কিন্তু আমি জীবিত। সুস্থ শরীরে বেঁচে আছি। বেঁচে থাকব। তা ছাড়া তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কও ভালো ছিল না। তুমি অনেকবার আমার ক্ষতি করবার চেষ্টা করেছিলে। তাই তোমার সঙ্গে কোথাও আমি যাব না। চলে যাও তোমার কবরে। আমাকে বিরক্ত কোরো না। তাছাড়া তুমি অনেকদিন থেকে নকুলকে ভয় দেখাচ্ছ কেন? ও কী করেছে? আমার মনে হয় তুমি নকুলকে সেই চোর বলে ভুল করে এসেছ যে আমারই নির্দেশে তোমার বাড়ি থেকে বাঁয়া-তবলা উদ্ধার করে এনেছিল। তার নাম ছিল গোদা। নকুলের দুর্ভাগ্য ওকে গোদার মতোই দেখতে। ও কি! ওভাবে আমার দিকে এগোচ্ছ কেন? আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, নকুল! আমাকে বাঁচা!
কিন্তু কোথায় নকুল? সে বোধ হয় ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
