আমার বুকটা কেঁপে উঠল। কোনোরকমে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকটা লম্বায় চওড়ায় কিরকম?
সেও অদ্ভুত মশাই! এই আমার কোমর পর্যন্ত।
শুনে আমি ঢোঁক গিললাম।
তারপর?
তার চোখ দুটো চিকচিক করে জ্বলছিল। হঠাৎ অন্ধকারে শালবনের মধ্যে ঐরকম একটা বীভৎস মূর্তি দেখে সকলে চিৎকার করে উঠেছিল। অদ্ভুত জীবটা অমনি লাফ দিয়ে মড়ার মাচায় উঠে মড়াটা টেনে নিয়ে বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। সবাই স্বচক্ষে দেখেছে মশাই।
তারপর?
শবযাত্রীরা তো পিশাচ পিশাচ বলে ভয়ে ছুটে পালিয়ে গেল।
আমি একরকম হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর?
তারপর আজ সকালবেলায় মড়াটা ছিন্নভিন্ন অবস্থায় শালবনের ধারে পাওয়া গেছে। পুলিশ জায়গাটা ঘিরে আছে। একবার যান না। দূর থেকে দেখে আসুন।
উত্তর না দিয়ে আমি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। বুঝতে পারলাম শাস্ত্রর নিয়ম ঠিকমতো না মেনে শবসাধনার বদলে কঙ্কাল সাধনা করতে গিয়ে এই অদ্ভুত জীবের সৃষ্টি করে ফেলেছি। শুধু অদ্ভুত জীবই নয়, ওটা আবার ভয়ংকর মাংসাশী হয়ে উঠেছে। ও যে এখন কতজনের সর্বনাশ করবে তার ঠিক নেই। আমিও নিস্তার পাব না।
বাড়ি পৌঁছেই আমি নিচের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজা বন্ধই আছে। জানলা ফাঁক করে দেখলাম বামন বাবাজি তার কঙ্কালখানি নিয়ে শান্তভাবে পড়ে আছেন। বুঝলাম সারারাত ঘুরে শেষে এই ঘরেই এসে একটু বিশ্রাম নেন। এই ঘরটা যেন ওনার নিজের হয়ে গেছে।
সেদিন সকালবেলায় পাড়ার মুদির দোকান থেকে চাল-ডাল কিনতে গেলাম। দেখি কয়েকজন বসে গম্ভীরভাবে কি নিয়ে আলোচনা করছে। আমায় দেখে মুদির দোকানের মালিক রাজেন ঘোষ বললে, এই যে মল্লিকমশাই, খবর সব শুনেছেন তো?
বুঝতে পারলাম কি বলতে চাইছে। তবু না বোঝার ভান করে বললাম, কী খবর?
সে কি মশাই, গোটা গায়ে হৈ-চৈ পড়ে গেছে, লোকে ভয়ে কাঁপছে আর আপনি কিছুই জানেন না?
আমতা আমতা করে বললাম, ও হা, শুনেছি বটে কোথা থেকে একটা পিশাচ দেখা দিয়েছে।
শুধু পিশাচ? ওটা না পুরোপুরি পিশাচ, না ব্রহ্মদত্যি, না ভূত। পশু-পাখি, জীবজন্তু যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে। এমনকি মড়া পর্যন্ত। এবার জ্যান্ত মানুষ ধরে ধরে খাবে।
আমি চুপ করে শুনে গেলাম। বেশি কথা বলতে সাহস পেলাম না। কিন্তু মারাত্মক খবরটা দিল র্যাশনের দোকানের কমল গড়াই। বললে তার স্ত্রী নাকি অনেক রাতে আমার বাড়ির কাছে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিল স্রেফ হাত দুয়েক লম্বা একটা জ্যান্ত কঙ্কালকে। মাথাটা তার ইয়া বড়।
আশ্চর্য হয়ে বললাম, আমার বাড়ির কাছে?
হ্যাঁ। আপনি একটু সাবধানে থাকবেন।
চাল-ডাল কিনে চুপচাপ বাড়ি চলে এলাম।
একদিন বিকেলে আকাশ ছেয়ে মেঘ করেছে। সেই সঙ্গে শুরু হলো ঝড়। জানলা বন্ধ করতে গিয়ে দেখি, ছাদের আলসেতে আমার কাপড় শুকোতে দিয়েছিলাম, সেটা উড়ে যাচ্ছে।
কী আশ্চর্য! আমি কাপড়টা গিঁট বেঁধে দিইনি?
কাপড়টা দিব্যি বাতাসে ঢেউ খেলিয়ে উড়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি নিচে নেমে কাপড়টা উদ্ধার করতে ছুটলাম। কাপড়টা গিয়ে একটা আমগাছের ডালে আটকে গেল। কোনোরকমে ডিঙি মেরে একটা কঞ্চির সাহায্যে ওটা পেড়ে নিলাম।
প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে বাড়ি ফিরে দোতলায় উঠতে যাচ্ছি–খট খট শব্দ। তাড়াতাড়ি থামের আড়ালে লুকোলাম। দেখলাম কঙ্কালটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। ভাগ্যি আমি ওপরে ছিলাম না।
অদ্ভুত আকৃতির কঙ্কালটা তার দেহটা টানতে টানতে আর বিরাট মাথাটা নাড়তে নাড়তে নির্দিষ্ট ঘরের দিকে চলে গেল। হয়তো এবার ও নিজেই শেকল খুলে ঘরে ঢুকবে।
ও তাহলে দোতলাতেও উঠতে আরম্ভ করেছে। এইটে আরও ভয়ের ব্যাপার। ও আমাকে খুঁজছে। কেন? নিশ্চয় আমার সঙ্গে গল্প করার জন্যে নয়।
আমার হাত-পা হিম হয়ে গেল। এরপর একা বাড়িতে এই মূর্তিমান আতকংটির সঙ্গে থাকব কি করে? না থেকেই বা যাব কোথায়? চিরকালই তো আমি লোকালয় থেকে দূরে থেকেছি। কিন্তু একটা কথা ভেবে পাচ্ছি না–কঙ্কালটা এমন হিংস্র হয়ে উঠল কেন? এর পেছনে কি কোনো ইতিহাস আছে?
যার কাছ থেকে এটা কিনেছিলাম সে বলেছিল এটা নাকি এককালের সাংঘাতিক বামন দৌলত খাঁর কঙ্কাল।
সে কতকাল আগের? কী এমন সাংঘাতিক কাজ করেছিল দৌলত খা?
ভাবলাম ওর ইতিহাস আমায় জানতেই হবে। আর এটা জানাতে পারে সেই ব্যবসায়ীটিই।
সেইদিনই আমি ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা করতে অনেক দূরে এক অখ্যাত গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।
.
পর্বতনিবাসী দৌলত খাঁ
ব্যবসায়ীর নাম ইদ্রিশ আলি। এদিনও সে পরনে লুঙ্গি জড়িয়ে একজনের সঙ্গে বাড়ি মেরামতির খরচ-খরচার হিসেব কষছিল। আমাকে চিনতে পারেনি। একটু বসতে বলে লোকটির সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে আমার দিকে তাকাল।
বলুন স্যার।
আমার পরিচয় দেবার পর ও মনে করতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে গলার স্বর বদলে ফিস ফিস করে বলল, জিনিসটা ভালোই দিয়েছিলাম কি বলুন? আপনার ডাক্তারি শেখা হচ্ছে তো?
প্রকৃত ঘটনা চেপে গিয়ে বললাম, এ তো সাংঘাতিক জিনিস ভাই। ওটা মাঝে মাঝে নড়ছে।
ইদ্রিশ আলি চমকে উঠল। বলেন কী?
বললাম, হ্যাঁ, সত্যি। নইলে এতদূর ছুটে আসব কেন?
ইদ্রিশ অবাক হয়ে বললে, কিন্তু আমার কাছে এতদিন ছিল, কখনও তো নড়তে দেখিনি।
তারপর বলল, যাই হোক সাবধান, ওটা শুনেছি দৌলত খাঁর কঙ্কাল। সাংঘাতিক বামন ছিল। কত যে খুন করেছিল তার হিসেব নেই। ওটা কিন্তু আর ফেরত নিতে পারব না।
