আর লেখা হলো না। ও আসছে।…
অর্ধেক লেখা চিঠিটা পড়েই আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। মনে পড়ল মিসেস অ্যান্টনির কথা।–নির্জন দুপুরে অত বড় মানুষটা ইঁদুরের ল্যাজে দড়ি বেঁধে ঘোরাত। তবে কি
মা বললে, তখনই বলেছিলাম পোস্টমর্টেম করাও। কিন্তু তোমরা কেউ শুনলে না। আমি মা বলেই তার সব কথা বুঝতে পেরেছিলাম। আমার একটা মেয়ে গেছে, আর একটাকে কিছুতেই যেতে দেব না।
সেদিনই বাবা সম্মতি জানিয়ে অসীমদাকে চিঠি লিখে রেখেছিলেন। শুধু পোস্ট করার অপেক্ষা। মায়ের ওপর রাগ করে বাবা চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন।
.
দিল্লি ফিরে এসেছি।
মাস কয়েক পর কাগজে একটা খবর পড়ে চমকে উঠলাম। কলকাতায় কোন এক অসীম চৌধুরীকে পুলিশ খুনের অপরাধে গ্রেপ্তার করেছে। সে
নাকি তার নব বিবাহিতা স্ত্রীকে গলায় কালো কারের ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করেছে। হত্যার কারণ জানা যায়নি। ছবিটাও দেখলাম। এ আমারই অতি প্রিয় জামাইবাবু।
আজ এক এক সময় ভাবি, মিন্টুর সঙ্গে যাতে বিয়ে না হয় সেই কথাই কি দিদি সেদিন রাত্তিরে ইঙ্গিতে জানিয়ে গেল? সেই কথা তাড়াতাড়ি জানাবার জন্যেই কি অদৃশ্য এক শক্তি সুদূর দিল্লি থেকে আমায় মধুপুরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল?
বামনের কঙ্কাল
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ
সেদিন অনেক রাতে অস্পষ্ট একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম।
কৃষ্ণপক্ষ। খোলা জানলা দিয়ে দেখলাম চাঁদের ম্লান আলো লুটিয়ে পড়েছে বরাকর নদীর জলে। ওদিকে গভীর শালবন থমথম করছে।
আমি বিছানায় বসে কান পেতে রইলাম।
না, কোনো শব্দ নেই।
তবে কি আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভুল শুনেছিলাম?
তার পরেই চমকে উঠলাম। আবার সেই শব্দ–খট খট খট….কেউ যেন কাঠের পা নিয়ে কাঠের সিঁড়ির উপর দিয়ে মাতালের মতো টেনে টেনে ওঠবার চেষ্টা করছে।
হঠাৎই শব্দটা থেমে গেল। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইলাম। কিন্তু শব্দটা আর শোনা গেল না।
আশ্চর্য! কে আসছিল সিঁড়ি দিয়ে উঠে? কেনই বা দোতলা পর্যন্ত উঠল না? চোর ডাকাত? চোর-ডাকাত যদি হয় তাহলে কি তাদের পায়ের শব্দ ঐরকম হয়?
কিছুই বুঝতে পারলাম না।
তা হলে?
হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনা বুকের মধ্যে তোলপাড় করতে লাগল। তবে কি
একবার ভাবলাম দরজা খুলে সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে দেখি। কিন্তু সাহস হলো না। মশারির মধ্যে চুপ করে বসে রইলাম।
.
ভয়ংকরী বুড়িমা
বরাকর জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ আর বিহারের বর্ডারে। বরাকরের এদিকে কুলটি আর ওপারে কুমারডুবি।
বহুকাল আগে আমার পিতামহ বরাকর নদীর নির্জন প্রান্তে শালবনের কাছে একটা দোতলা বাড়ি করেছিলেন। শুনেছি প্রতি বছর তিনি সপরিবারে এখানে হাওয়া বদলাতে আসতেন। কিন্তু এখন লোকে চেঞ্জে বা হাওয়া বদলাতে কেউ বড়ো একটা বিহার বা ছোটোনাগপুরে যায় না। যায় দূর দূর দেশে। সেইজন্যে নির্জন নদীর ধারে পূর্বপুরুষের এই বাড়ির প্রতি কারও আর আকর্ষণ নেই। নিরিবিলি জায়গাটা ভয়ের জায়গা হয়ে উঠেছে। চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাপি কি না হতে পারে।
এ বাড়িতে আমিই এখন একা থাকি। আমার পক্ষে এরকম নির্জন নির্বান্ধব জায়গাই ভালো। কেন এইরকম জায়গায় পড়ে আছি সে কথা বলার আগে নিজের বিষয়ে কিছু বলে নিই।
অমি ঠিক সাধারণ মানুষের মতো নই। ঘর-সংসার করিনি। ছোটবেলা থেকে সাধু সন্ন্যাসীদের ওপর তীব্র আকর্ষণ। তখন থেকেই সাধু-সন্ন্যাসীদের ওপর লেখা নানা রকমের বই পড়তাম। যতই পড়তাম ততই তাদের ওপর আগ্রহ বেড়ে যেত। তারপর আমিও একদিন বাড়ি ছেড়ে সন্ন্যাসীদের দলে ভিড়ে পড়লাম। কত যে সন্ন্যাসীর সঙ্গে মিশেছি তার হিসেব নেই। কিন্তু তারা কেউ আমায় পাত্তা দেননি। বলেছেন–তুই ছেলেমানুষ। তোর এখনও সময় হয়নি। বাড়ি ফিরে যা।
বাড়ি ফিরে আসিনি। আবার অন্য সন্ন্যাসী ধরেছি।
একবার এক তান্ত্রিকের সঙ্গ পেয়েছিলাম। তিনি আবার শবসাধনা করতেন। নির্জন ভয়ংকর শ্মশানঘাটে গভীর রাতে একটা মড়ার ওপর বসে সারারাত মন্ত্র পড়ে যেতেন। এই সাধনা খুবই কঠিন। নানারকম ভয়াবহ ঘটনা ঘটত। তাতে ভয় পেলেই মৃত্যু। আর ভয় না পেলে সিদ্ধি। তুমি মহাশক্তির অধিকারী হয়ে উঠবে। আমার সাধ হলো আমিও শবসাধনা শিখব। তান্ত্রিক গুরুকে একথা বলতেই তিনি লাল লাল চোখে কটমট করে তাকিয়ে আমার গালে এক চড় মেরে বললেন–ছেলেখেলা! বেরো এখান থেকে।
সে কী চড়! এক চড়ে মাথা ঘুরে গিয়েছিল।
ওখান থেকে চলে এসে আবার ঘুরতে ঘুরতে একটা গ্রামের বাইরে নির্জন শ্মশানে এক বুড়ির সন্ধান পেলাম। লোকে তাকে বুড়িমা বলে ডাকত। কিন্তু কেউ তার কাছে ঘেঁষত না। বলত ও নাকি ভয়ংকরী বুড়িমা!
শ্মশানটা একটা মজা নদীর পাশে। টোপা পানা আর কলমীর দাম ডাঙার কাছে। এদিকে ওদিকে মরা কুকুর, বেড়াল, ছাগল পড়ে আছে। দুর্গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত। এছাড়া পড়ে রয়েছে শ্মশানযাত্রীদের ফেলে যাওয়া ভাঙা কলসি। একটা বিকট মড়ার খুলিও দেখলাম জলের ধারে পাকুড় গাছটার গোড়ায়। গা শিউরে উঠল।
এখানেই একটা বটগাছের নিচে বুড়িমার দেখা পেলাম। ছেঁড়া ময়লা একটা কথা জড়িয়ে পড়ে আছে। মাথায় কঁকড়া চুল জট পাকিয়ে গেছে। সর্বাঙ্গে মড়া-পোড়ানো ছাই মাখা। কথা জড়ানো থুখুরি বুড়িকে দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল যেন একটা ময়লা কাপড়ের পুঁটলি।
