বেলা তখন দুপুর। খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম করছি হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। আমার এখানে বড়ো একটা কেউ আসে না। তাই কে এল ভাবতে ভাবতে নিচে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখি একজন বিপুলকায় সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে। তার মাথায় জটা, গোঁফদাড়ি। দুচোখের দৃষ্টি প্রখর। আমায় দেখে গোঁফের ফাঁকে একটু হাসল। গমগমে গলায় বলল, আমায় চিনতে পারছ?
চিনতে একটু সময় লেগেছিল। তারপরই চিনতে পেরেছিলাম।
তুমি জলেশ্বর না?
যাক চিনতে পেরেছ তা হলে?
আমি ওকে সাদরে ওপরে নিয়ে এসে বসালাম।
আমি যখন সাধু-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি তখন সেই দলে জলেশ্বরও ছিল। বাঙালি সাধু, তাই আমাদের ভাব হয়ে গেল। ও বেশ চালাক-চতুর আর করিৎকর্মা ছিল। তবে বড় বদমেজাজী। একদিন অন্য এক সাধুর সঙ্গে তর্কাতর্কির সময়ে জলেশ্বর তাকে এমন চড় মেরেছিল যে সাধুটি মরেই গেল। ওর এই হিংস্র প্রকৃতি দেখে আমি ভয় পেয়েছিলাম। অন্য সন্ন্যাসীরা তাকে দল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তার জন্যে ওর এতটুকু দুঃখ-কষ্ট হয়নি। আমার সম্বন্ধে ওর খুব কৌতূহল ছিল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার বাড়ির খবর নিত। আমারে যে বেশ কিছু টাকা-পয়সা আছে জেনে ও জিজ্ঞেস করত তবে কেন সংসার না করে সন্ন্যাসী হয়েছি। তারপর ও যখন শুনল সন্ন্যাসীদের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরার আমার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো শবসাধনা করে সিদ্ধিলাভ করা তখন ও-ও একই ইচ্ছের কথা বলেছিল। তবে এও বলেছিল, শবসাধনা এসব সন্ন্যাসীদের কম্ম নয়। যদি শিখতে চাও তো চলো অন্য কোথাও যাই।
তারপর ও তো দল থেকে সরে গেল। তার পরের কথা আর জানি না। জানলাম এতকাল পর। শবসাধনার চেষ্টা এখনও ও চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তেমন সুযোগ হচ্ছে না।
তারপর ও জিজ্ঞেস করল আমি কী করছি। বললাম, কিছু না।
ও বলল, কিছুই যদি না কর তাহলে নির্বান্ধব জায়গায় একা পড়ে আছ কেন?
এমনিই। বলে একটু হাসলাম।
জলেশ্বর আমার কথা বিশ্বাস করল না। বলল, নিশ্চয় কিছু করছ। তুমি আমার কাছে। লুকোচ্ছ।
একটু থেমে বলল, আমার কাছে লুকোচ্ছ কেন? আমরা দুজনেই তো একই পথের পথিক।
তখন বলব কি বলব না ভাবতে ভাবতে বুড়িমার কাছে আমার শবসাধনার কথা বলে ফেললাম। শুনে ও গুম হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তবু তো তুমি কিছু করেছ। আমি তো এগুতেই পারছি না। অথচ হাত গুটিয়ে বসে থাকা আমাদের চলে না। একটা কিছু করতেই হবে।
কি করব ভেবেই পারছি না। ও শবসাধনা আমার দ্বারা হবে না।
শোনো আমি একটা মতলব দিচ্ছি। চেষ্টা করে দ্যাখো।
জিজ্ঞেস করলাম, কী?
মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার।
অবাক হয়ে বললাম, তুমি পাগল হলে নাকি? মড়া বাঁচাতে পারলে তো ভগবান হয়ে যাব।
ও বলল, তুমি কি তা কিছুই করতে পারনি? তা হলে শব নড়ে উঠেছিল কি করে?
চমকে উঠলাম। তাই তো!
বললাম, তুমিও তো চেষ্টা করে দেখতে পারো।
জলেশ্বর গম্ভীরভাবে বলল, চেষ্টা করতাম। শুধু দুটো জিনিসের অভাব। এক–মৃতদেহ পাওয়া, দুই উপযুক্ত জায়গা। আমার থাকার আপাতত কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। সেদিক দিয়ে তোমার জায়গাটি বেশ। তুমি ফের চেষ্টা করো। আমিও জায়গা দেখছি। চললাম। একদিন এসে খোঁজ নিয়ে যাব।
.
মৃতদেহের সন্ধানে
জলেশ্বর তো চলে গেল। কিন্তু আমার মাথায় একটা অদ্ভুত ভাবনা ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। যদি সত্যিই আমি মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করতে পারি, তাহলে আমায় দ্যাখে কে? আমি তো প্রায় সর্বশক্তিমান ভগবান হয়ে উঠব। আর কেনই বা পারব না? বুড়িমার দৌলতে শবসাধনার হাতে খড়ি তো হয়েই আছে। মৃতদেহকে নড়াতে তো পেরেছিলাম।
তখনই মনস্থির করে ফেললাম এই এক্সপেরিমেন্টটা আমায় করতেই হবে। আর এই বাড়িরই একতলার ঘর এই কাজে যথেষ্ট উপযুক্ত হবে।
কিন্তু প্রধান সমস্যা মৃতদেহ পাব কোথায়? ও জিনিসটা তো দোকানে কিনতে পাওয়া যায় না।
ভাবতে ভাবতে ছোটোবেলায় পড়া রূপকথার একটা গল্প মনে পড়ে গেল। এক রাক্ষুসী মরা বাঘের হাড়গোড় যোগাড় করে তাকে বাঘের আকৃতি দিয়ে মন্ত্র পড়ে জ্যান্ত বাঘ করে তুলেছিল। হঠাৎ আজ মনে হলো হাড় জোড়া দিয়ে জ্যান্ত বাঘ করার মন্ত্রগুলো কি নিতান্তই লেখকের কল্পনা? এমনও তো হতে পারে তখনকার দিনের মায়াবিনীরা সত্যিই এমন মন্ত্র জানত যাতে হাড়ের ওপর দিব্যি রক্ত-মাংস লাগিয়ে তাতে প্রাণ দেওয়া যেত।
একথা মনে হতেই ভাবলাম হাড়গোড় যোগাড় করা যদি সম্ভব নাই হয় একটা কঙ্কাল যোগাড় করে দেখা যাক।
কিন্তু কঙ্কাল পাব কোথায়?
অনেকেরই জানা আছে হাসপাতালে যেসব বেওয়ারিশ মৃতদেহ পড়ে থাকে সেগুলোকে পুঁতে দেওয়া হয়। কিন্তু ইদানিং এইসব মৃতদেহ নিয়ে ব্যবসা শুরু হয়েছে। কিছু লোক হাসপাতালের জমাদার প্রভৃতিদের গোপনে টাকা দিয়ে এইসব মৃতদেহ নিয়ে যায়। তারপর আরও গোপনে অ্যাসিড দিয়ে গলিয়ে পচিয়ে গোটা কঙ্কালটা বের করে নেয়। তারপর হাসপাতালে যেখানে অ্যানাটমি শেখানো হয় সেখানে অনেক টাকায় বিক্রি করে দেয়। ডাক্তারি পড়তে গেলে গোটা কঙ্কালের দরকার হয়।
এইবার আমি ঐরকম কঙ্কাল-ব্যবসায়ীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। এর জন্যে আমাকে হাসপাতালে হাসপাতালে গিয়ে জমাদারদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করতে হয়েছে। তারপর ঐরকম একজন ব্যবসায়ীর গোপন ডেরার সন্ধান পেয়ে সেখানে গেলাম।
