না, আবার কী বলবে?
ওরা তিনজন চোখে চোখে কথা বলে নিল। বুঝলাম বিপদ আসন্ন।
ওরা বলল, চলুন ফকিরসাহেব, বিশ্রাম করবেন। বলে আমায় পাশের একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিল।
আমি প্রমাদ গুণলাম। বুঝলাম আমার আর মুক্তি নেই। আমায় ওরা বিশ্বাস করছে না।
দুদিন কেটে গেল বন্দী অবস্থায়। আমার কেবলই মাথায় ঘুরছিল ইদ্রিশ কি আর কিছু বলেছিল?
না। আর কি বলবে?
ও হাঁ, বলেছিল ফকিরের বেশ ধরতে হবে। তা তো আমি ধরেছি। কিন্তু আর তো কিছু বলেনি।
সেদিন দুপুরবেলায় ওদের একজন ঘরে ঢুকে উর্দু-হিন্দি মিশিয়ে যে কথাটা বললে, বাংলা করলে তা দাঁড়ায় এইরকম–
কি ফকিরসাহেব, কি মতলবে এসেছ খোলাখুলি বলো তো।
বললাম, ইদ্রিশের চিঠিতেই তা লেখা আছে।
ও চিঠি জাল।
না, জাল নয়।
জাল যদি নাই হয় তা হলে ইদ্রিশ আর কি বলেছে বলো।
না, ও আর কিছু বলেনি।
লোকটা হা হা করে হেসে উঠল। বলল, তা হলে তুমি ধাপ্পাবাজ। আর ধাপ্পাবাজের শাস্তি কি জানলা দিয়ে তাকিয়ে দ্যাখো।
দেখলাম দুজন লোক একটা জায়গায় কোদাল দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে।
হায় ভগবান! ওরা আমার কবর খুঁড়ছে।
লোকটা দরজায় তালা বন্ধ করে চলে গেল। আর আমি আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে গুম হয়ে রইলাম। কী কুক্ষণে ঐ বামনের কঙ্কালটার ইতিহাস জানতে এসেছিলাম! এর চেয়ে ওটার হাতে মরণ ভালো ছিল। তবু নিজের বাড়িতে মরতে পারতাম। কিন্তু..ইদ্রিশ যেন আরও কি বলেছিল। ইস্! মনে পড়ছে না তো। হ্যাঁ, বলেছিল চিঠি পড়েও যদি ওরা বিশ্বাস না করে তা হলে বলো
কী যেন বলতে বলেছিল….ইদ্রিশের কি একটা রোগ হয়েছিল? উদরি? ভিরমি? মাথার গণ্ডগোল? না–না, রোগটোগ নয়, তা হলে? তা হলে যে কী তা কিছুতেই মনে পড়ল না–একটা সাংঘাতিক কথা….
সামান্য একটা কথা ঠিক সময়ে কিছুতেই মনে না পড়লে তার যে কী অপরিসীম যন্ত্রণা
এমনি সময়ে দরজা খুলে তিনজনই ঢুকল। হাতে ছোরা।
ফকিরসাহেব!
হা হা, মনে পড়েছে ইদ্রিশ কিছু একটা বলেছিল, কিন্তু আমি মনে করতে পারছি না। আমায় একটু সময় দাও।
না। তুমি মিথ্যেবাদী! বলে একজন আমার চুলের মুঠি ধরতেই আমার স্মৃতির দরজা হাট করে খুলে গেল। অমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, মনে পড়েছে ….মনে পড়েছে– ইদ্রিশ বলেছিল ওর মাথায় একগাদা উকুন হয়েছে।
ব্যস! যেই একথা বলা অমনি যেন জোঁকের মুখে নুন পড়ল। ওরা ছোরা ফেলে দিয়ে আমার পায়ে আছড়ে পড়ল। বলল, ফকিরসাহেব ক্ষমা করো। আমাদের ভুল হয়েছিল।
তারপর আমার দারুণ খাতির, খানাপিনা, আদর-আপ্যায়ন
সে সব মিটতে জালালুদ্দিন দৌলত খাঁর সুদীর্ঘ ইতিহাস আমায় যা শোনাল তা সংক্ষেপে এইরকম–
অনেক দিন আগে একবার নেপালের রাজা হিমালয়ের সংলগ্ন গাড়োয়াল রাজ্য আক্রমণ করেন। গাড়োয়ালরাজ যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে নিজের রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যান। নেপালীরা রাজপ্রাসাদ, দুর্গ দখল করে যথেচ্ছ অত্যাচার চালায়।
গাড়োয়ালরাজ উপায়ান্তর না দেখে ইংরেজের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করেন। আর ইংরেজদের সাহায্যে নেপালীদের তাড়িয়ে গাড়োয়ালকে ফের স্বাধীন করেন। কিন্তু এর জন্যে ইংরেজকে গাড়োয়ালের অনেকখানি দিয়ে দিতে হয়। এই অংশ ব্রিটিশ গাড়োয়াল নামে পরিচিত হয়। বাকি অংশ স্বাধীন গাড়োয়াল।
গাড়োয়ালরাজ কিন্তু তাঁর রাজধানীতে আর ফিরে এলেন না। রাজধানী থেকে বত্রিশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অলকানন্দার অপর পারে টিহরীতে নতুন করে রাজধানী স্থাপন করেন। তাঁর নতুন পরিচয় হলো টিহরীরাজ।
গাড়োয়ালের মধ্যে দেবপ্রয়াগ একটি প্রসিদ্ধ স্থান। এখানে একটি পুরনো মন্দির আছে। তার মধ্যে রামসীতার মূর্তি। এই মন্দিরের অধিকারী টিহরীর রাজা। মন্দিরে অনেক ধনসম্পত্তি লুকনো আছে। টিহরী রাজ্যের নিয়ম–রাজার মৃত্যু হলে তাঁর নিজের ব্যবহারের সব জিনিস এই মন্দিরে রাখা হয়।
এই গাড়োয়ালের এক পর্বতগুহায় একটা অদ্ভুতদর্শন লোক ছিল। আকারে বেঁটে। মাথাটা দেহের তুলনায় অনেক বড়ো৷ সেই মাথায় রোঁওয়া রোঁওয়া চুল। ভয়ংকর দুটো চোখ। আঙুলে হিংস্র জন্তুদের মতো বাঁকানো নখ। সে লোকালয়ে বড়ো একটা আসত না। জীবজন্তু মেরে খেত। ক্ষুদে রাক্ষসজাতীয় আর কি।
যারা তাকে দেখেছিল তারা ভয়ে পালাত। তার কি জাত কি ধর্ম তা কেউ জানত না। তার একমাত্র পরিচয় ছিল পাহাড়ী শয়তান। কত যে তার বয়সে কেউ বুঝতে পারত না। কে যে কেন তার নাম দৌলত খাঁ রেখেছিল তাও জানা যায় না।
ক্রমে সে লোকালয়ে আসতে আরম্ভ করল। ইচ্ছে করলেই অসাধারণ তৎপরতায় সে মানুষ খুন করতে পারত।
ওদিকে নেপালরাজ প্রতিশোধ নেবার জন্যে নানারকম ফন্দি আঁটছেন। তিনি যখন দৌলত খাঁর মতো হিংস্র বামনের কথা শুনলেন তখন গোপনে তাকে ডেকে পাঠালেন। তার ওপর ভার দেওয়া হলো টিহরীরাজ্যে সন্ত্রাস চালাতে হবে যাতে টিহরীরাজ জব্দ হন।
দৌলত খাঁর এটা বেশ মনের মতো কাজ হলো। অহেতুক নরহত্যায় ওর দারুণ আনন্দ। গভীর রাতে সে টিহরীর পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। যাকেই পায় তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে নৃসিংহ অবতারের মতো পেট চিরে ফেলে। অথচ তাকে কেউ ধরতে পারে না। ধরতে পারে না তার কারণ রাতের অন্ধকারে সে তার ছোট্ট দেহটা নিয়ে চটপট লুকিয়ে পড়তে পারে। শুধু তাই নয়, দুমিনিটের মধ্যে গাছে ওঠা বা উঁচু পাঁচিলে ওঠা তার পক্ষে কিছুই নয়।
