ব্যবসায়ীটি এ তল্লাটে একজন রাজমিস্ত্রি বলে পরিচিত। সে তো প্রথমে ভালো করে যাচিয়ে নিল আমি পুলিশের লোক কিনা। যখন জানল প্রাইভেটে ডাক্তারি পরীক্ষা দেবার জন্যেই আমি একটা গোটা কঙ্কাল খুঁজছি তখন সে দরজা-জানলা বন্ধ করে দু-তিনটে কঙ্কাল বের করে দেখাল। কিন্তু সবকটাতেই খুঁত আছে। হয়তো খুলিটা একটু ফাটা কিংবা একটা আঙুল ভাঙা। এতে আমার কাজ হবে না বলে যখন হতাশ হয়ে চলে আসছি তখন ছুঁচলো মুখ লুঙ্গিপরা লোকটা দুর্গন্ধপূর্ণ অন্ধকার গুদোম ঘর থেকে একটা বেঁটে কঙ্কাল এনে দেখাল। কঙ্কালটা যেন ন-দশ বছরের ছেলের। খড়ির সঙ্গে কী সব ওষুধ মাখানো। লোকটা নিচু গলায় বলল–এটা কাউকে দেখাই না স্যার। এত পুরনো কঙ্কাল বড়ো একটা পাওয়া যায় না। জম্মু-কাশ্মীরের কাছে পুরনো কবর খুঁড়ে এটা পাওয়া গেছে। ওখানকার লোকে বলে এটা এককালের সাংঘাতিক বামন দৌলত খাঁর কঙ্কাল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এটা বামনের কঙ্কাল?
হাঁ স্যার, দেখছেন না কিরকম মোটা মোটা আঙুল, দেহের তুলনায় কত বড়ো মাথা, বুকের খাঁচাটা কত চওড়া। এ জিনিস পাবেন কোথায়?
এ কঙ্কাল কোনো এক দৌলত খাঁরই হোক আর নসরৎ খাঁরই হোক ও নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমি ওটাই যথেষ্ট বেশি দাম দিয়ে কিনে নিলাম।
কিন্তু এটা অতদূরে আমার বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাব কি করে? কোলে করে তো নিয়ে যাওয়া যায় না।
সে ব্যবস্থা ব্যবসায়ীই করে দিল। ওর চেনাশোনা একটা দুইটাকা গোরুর গাড়ি ডেকে আনল। কঙ্কালটা আপাদমস্তক কম্বল দিয়ে মুড়ে নিরাপদে বাড়ি নিয়ে এলাম।
.
কঙ্কাল সাধনা
আমার বাড়ির নিচের তলার একটা ঘর বেশ অন্ধকার। সেখানেই পুরু করে খড় বিছিয়ে তার ওপর কঙ্কালটা রাখতে গেলাম। কিন্তু কঙ্কালটা যেন হাত থেকে পিছলে পড়ে গেল। আশ্চর্য হলাম। পড়ে যাবার তো কথা নয়। আমি তো দুহাত দিয়ে ধরেছিলাম। আর পড়বি তো পর উপুড় হয়ে।
আমি হাঁটু গেড়ে বসে দুহাতে করে কঙ্কালটা চিৎ করে দিলাম। চিৎ করে দিতেই মন হলো কঙ্কালটার চোখের গর্তদুটো যেন কেমন। গর্তের ভিতরে কি যেন চিকচিক করছে। ভাবলাম বুঝি চোখের কোটরে এক ঝাঁক জোনাকি বাসা বেঁধেছে। একটা কাঠি দিয়ে খোঁচালাম। কাঠিটা চোখের গর্ত দিয়ে দিব্যি নেমে গেল। কিছু মাটি ঝরে পড়ল। প্রথমে চিকচিক করতে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম–এ আবার কীরে বাবা! এখন নিশ্চিন্ত হলাম। জানলা বন্ধ করে, দরজায় শেকল তুলে দিয়ে ওপরে উঠে এলাম। মনে মনে বললাম, এখানে আরাম করে কিছুদিন ঘুমোও।
ওপরে উঠে এসেও মনটা কেমন খচখচ করতে লাগল। চোখের কোটরে যে কিছু চিকচিক করছিল সে কি সত্যিই আমার দেখার ভুল? নাকি ভয়ংকর কিছুর ইঙ্গিত?
পরের দিনই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (বুড়িমা যা যা আনিয়েছিল) কেনার জন্যে শহরে গেলাম। কিন্তু মাংস, মদ, গুড়, তিল, কুশ, মাষকলাই, পিদিম জ্বালাবার জন্যে খাঁটি সর্ষের তেল, এলাচ, লবঙ্গ, কর্পূর, জ্বাতি খয়ের, আদা, পান, যজ্ঞকাষ্ঠ, পঞ্চগব্য প্রভৃতি কিনে আনলাম। শবের (এখন শবের বদলে কঙ্কাল) ওপরে বসবার জন্যে হরিণের চামড়ার বদলে কম্বলের আসনের ব্যবস্থা হলো।
তারপরে একটা বিশেষ দিন দেখে শাস্ত্রমতে প্রচুর পরিমাণ মাংস ভাত খেলাম। রাত্রেও খাবার কোনো ত্রুটি রাখলাম না। তারপর রাতের অন্ধকারে কঙ্কালটি দু হাতের ওপর শুইয়ে নদীতে নিয়ে গিয়ে স্নান করিয়ে আনলাম। কঙ্কালটা আকারে ছোটো হলেও বেশ ভারী। বইতে কষ্ট হচ্ছিল। যাই হোক কোনোরকমে বাড়ি এনে কাঁচা শুকনো কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিলাম। তারপর কুশের অভাবে খড়ের বিছানায় বুড়িমার সেদিনের নির্দেশ মতো কঙ্কালটাকে পুব দিকে মাথা করে উপুড় করে শুইয়ে দিলাম (মনে পড়ল কঙ্কালটা আমার হাত থেকে পড়েছিল উপুড় হয়েই)। সর্বাঙ্গে চন্দন মাখিয়ে দিলাম। কেবলমাত্র হাড়ের ওপর কি চন্দন মাখানো যায়? গড়িয়ে পড়তে লাগল। তা আমি আর কি করব? সবটাই তো একটা পরীক্ষার ব্যাপার। এরপর ধূপ জ্বালালাম। তারপর কঙ্কালের ওপর কম্বলের আসন পেতে ঘোড়ায় চড়ার মতো বসলাম। অমনি হাড়গুলো নড়বড় করে উঠল। আমার তখনই কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। কেননা আমি জানি ফাঁকি দিচ্ছি। শবসাধনার নামে কবেকার একটা বামনের কঙ্কাল নিয়ে ছেলেখেলা করছি। শবসাধনার নামে আমি কঙ্কাল সাধনা করছি।
তবু আমি নানারকম প্রাথমিক ক্রিয়াগুলি সেরে ফেললাম। তারপর চোখ বুজিয়ে গম্ভীরস্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করলাম, ওঁ ফট। তারপর বললাম, ওঁ হুঁ মৃতকায় নমঃ। হে মৃত ব্যক্তি, তুমি যে-ই হও তোমাকে নমস্কার। তারপর তিনবার পুস্পাঞ্জলি দিলাম।
এইভাবে অনেক রাত পর্যন্ত ধ্যান করতে লাগলাম। অন্ধকার ঘরে শুধু পিদিমের আলো জ্বলছে। ধূপের ধোঁয়াগুলো অদ্ভুত আকৃতি নিয়ে চোখের সামনে নাচতে লাগল। আমার কেমন ভয় করতে লাগল। একটু পরেই মনে হলো কঙ্কালটা যেন নড়ছে। আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, ঘামে গা ভিজে গেল।
দরকার নেই বাবা। মনে মনে এই কথা বলে এক লাফে নেমে পড়লাম।
ওটাকে ঐভাবে ফেলে রেখেই বাইরে থেকে দরজায় শেকল তুলে ওপরে উঠে এলাম। দরজা বন্ধ করার সময় স্পষ্ট শুনলাম কঙ্কালটার হাড়গুলোয় খট খট করে শব্দ হচ্ছে।
.
ভয়ংকরের জাগরণ
