কিছুক্ষণ কেমন যেন বিহ্বল হয়ে বসে রইলাম। তার পরেই গা-টা ছমছম করতে লাগল। এই ভয়ংকর নির্জন শুশানভূমিতে নিশীথ রাতে কখনো একা থাকিনি। সামনে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা ঝাকড়া তেঁতুল গাছ। তার একটা পাতাও নড়ছে না। মাঝে মাঝে বুনো ঝিকুড় ফুলের বিশ্রী গন্ধ। অন্ধকার আকাশে ঝিকমিক করছে তারা। যেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছে হাজার হাজার চোখ মেলে। হঠাৎ মাথার ওপর বটগাছের পাতাগুলো নড়ে উঠল। আমি শিউরে উঠলাম। যদিও জানি কোনো বড়ো পাখি পাখা ঝাঁপটাল, কিন্তু কত বড়ো পাখি সেটা যে এত জোরে পাতা নাড়াতে পারে? তখনই লক্ষ্য পড়ল নদীর ধারে সেই খুলিটার দিকে। মনে হলো খুলিটা যেন হঠাৎ খুব বড়ো হয়ে গেছে। ওটাকে তো রোজই দেখি। এত বড়ড়া তো ছিল না। গভীর রাতে কি খুলিও বড়ো হয়ে ওঠে? ওটা আবার গড়াতে গড়াতে আমার কাছে চলে আসবে না তো? আমি ভয়ে চোখ বুজিয়ে বসে রইলাম।
প্রায় রাত তিনটের সময়ে বুড়িমা ফিরে এল। কোথা থেকে, কোন পথে, কেমন করে এল জানি না। শুধু দেখলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি চাদরটা জড়িয়ে নিলাম।
বুড়িমা বললে, কিরে ভঁয় পাসনি তো?
বললাম, না। তোমার কাজ হলো?
বুড়িমা সংক্ষেপে বলল, হ্যাঁ।
কি এমন জরুরি কাজে তাকে যেতে হলো তা জিজ্ঞেস করতে সাহস হয়নি।
দুদিন পর তিন দিনের দিন অল্প রাতে বুড়িমা ঢুলছিল। হঠাৎ জেগে উঠে বলল, দ্যাখ তো নদীর ধারে বোধ হয় সঁব লেগেছে।
তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দেখলাম সত্যিই নদীর ধারে বড়ো পাকুড় গাছটার শেকড়ের মধ্যে একটা মড়া আটকে রয়েছে। ছুটে গিয়ে বুড়িকে জানাতেই বুড়ি বললে, ওটা তুলে নিয়ে আয়।
বোঝো কথা! জীবনে আমি অনেক মড়া পুড়িয়েছি কিন্তু তিনদিনের বাসি মড়া এই গভীর রাতে একা একা জল থেকে তুলে আনা যে কী কঠিন কাজ তা যে করে সেইই জানে। কিন্তু শব-সাধনা করতে গেলে এসব আমাকে করতেই হবে।
ছপাৎ ছপাৎ করে আমি জলে নেমে এগিয়ে গেলাম। হাঁটুজল। মড়াটার কাপড় পাকুড়গাছের শেকড়ে আটকে ছিল। কোনোরকমে ছাড়িয়ে মড়াটা দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুললাম। মুখের ওপর অন্ধকারে হাত পড়তেই নরম নরম কী ঠেকল। বুঝলাম জিব। ও বাবাঃ! মড়াটার জিব বেরিয়ে গেছে।
যাই হোক সেটা তুলে নিয়ে এলাম। বুড়িমা ইতিমধ্যে কুশ বিছিয়ে মড়াটার জন্যে শয্যা তৈরি করে রেখেছে। বলল, ওটাকে পুঁব দিকে মাথা করে শোওয়া।
সেইভাবে শুইয়ে বললাম, জিব বেরিয়ে গেছে কেন?
বুড়িমা খুব সহজভাবেই বলল, বোধ হয় কেঁউ গলা টিপে মেরেছে।
শুনে কেন জানি না বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। চোদ্দ-পনেরো বছরের ছেলেটাকে গলা টিপে কে মারল?
একটা গভীর সন্দেহ বুকের মধ্যে খচখচ করতে লাগল।
বুড়িমা যেন আমার মনের কথাটা বুঝে নিয়ে বলল, ভাবিস নে। ছোঁড়াটার সদ্গতি হয়ে গেল। নে, এঁবার ওঁর মুখে এলাচ, লবঙ্গ, কঞ্জুর, পান আর একটু মদ দে।
এ সবই এনে রাখা হয়েছিল। মৃতের মুখে একে একে সব দিলাম।
এবার শবটাকে উপুড় করে দে।
দুহাতে আঁকড়ে ধরে উপুড় করে দিলাম। এরপর সারা পিঠে চন্দন মাখানো, পায়ের তলায় আলতা দিয়ে ত্রিকোণ চক্র আঁকা, আরও কিছু কিছু আনুষ্ঠানিক কাজ করে গেলাম। তারপর বুড়িমার আদেশমতো শবের পিঠে কম্বল চাপিয়ে ঘোড়ার মতো চেপে বসলাম।
বুড়িমা শবের হাত-পা শক্ত করে বেঁধে দিয়ে বললে–এঁবার যা যা মন্ত্র বলেছি চোখ বুজে আঁওড়াবি। দেখিস ভয় পাঁসনি। ভয় পেলেই রবি। নে বল, ওঁ ফটু। বল, ওঁ হুঁ মৃতকায় নমঃ।
বুড়ির মুখ দিয়ে যে এমন সংস্কৃত কথা বার হবে ভাবতে পারিনি। অবাক হলাম। কিন্তু বুড়িমা তখন অধৈর্য হয়ে তাগাদা দিচ্ছে, কী হলো? বল্।
মন্ত্র পড়তে লাগলাম। মন্ত্র কি একটা-দুটো? মন্ত্রের যেন শেষ নেই। মন্ত্র জপতে জপতে চোয়াল ধরে গেল। গলা শুকিয়ে গেল। তবু জপেই চললাম।
রাত দুপ্রহর হলো। চারিদিকে চাপ চাপ অন্ধকার। নদীর জল কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে। দূরে কাষাড় ঝোপে শেয়াল ডেকে উঠল। হঠাৎ আমার মনে হলো এই নির্জন শ্মশানে আমি একা মৃতদেহের ওপর বসে আছি. বুড়িমা নেই।
জানি ভয় পেলে চলবে না। তাই মন শক্ত করে মন্ত্র আওড়েই চললাম। তার পরেই মনে হলো মড়াটা যেন থর থর করে কাঁপছে। শুনেছি এরপর শব আমাকে ফেলে দিয়ে উঠে বসবে। কিন্তু পড়ে গেলে চলবে না। সেই ভয়ংকর অবস্থা কল্পনা করে আমি সিদ্ধির প্রথম ধাপে পৌঁছেই শবের ওপর থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটে পালালাম শ্মশান থেকে। পিছনে শুনলাম বুড়িমা হাসছে খল-খল করে।
শবসাধনার এখানেই আমার ইতি। আর কখনো আমি ওমুখো হইনি।
এই হলো আমার জীবনের এক দিকের ইতিহাস। এখন আমি নিরিবিলিতে আমার ঠাকুর্দার পরিত্যক্ত দোতলা বাড়িতে একাই থাকি। জায়গাটা নির্জন। কিছু আদিবাসীদের ঘর। তারা চাষবাস করে। একটা ছোটোখাটো মুদির দোকান। ওরই একপাশে তরি-তরকারি বিক্রি হয়। এরাই হলো আমার প্রতিবেশী। আমি চিরদিন সাধু-সন্ন্যাসীর পিছনে ঘুরেছি। কাজেই লোকালয় আমার পছন্দ নয়। পৈতৃক টাকা-পয়সাও কিছু আছে। তাই নিয়ে একা একা বেশ আছি। তবে বড় অলস জীবন। কিছু করতে চাই। তার মানে চাকরি-বাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য নয়। অন্য কিছু। কিন্তু সেই অন্য কিছুটা কী ভেবে পাই না।
এমনি সময়ে একদিন
.
জলেশ্বরের আবির্ভাব
