এ ঘরে ঢুকি না বটে কিন্তু কী একটা তীব্র আকর্ষণ আমায় ঐ ঘরের দরজা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। আর এই আকর্ষণটা তীব্রতর হয়ে ওঠে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে।
একদিন, তখন বেলা পড়ে এসেছে, নিচের তলাটা এরই মধ্যে অন্ধকার–আমি যেন আমার অজান্তই দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। গোটা বাড়িটা নিঝুম, নিস্তব্ধ। হঠাৎ মনে হলো ঘরের মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ। চমকে উঠলাম। এ তো মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। কিন্তু
কিন্তু এ ঘরে মানুষ কোথায়? তবে কি কোনো জন্তু
না-না, এ জন্তু নয়, জন্তু ঢুকবেই বা কি করে? এ নিঃশ্বাস মানুষের। আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম ঘরে জীবিত কেউ আছে।
ভয়ে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে এলাম। তারপর দরজা বন্ধ করে বিছানার ওপর পা গুটিয়ে বসে রইলাম।
এই বাড়িতে বেশ কিছুকাল ধরে একাই থাকি। কোনো দিন ভয় পাইনি। আজ মনে হলো এত বড় বাড়িতে আমি আর একা নই। অন্য কেউ আছে, সে আর যাই হোক মানুষ নয়। আমার গা-হাত-পা কাঁপতে লাগল।
সাধারণত মাঝরাতে আমার ঘুম ভাঙে না। কিন্তু সেদিন ঘটল ব্যতিক্রম।
অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হলো মাথার কাছে বন্ধ জানলাটা বাইরে থেকে। কেউ খোলবার চেষ্টা করছে। চমকে উঠে বসলাম–চোর নাকি?
আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে কান পেতে রইলাম।
কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তার পরেই শব্দ–খটখট—
কেউ যেন জানলার পাল্লা ধরে টানছে।
আমি সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, কে?
শব্দটা থেমে গেল। কিন্তু মিনিট দুই পরেই অন্যরকম শব্দ হলো–ধুপ। কিছু একটা ভারী জিনিস যেন জানলা থেকে পড়ে গেল। অথবা কেউ লাফিয়ে পড়ল। তারপরেই শুকনো পাতা মাড়িয়ে কিছু যেন দ্রুত চলে গেল।
সে রাতে আর ঘুম হলো না। কে এসেছিল দোতলার জানলায়–কেনইবা জানলা খোলবার চেষ্টা করছিল কিছুই বুঝতে পারলাম না। হাতের কাছে টর্চ ছিল। কিন্তু জ্বালবার সুযোগ হয়নি।
সত্যিই কি চোর কিংবা ডাকাত উঠেছিল? কিন্তু চোরই হোক বা ডাকাতই হোক উঠবে কি করে? এ দিকের দেওয়াল থেকে জল পড়ার কোনো পাইপ নেই। আর দেওয়াল বেয়ে দোতলায় ওঠা কোনো মানুষের সাধ্য নয়। তবে কি লোকটা মই নিয়ে এসেছিল?
তা হতে পারে। কিন্তু নামবার সময়ে লাফ দিয়ে পড়ল কেন?
কী জানি।
পরের দিন সকালে জানলার নিচে কোনো ফেলে যাওয়া মই দেখতে পাইনি।
এইভাবে নানা সংশয়ে সন্দেহে আমি যখন দোদুল্যমান তখনই আর একদিন রাতে এই কাহিনীর প্রথমেই যে ঘটনার উল্লেখ করেছি সেই ঘটনাটা ঘটল।
ইদানিং রাতে ভালো করে ঘুম হতো না। কেবলই মনে হতো আবার বুঝি কেউ জানলার কপাট খোলবার চেষ্টা করছে। চোর-ডাকাতে করছে জানলেও নিশ্চিন্ত হয়ে পারতাম। কেননা চোরের কাছ থেকে সাবধান, সতর্ক হওয়া যায়। কিন্তু অন্য কিছু হলে
দ্বিতীয় রাতের ঘটনায় কেউ একজন যেন কাঠের পা নিয়ে খট খট করে দোতলায় উঠে আসছিল। কে আসছিল? যে সেদিন জানলা ভেঙে ঘরে ঢোকবার চেষ্টা করছিল সেই কি?
যে আসছিল সে যে আমার মুখোমুখি দাঁড়াতে চায় সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু কেন? আমাকে তার কীসের দরকার?
একথা মনে হতেই ভয়ে আমার চুলগুলো খাড়া হয়ে ওঠে।
পরের দিন সকালেই নিচের ঘরের সামনে গিয়ে দেখি দরজা তেমনি শেকল ভোলাই রয়েছে। কিন্তু খিড়কির দরজাটা খোলা।
আশ্চর্য! কে খুলল দরজাটা? পিছনের দরজা তো বন্ধই থাকে।
আমি তখনই বেরিয়ে পড়লাম। এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে নদীর ধারে চলে এলাম। হঠাৎ নজরে পড়ল বালির ওপর পায়ের চিহ্ন। সে পদচিহ্ন পূর্ণবয়স্ক মানুষের নয়, কোনো বালকেরও নয়। এক বিঘতেরও কম লম্বা কিন্তু বেশ গভীর। গভীরতা দেখে বোঝা যায় যার পায়ের চিহ্ন সে ওজনে ভারী। তা ছাড়া লক্ষ্য করলাম আঙুলগুলো অস্বাভাবিক ফাঁক ফাঁক। হাড়গুলো তুলনায় সরু।
আমি সেই পদচিহ্ন অনুসরণ করে চললাম শালবনের দিকে। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে বেশিদূর চিহ্নগুলো খুঁজে পেলাম না।
ফিরে আসব ভাবছি হঠাৎ জঙ্গলের একপাশে পাঁচ-ছটা বাদুড় মরে পড়ে আছে দেখলাম। সব কটাই খণ্ড-বিখণ্ড। এতগুলো বাদুড় একসঙ্গে কি করে মরল আর কেই বা সেগুলোকে অমন করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে তা বোধগম্য হলো না। পরিষ্কার বোধগম্য না হলেও কেমন একটা সন্দেহ মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল। যিনি একদিন আমার জানলা ভাঙতে গিয়েছিলেন কিংবা গভীর রাতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চেষ্টা করেছিলেন সেই বামন-দেবতাটির কাজ নয় তো? ভাবতেও সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
এতদিন নির্জন বাড়িতে একা একা বেশ ছিলাম। কী কুক্ষণে জলেশ্বর এসে আমার মাথায় মরণখেলার নেশা ঢুকিয়ে দিয়ে গেল!
বাড়ি ফিরেই শেকলবন্ধ দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। দরজা খুলতে সাহস হলো না। জানলাটা একটু ফাঁক করে দেখলাম তিনি খড়ের বিছানায় দিব্যি শান্তভাবে শায়িত রয়েছেন।
কদিন পর সেটা ছিল বোধহয় রবিবার। আমার বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে বাজারের দিকে যেতে যে ফাঁকড়া রাস্তাটা একটা বাঁক খেয়ে শালবনের দিকে গেছে সেই মোড়ে পৌঁছাতেই দেখলাম লোকের জটলা। সবারই মুখে-চোখে আতংকের ছাপ। ভাবলাম সাত-সকালে কী এমন ঘটল?
একে-ওকে জিজ্ঞেস করে যা জানলাম তা রীতিমতো ভয়ংকর ব্যাপার। গত রাতে কয়েকজন লোক শালবনের পাশ দিয়ে মড়া নিয়ে কবরখানার দিকে যাচ্ছিল। শববাহীরা আগে আগে চলছিল। পিছনে জনা তিনেক। তাদের হাতে লণ্ঠন, শাবল, কোদাল। হঠাৎ তারা নাকি দেখে মানুষের মতো একটা জীব–প্রায় কঙ্কালসার, তাদের পথ আগলে দাঁড়াল।
