এমনি ভাবে কত যে সে নরহত্যা করেছে তার হিসেব নেই।
এমনি সময়ে নেপাল থেকে রাজার এক চর ওর কাছে এসে বলল, রাজার ইচ্ছে দেবপ্রয়াগে টিহরীরাজের রামসীতার মন্দিরে যে বিপুল ধনসম্পত্তি আছে তা এনে দিতে হবে।
দৌলত খাঁর ধনদৌলতে লোভ ছিল না। টাকা-পয়সা নিয়ে কী করবে? তার আনন্দ ছিল লুঠপাট, খুন-খারাপিতে।
নেপালরাজের আদেশ পাওয়া মাত্র সে একদিন রামসীতার মন্দিরে অভিযান চালালে। সেই মন্দিরে একজন সাধক থাকতেন। দৌলত খাঁ তাকে হত্যা করতে গেল আর ঠিক তখনি মন্দিরের ভেতর থেকে একটা বিষধর সাপ সাধকের কোলের ওপর দিয়ে এসে দৌলত খাঁকে কামড়ে দিল। মরবার মুহূর্তে দৌলত খাঁ বুঝে গেল ঐ সাধকই তাকে মেরেছে।
এই হলো দৌলত খাঁর ইতিহাস। তারই কঙ্কাল আমার বাড়িতে দিব্যি অধিষ্ঠান করছে।
.
জলেশ্বরের পুনরাবির্ভাব
এক বুক দুর্ভাবনা নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে এলাম। কঙ্কালটা কেন যে এত ভয়ংকর হিংস্র তা বুঝতে পারলাম। এও বুঝলাম যেহেতু একজন সাধক তার মৃত্যুর কারণ সেজন্যে দৌলত খাঁর হাত থেকে আমারও নিষ্কৃতি নেই। অথচ দিনের পর দিন দৌলত খাঁর কঙ্কালের সঙ্গেই আমায় থাকতে হবে। কিভাবে ওটার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাব তা ভেবে পেলাম না।
এখানে পৌঁছবার পর দিনই শহরে গিয়ে মিস্ত্রি ডেকে এনে দোতলায় সিঁড়ির মুখে আর প্রত্যেকটা জানলায় মোটা গ্রিল বসিয়ে নিলাম। অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। লোহার গ্রিল দিয়ে চোর-ডাকাত ঠেকানো যায়, কিন্তু প্রেতাত্মা? আধুনিক গেট, গ্রিল কি ওদের আটকাতে পারে?
তাহলে?
আমি গ্রামের মানুষ। ভূত-প্রেতের বহু ঘটনা জানি। ওঝারা কি করে ভূত তাড়ায় তাও আমি দেখেছি। তাই তখনই একটা উপায় মাথায় খেলে গেল। বাঁশঝাড় থেকে একটা কাঁচা বাঁশ কেটে এনে তার দুপ্রান্ত খানিকটা পুড়িয়ে নিলাম। তার পর বাঁশটা একতলার সিঁড়ির মুখে আড়াআড়ি করে ফেলে রাখলাম। ওঝাদের মুখে শুনেছি কোনো অশরীরীর ক্ষমতা নেই এই বাঁশ ডিঙোয়।
এবার প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরের দরজায় কোলপসিবল গেট, গ্রিল বন্ধ করে একরকম স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে বসে থাকি। রান্না থেকে আরম্ভ করে সব ব্যবস্থাই দোতলায় করে নিয়েছি। ঠিক করেছি খুব দরকার না হলে নিচে আর নামব না।
ভেবেছিলাম এই দুর্ভেদ্য দুর্গে এবার আমি নিশ্চিন্তে রাত কাটাতে পারব। কিন্তু পারিনি। প্রায় রাত্তিরে আমার ঘুম ভেঙে যায়। শুনতে পাই একতলার বারান্দায় কেউ যেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনেকটা খাঁচায় বদ্ধ হিংস্র সিংহের মতো। কেউ যেন দোতলায় ওঠবার বার বার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।
আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে থাকি বিছানায়। তার পরেই খিড়কির দরজা খোলার শব্দ। কেউ যেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
বাকি রাতটুকুর জন্যে নিশ্চিন্ত। ও এখন পথেঘাটে জঙ্গলে শিকার খুঁজে বেড়াবে।
কিন্তু….এভাবে কত দিন চলতে পারে? এমনি সময়ে একদিন দুপুরে হঠাৎ জলেশ্বর এসে হাজির। দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল থেকে সাদা দাঁতগুলো বের করে হাসছে।
এই লোকটাকে আমি সহ্য করতে পারি না। লোকটা নিষ্ঠুর, হিংসুটে, বদমেজাজী। সেই নিরীহ সাধুটাকে এমন চড় মেরেছিল যে সে বেচারি মরেই গিয়েছিল। লোকটা মতলববাজও। আমার কত টাকা-পয়সা আছে তা জানতে কৌতূহলী খুব।
তবু আমার এই দুঃসহ নিঃসঙ্গতার মধ্যে ও যখন এসে দাঁড়াল তখন খুশিই হলাম। ওর হাত দুটো ধরে সাবধানে বাঁশটা ডিঙিয়ে ওপরে নিয়ে এলাম।
এখানে আবার বাঁশ কেন?
আমি সত্যি কথাটা চেপে গিয়ে বললাম–হ্যাঁ, ওটা সরিয়ে রাখতে হবে।
ও ওপরে এসে কাঁধের ঝুলিটা বিছানায় রেখে দুপা তুলে জাঁকিয়ে বসল।
আমি ওকে এ কদিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বলব কিনা ভাবছিলাম। ও যা সাংঘাতিক লোক, আমার অন্তত অর্ধেক সিদ্ধির কথা জানলে হিংসেয় জ্বলে মরবে। আর ওর হিংসের ফল আমার পক্ষে ক্ষতিকর হবেই। আবার না বলেও পারছিলাম না। নিজের কৃতিত্বের কথা সবাই জাহির করতে চায়।
বলব কি বলব না ভাবছি, শেষ পর্যন্ত জলেশ্বরই পথ পরিষ্কার করে দিল।
তোমার দরজায় কোলাপসিবল গেট কেন? আরে! জানলাতেও দেখছি গ্রিল! চোরের উৎপাত হচ্ছে নাকি?
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আবেগে উৎসাহে বললাম, চোর-ডাকাত নয় ভাই, আরও আরও ভয়ংকর। বলে হড়বড় করে সব ঘটনা বলে গেলাম। বললাম না শুধু দৌলত খাঁর কাহিনী।
শুনে জলেশ্বরের চোখ দুটো লাফিয়ে উঠল, বল কী হে!
জলেশ্বর কঙ্কালটা দেখতে চাইল। ওকে নিয়ে নিচের ঘরে গেলাম। ও কিছুক্ষণ ওটা দেখল। তারপর ওপরে এসে বলল, এ তো সাংঘাতিক জিনিস। বামনের কঙ্কাল তো পাওয়াই যায় না।
এর পর সরাসরি বলল, এটা নিয়ে তুমি খুব অশান্তিতে আছ বলে মনে হচ্ছে। এটা না হয় আমাকে দিয়ে দাও। অত টাকা অবশ্য আমার নেই–
ওকে দিয়ে দিতে পারলেই আমি নিশ্চিন্ত হতাম-দেওয়াই বোধ হয় উচিত ছিল। কিন্তু কেন যেন দিতে মন সরল না।
আশ্চর্য! যে জিনিসটা আমার নিত্য ভয়ের কারণ, যার গতি হলে আমি স্বস্তি পেতাম সেটা আমি ওকে দিতে পারলাম না। যেটাকে আমি তিল তিল করে তৈরি করেছি, যাকে নিয়ে ভয়ংকর পরীক্ষা করেছি, সেটা যেন একমাত্র আমারই সম্পত্তি। আরও স্পষ্ট কথা হলো এই যে, জলেশ্বর মানুষটা লোভী। আমার তৈরি জিনিস দেখে বাগাবার চেষ্টা করছে।
