মৃতের রাজ্য কথাটা মনে হতেই গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল। এই নদিনের মধ্যে কোনোদিনই আমার এমন ভয় করেনি। হঠাৎ আজই বা কেন এইরকম একটা বিশ্রী অস্বস্তি হচ্ছে বুঝতে পারলাম না।
আমি একটা বই পড়ছিলাম। বইটা বন্ধ করে অড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব বলে উঠে দাঁড়ালাম। আলো নেভাবার আগে দরজাটায় ঠিকমতো খিল দিয়েছি কিনা দেখে নিলাম। জানলাগুলোও দেখে নিলাম ভেতর থেকে বন্ধ।
আলো নেভাতে যাচ্ছি হঠাৎ মনে হলো এই মুহূর্তে ঘরে আমি একা নই। এতক্ষণ ঘরের মধ্যে যে বদ্ধ বাতাসটা ছিল, হঠাৎ তার তাপমাত্রাটাও কেমন কমে গেল অস্বাভাবিক মতো। আমি শীতে কুঁকড়ে গেলাম। আর তখনই দেখলাম কেউ একজন প্রায় নিঃশব্দে আমার বিছানার দিকে এগিয়ে আসছে।
আমার সর্বাঙ্গ ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
তারপরই যা দেখলাম তাতে একই সঙ্গে ভয়, বিস্ময়, আনন্দ আমাকে একেবারে অভিভূত করে দিল।
দেখলাম–আমার দিদি, যে কয়েক বছর আগে এই বাড়িতেই হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিল, সে আমার বিছানার এক কোণে তার সেই চিরঅভ্যস্ত ভঙ্গিতে বসে রয়েছে।
দিদির সেই সুন্দর মুখখানি এক স্বর্গীয় আভায় আরও সুন্দর লাগছিল। তাকে বাড়িতে যে প্রিয় শাড়িখানি পরে প্রায় ঘোরাফেরা করতে দেখতাম সেই শাড়িখানাই পরা, তার এলো খোঁপা ঠিক আগের মতোই কাঁধের ওপর যেন ভেঙে পড়েছে।
কয়েক মুহূর্ত আমি দিদির দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি ভুল দেখছি কিনা মেলাবার জন্যে খুবই সচেতনভাবে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লক্ষ্য করতে লাগলাম।
না, ভুল নয়। ভুল হতে পারে না। তার যে হাতখানি কোলের উপর রাখা তা কঙ্কাল নয়, জীবন্ত মানুষেরই হাত। তার চুড়ি, বিয়ের আংটি, কানের দুল সবই ঠিক ঠিক। শুধু গলায় কালো কারের সঙ্গে পাথরের যে সকেটটা সবসময়ে পরে থাকত সেই লকেটটা নেই। আছে শুধু কালো কারটা। পরিবর্তনের মধ্যে দিদি যেন একটু মোটা হয়েছে। কেননা ওর মেরুন রঙের ব্লাউজটা গায়ে টাইট হয়ে এঁটে আছে–যেমন কালো কারটা বৈষ্ণবীদের কণ্ঠীর মতো গলার সঙ্গে লাগা।
এবার স্পষ্ট করে দিদির দিকে তাকালাম। দিদি একটু হাসল। কিন্তু বড় ম্লান সে হাসি। তারপরই স্পষ্ট দেখলাম দিদি ধীরে ধীরে হাতটা তুলে কারটা একবার চুলো, যেন খোলবার চেষ্টা করল।
–দিদি! বলে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। কিন্তু দিদি উত্তর দিল না।
আমি পাগলের মতো দিদিকে ছোঁবার জন্যে ছুটে গেলাম আর তখনই আলোটা নিভে গেল। বোধহয় লোডশেডিং হলো। আমি অন্ধের মতো এগোতে গিয়ে অন্ধকারে দেওয়ালে দেওয়ালে ঠোক্কর খেতে লাগলাম। কোনোরকমে বিছানায় গিয়ে টর্চটা নিয়ে জ্বালোম। কিন্তু দিদি তখন অদৃশ্য।
.
দিল্লি যাওয়া হয়নি। পরের দিনই সোজা চলে গেলাম দেশের বাড়িতে। এত বড়ো খবরটা মা, বাবা, মিন্টুকে না দিলেই নয়। দিদির অকাল, অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পর থেকে ওদের মানসিক অবস্থা যাকে বলে অবর্ণনীয়, তাই।
যে উত্তেজনা নিয়ে খবরটা দিতে গিয়েছিলাম, বাড়ি ঢুকেই আর একটা খবরে উৎসাটা যেন মিইয়ে গেল।
প্রথমেই দেখা বাবার সঙ্গে। বাবা হেসে বললেন, এই যে তুমি এসে পড়েছ! আজই তোমায় সুখবরটা লিখতে যাচ্ছিলাম।
যাক–তবু সুখবর।
বাবা বললেন, শেষ পর্যন্ত অসীমের সঙ্গেই মিন্টুর বিয়ে ঠিক করলাম। রীণা চলে যাবার পর থেকে এ কবছর ও তো পাগলের মতো কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত মিন্টুকেই চাইল। বলল, আমাদের সঙ্গে সম্পর্কটা বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
সুখবর বৈকি! অসীমদার মতো ছেলে দেখা যায় না। দিদির নিতান্ত দুর্ভাগ্য–এমন স্বামী পেয়েও এক বছরের বেশি ঘর করতে পারল না। চলে গেল হঠাৎই। সেই অসীমের সঙ্গে যদি মিটার।
তবে তোমার মায়ের তেমন ইচ্ছে ছিল না। ওর যে কী অদ্ভুত ধারণা! তা যাক। এখন উনি রাজী হয়েছেন।
একটু পরে চা-জলখাবার খেয়ে সকলের সামনেই মধুপুরের ঘটনাটা হুবহু বলে গেলাম। বাবা ওঁর চিরাচরিত অবিশ্বাসী মন নিয়ে ঠাট্টার হাসি হেসে ইজিচেয়ারে গিয়ে শুলেন। কিন্তু মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল। আর দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল।
তারপর যখন গলায় লকেট ছাড়া কারটার কথা বললাম তখন মা হঠাৎ চমকে উঠল।
লকেটটা ছিল না?
—না।
-কেন? শাড়ি থেকে আংটি পর্যন্ত সব রইল আর লকেটটা নেই। শুধু কারটা?
–হ্যাঁ। আর সেটাও আবার বোধহয় মোটা হবার জন্যে, গলায় আঁট হয়ে বসেছিল। দিদি একবার হাত তুলে সেটা খোলবার চেষ্টাও করল যেন–তখনই। লোডশেডিং হয়ে গেল।
–ওগো শুনছ! বলেই মা হঠাৎ কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল।
মায়ের অবস্থা দেখে বাবা চমকে উঠলেন।
~~-আমি যা ভয় করেছিলাম তাই। তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করনি, কিন্তু আজ এতদিন পর নিজে দেখা দিয়ে যা ঘটেছিল তা জানিয়ে গেল।
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।
মা যেন উদভ্রান্তের মতো ড্রয়ার হাতড়াচ্ছে। অনেক খুঁজে একটা ইনল্যান্ড খাম পেল। সেটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিল।
-তোমার বাবাকে দেখিয়েছিলাম। হেসেছিল। এখন তুমি পড়ে দ্যাখো।
চিঠিটা মধুপুর থেকে লেখা। বিশেষ কিছু নয়। শুধু কয়েক ছত্র।
–মাগো, খুব ভয় পেয়ে এই চিঠি গোপনে তোমায় লিখছি। এখানে এসে দেখছি মাঝে মাঝে ও যেন কিরকম হয়ে যায়–বিশেষ গভীর রাতে। আমায় কিরকম ভয় দেখায়। আমি প্রথম প্রথম ভাবতাম মজা করছে। কিন্তু কাল রাত্তিরে যা করল–কোথা থেকে একটা বেড়াল ধরে এনে তার গলায় ফাঁস
