দেখেই বুঝলাম চারু ঘোরের মধ্যে রয়েছে। রুগির এই সঙ্গিন অবস্থাতেও কি বর্ধমান থেকে বড়ো ডাক্তার আনানো যেত না? টাকার তো অভাব নেই। আমি একটু দূরে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম।
অনেকক্ষণ ধরে নাড়ি দেখে কবিরাজমশাই ধীরে ধীরে চারুর হাতটা ওর বুকের ওপর রেখে দিয়ে চাদরটা দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিলেন।
কেমন দেখলেন কবিরাজ মশাই? সরকারবাবু জিগ্যেস করলেন।
কবিরাজমশাই বললেন, নতুন ওষুধ দিয়ে লাভ নেই। মকরধ্বজটা যেমন চলছে চলুক। আর হ্যাঁ, আজ আবার ভরা অমাবস্যা। রাতটা সজাগ থাকবেন।
সরকার মশাই বললেন, তেমন বুঝলে কি আপনাকে খবর দেব?
যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও কবিরাজমশাই বললেন, দিতে পারেন। আমার বয়স হয়েছে তো। রাতটাও খারাপ
কবিরাজমশাই লাঠি ঠক্ করতে করতে গোমড়া মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পিছু পিছু গেলেন সরকার মশাই। সেই মুহূর্তে রুগির সামনে আমি একা। ঘর অন্ধকার হয়ে এসেছে। একটা লণ্ঠনও কেউ জ্বেলে দিয়ে যায়নি। পাশের জানলাটা খোলা ছিল। সেখান দিয়ে যতটা আলো আসছিল তার চেয়ে বেশি ঢুকছিল মশা।
একবার তাকালাম চারুর মুখের দিকে। একেই তো তার মুখটা ভয়ংকর, তার ওপর রোগযন্ত্রণা। মুখটা সাদা। মন হল কেউ যেন শরীরের সব রক্তটুকু শুষে নিয়েছে।
একা বসে থেকে কী করব? কেউ বসতেও বলেনি। তা হলে চলেই যাই। তখনই ভাবলাম যার জন্যে আসা তাকে দেখলাম। কিন্তু সে তো জানতেও পারল না। হয়তো ও জানতে পারল না এটাই ভালো হবে আমার পক্ষে। কিন্তু মুমূর্ষ রুগিকে একা ফেলেই বা যাই কী করে?
ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। ঠিক তখনই কেমন যেন অস্বাভাবিক গলায় চারু ডাকল, বলু!
চমকে ফিরে দেখি একটা মৃতদেহ যেন দুখানা হাড্ডিসার হাত ছড়িয়ে দিয়ে বিছানার ওপর উঠে বসেছে।
চারু হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। কাছে যেতেই সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিয়ে আমায় বসতে বলল।
আমি কেমন ভয় পেলাম। তবু বসলাম। ও শুয়ে পড়ল। তারপর অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে। কী ভয়ংকর দৃষ্টি!
কী দেখছিস অমন করে?
আমার কথা না শুনলে শাস্তি পেতেই হবে। সে শাস্তি যে কী সাংঘাতিক তুই জানিস না।
আমি চুপ করে রইলাম। এ তো পাগলের প্রলাপ। শোনার যোগ্য না হলে ওর কথা শুনতে যাবই বা কেন?
হঠাৎ ওর ভয়ংকর মুখটা অদ্ভুত ভাবে বেঁকিয়ে বলল, সেই কবে খবর দিলাম নিজে গিয়ে। আর এত দেরিতে এলি কেন?
সে রাত্রিতে তুই কেন গিয়েছিলি?
কেন? চালাকি হচ্ছে? আমাকে চিনতে পারিসনি?
পেরেছিলাম কিন্তু অত রাত্রে—
একদম চুপ!
এমনি সময়ে একজন ঘরে আলো রেখে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ঘরে আলো আসতেই দেওয়ালে চাদর মুড়ি দিয়ে শোওয়া অবস্থায় চারুর একটা লম্বা ছায়া পড়ল। এত লম্বা ছায়া? এ কি মানুষের ছায়া!
শ্রাবণের মেঘে ঢাকা আকাশে অন্ধকার দানা বেঁধে আছে, সেই অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে চারিপাশের জঙ্গলের পাতায় পাতায়। মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে বিদ্যুতের আলো অন্ধকারকে এফেঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। হঠাৎ চারু গোঁ গোঁ করে উঠল! চমকে ওর দিকে তাকাতেই দেখি ও জানলার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে।
চারু! কী হয়েছে?
ও হঠাৎ আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল! উঃ কী ঠান্ডা হাতটা! একি মানুষের হাত!
চারু, ভয় করছে?
বলু, তুই বাড়ি যা।
না, এ অবস্থায় তোকে ফেলে আমি যাব না।
চারু কর্কশ স্বরে বলল, তুই কি কেবলই অবাধ্য হবি? যা বলছি।
কেন?
কথা বাড়াস নে। ঐ দ্যাখ জানলার বাইরে। ওরা এসে পড়েছে। তোকে দেখে খুব রাগ করছে। তুই আছিস বলে আমাকে নিতে পারছে না।
ভয় নেই, আমি তোর সঙ্গেই থাকব। বলে ওকে ভরসা দিলাম।
কিন্তু ও কী বুঝল জানি না। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, এখন নয়। আগে আমি যাই। তার কুড়ি বছর পর–তুই চলে আসবি। তুই এখন যা। যা বলছি
কুড়ি বছর পর কেন?
অত প্রশ্ন করিস না। আমি জানি না। সব কিছুরই একটা সময় আছে। তুই যা—
কিন্তু জানলার বাইরে কাকে দেখে ও এরকম করছে?
উঠে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। অন্ধকারে তেমন কিছুই দেখা গেল না। মনে শুধু দু-তিনটে ছায়ামূর্তি বাড়ির কাছে ঘুরছে।
বুঝলাম চোখের ভুল। আর ও স্বপ্নের ঘোরে প্রলাপ বকছে।
বলু–বলু, তুই যা। ওই ওরা আমাকে
বললাম, তুই যখন চাচ্ছিস আমি আর না থাকি তাহলে বৃষ্টি থামলেই চলে যাব।
যা খুশি কর। বলেই সে বিছানায় নেতিয়ে পড়ল। আর তখনই একটা হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় জানলার পাটাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
বুঝলাম চারু আর নেই। চারুর কথা যদি সত্যি হয় তা হলে যারা তাকে নিতে এসেছিল তারা কাজ শেষ করে এই মুহূর্তে চলে গেল।
সারা রাত্রি বাড়ির জন দুই মাত্র লোকের সঙ্গে চারুর মৃতদেহ আগলে বসে রইলাম। অনেক বেলায় অল্প কিছু লোক জমল। মাপে মাপে কফিন তৈরি করা হল। তারপর নিঃশব্দে মৌন মিছিল করে কবরখানায়।
আমি বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠছিলাম। আর পারছিলাম না। কিন্তু তখনও একটি কাজ বাকি ছিল। একে একে সকলে কবরে মাটি দেবার পর আমিও কফিনের ওপর মাটি দিয়ে চলে এলাম।……..
.
তারপর? জিগ্যেস করলেন জগদীশ অ্যান্টনি।
বললাম, পরের দিন হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান। জ্ঞান ফিরলেও ঘোরের মধ্যে ছিলাম বেশ কদিন। তারপর ঘোর কাটলেও অনেক কিছু মনে করতে পারতাম না। কেন হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম ডাক্তার তা বলতে পারেননি। তারপর এই কিছুদিন ধরে চলছে নানা উৎপাত।
