যাই হোক বুড়িকে প্রণাম করার অনেকক্ষণ পর মনের ইচ্ছে জানালাম। বুড়ি থু করে আমার গায়ে থুথু দিয়ে খোনা গলায় বললে–দূর হ–দূর হ। নইলে মরবি।
বুড়ির মুখে প্রথমেই মরার কথা শুনে খুব উৎসাহ পেলাম। বুঝলাম এখানে সাঙ্ঘাতিক কিছু ঘটলেও ঘটতে পারে। কাজেই আমি ওখান থেকে নড়লাম না।
ওখানেই পড়ে থাকি। রোজই গাল খাই, মড়া-পোড়ানো কাঠ ছুঁড়ে নির্দয়ভাবে মারে, পিঠ ফেটে রক্ত পড়ে। তবু নড়ি না।
এমনি করে এক মাস, দু-মাস গেল। এর মধ্যে কতরকমের ভয় পেলাম। কতরকমের বুক-কাঁপানো শব্দ। এক-এক সময়ে তিনখানি মাত্র দাঁত নিয়ে বুড়ি হি হি করে ভয়ংকর হাসি হেসে ওঠে। আমি তখন তার দিকে তাকিয়ে মা-মা করে ডাকি। অমনি ভয় কেটে যায়।
ক্রমে বোধ হয় আমার ধৈর্য দেখে বুড়িমা নরম হলো। ভূত-প্রেতের কত কথা শোনাল। বলল–এই শ্মশান বহুকালের জানিস? লক্ষ চিতা জ্বলেছে। এই পবিত্র থানে ভূত, প্রেত, পিশাচ কী নেই? উঁত ছাড়াও আছে গোদান, আছে বেঁকি। মানুষ মরলে চোখে দেখা যায় না। তঁবু তারা থাকে।
বুড়িমা ফোকলা দাঁতে ফক ফক করে কথা বলে।–অঁনেক রকমের প্রাণী-ভূত আছে তাদের বুদ্ধি মানুষের চেয়ে কম কিন্তু শক্তি বেশি। এরা হলো ডাকিনী, শখিনী। আর এক ধরনের অপদেবতা আছে। তারাও সাংঘাতিক। এঁদের বলে হাঁকিনী। মন্ত্রবলে এঁদের বশ করতে পারলে এঁদের যা করতে বলবে তাই করবে। কিন্তু একটু অসাবধান হলেই এরা তোকেই মেরে ফেলবে।
আমি অবাক হয়ে এই প্রেত-সিদ্ধ বুড়িমার কথা শুনি। শ্রদ্ধা বিশ্বাস বাড়ে।
শেষে একদিন ভয়ে ভয়ে শব-সাধনা শিখিয়ে দেবার জন্যে বললাম। এই উদ্দেশেই তো আমার আসা। আমার কথা শুনে বুড়িমা তো চটে আগুন। অনেক কষ্ট করে শেষ পর্যন্ত বুড়িকে রাজী করালাম। বললে, এঁত কঁরে ধরছিস, ঠিক আঁছে দেবো। তঁবে ফেঁতি হলে বাঁচাতে পারব না।
আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললাম, সাধনা করতে গিয়ে যদি প্রাণ যায় যাক।
বুড়িমা একটু মুচকে হাসল। বললে, তবে যা বাজার থেকে জিনিসগুলো কিনে নিয়ে আয়।
দু-তিনদিন ধরে বুড়িমার ফর্দমতো জিনিসগুলো শহরে গিয়ে কিনে আনলাম। কিন্তু আসল জিনিস কই? শব? শব তো আর বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না।
আজ বেশ কদিন ঘাটে একটা মড়াও আসেনি। মড়া এলেই কি পাওয়া যাবে? যারা মড়া নিয়ে আসে তারা তো মড়া পুড়িয়ে চলে যাবে। এক যদি প্রবল বৃষ্টি হয়, চিতা জ্বালতে না পেরে মড়া ভাসিয়ে দেয় তাহলে হয়তো সেই শব পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সে সম্ভাবনাই বা কোথায়?
বুড়িমা মুচকে মুচকে হাসতে লাগল। আমার কান্না পেল। বললাম, তা হলে কি হবে বুড়িমা?
আমার করুণ অবস্থা দেখে বুড়ির যেন দয়া হলো। বলল, তা হলে এক কাজ কর। আমায় গলা টিপে মেরে ফ্যাল। তারপর আমার শবের ওপর বসে–
প্রথমে ভেবেছিলাম বুড়ি বুঝি মস্করা করছে। কিন্তু যখন সে কঁদো কাঁদো হয়ে তার বড়ো বড়ো বাঁকানো রক্তশূন্য নখসুদ্ধ হাত দিয়ে আমার হাত ধরে (উঃ কী ঠাণ্ডা!) বললে, আঁমি বলছি তুই আঁমায় মার। আমার শরীলটা তা হলে বসিদ্ধ হবে। ওরে, আঁমি একটা সঁকাজ করে মুক্তি পাব।
তখন আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। বললাম, না-না, খুন করে আমি ফাঁসি যেতে পারব না।
বুড়িমা বললে, দূর পাগল! পুলিশ টের পাবে কি করে? এখানে জঁনমনিষ্যি নেই। নে, শেষ করে দে আঁমাকে। বলে সরু খসখসে চামড়ার গলাটা বাড়িয়ে দিল।
আমি খুন করতে পারব না, বলে ছুটে পালাবার চেষ্টা করতেই বুড়িমা খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরল। সে যে কী শক্ত হাত তা বোঝাতে পারব না। ঐ থুরথুরে বুড়ি এত শক্তি কোথায় পেল?
বুড়িমা বলল, যেতে হবে না। আমাকে মারতেও হবে না। আঁজ থেকে তিন দিন পর অমাবস্যার রাতে একটা গঁড়া এসে ভিড়বে ঘাঁটে। তাকে নিয়েই কুঁই বসবি।
মড়া আসবেই তুমি জানলে কি করে?
আঁমি জানতে পারি।
কোথা থেকে আসবে?
এখান ঘেঁকে চার পো (এক মাইল) পথ দূরে গদাধরপুরের চামারদের একটা চোদ্দ পনেরো বছরের ছেলে মরবে। আঁমি তাকে দেখেছি। ভারি সুলক্ষণ আছে।
কিন্তু সে মরবেই জানলে কি করে?
বললাম তো আমি জানতে পারি। সে ক্ষমতা আমার না থাকলে তুই এসেছিস কাঁনো আঁমার কাছে?
শুনে কিরকম যেন ভয় পেয়ে গেলাম।
বুড়িমা মনের অবস্থাটা ঠিক টের পেল। বলল, এই দ্যাখ এখুনি তুই ভঁয়ে ভিরমি খাচ্ছিস। তোর দ্বারা কিছু হবে না।
তবু যে সেই ভীতু আমিটা কী করে সব কাজ প্রায় নিখুঁতভাবে করতে পেরেছিলাম তা ভেবে আজ অবাক হই।
সেদিনই গভীর রাতে বুড়িমা বললে, আঁমি একটু ঘুরে আসি। তুই একা থাকতে পারবি তো?
ভয় চেপে রেখে বললাম, পারব। তুমি যাচ্ছ কোথায়?
রেগেমেগে বুড়িমা বললে, আঁত খোঁজে তোর দরকার কী?
বেশ। কখন ফিরবে বলবে তো?
রাঁত থাকতে থাকতেই ফিরব। তোর তো দেখছি শীত করছে। দাঁড়া। বলে চটের বস্তা থেকে একটা ছেঁড়া ময়লা দাগধরা বিছানার চাদর এনে দিয়ে বললে, এটা গায়ে দে। আঁরাম পাবি।
ম্যা গো! এ চাদর পেলে কোথায়?
পাঁব আবার কোথায়? ঘাঁটে মড়া আসে। তাদের গা থেকে খুঁলে নিই।
ঘেন্নায় কুঁকড়ে গেলাম। কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করতে সাহস পেলাম না।
দেখলাম বুড়িমা নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বড্ড তাড়াতাড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল।
বুড়িমা চলে যেতেই গা থেকে চাদরটা বাঁ হাতের দুটো আঙুলে ধরে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।
