টাঙ্গা থেকে যখন বাড়িটার সামনে নামলাম তখন শীতের বেলা মিইয়ে এসেছে। মাঘের শীত বেশ জেঁকে বসছে। মিসেস অ্যান্টনি হাসতে হাসতে ওঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। আমাদের সকলের কুশল সংবাদ নিয়ে চাবিটা দিয়ে বলে গেলেন–জলটল সব রেডি আছে। হাতমুখ ধুয়ে নাও। চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
গেট ঠেলে কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকলাম। এই সেই বাড়ি। তাহলে আবার এখানে আসতে হলো।
তখন সূর্য ডুবছে। বাড়ির সামনে দীর্ঘ ইউক্যালিপ্টাস গাছের মাথায় পড়ন্ত সূর্যের ম্লান আলো। এমনি পড়ন্ত রোেদ এর আগেও এই বাড়িরই কার্নিসে কার্নিসে, টানা বারান্দার পশ্চিমদিকের মেঝের ওপর কতবার দেখেছি। কিন্তু এমন মনকেমন-করা ভাব কখনো হয়নি।
তালা খুলে ঘরের মধ্যে ঢুকলাম। এটাই এবার আমার বেডরুম। কিছু কিছু প্লাস্টারের কাজ হয়েছে, হোয়াইট ওয়াশও হয়েছে। জানলায়, দরজায় নতুন ছিটকিনি লাগানো হয়েছে। একটা চৌকিরও ব্যবস্থা হয়েছে দেখে খুশি হলাম। বিছানাপত্তরও নিশ্চয় মিসেস অ্যান্টনিই দিয়েছেন। ঘরের কোণে জলভর্তি কুঁজোটি পর্যন্ত।
একটু পরে মিসেস অ্যান্টনির বাড়ি থেকে ডিমের ওমলেট, দু-স্লাইস পাঁউরুটি আর চা এল। খুবই খিদে পেয়েছিল। তাড়াতাড়ি প্লেটটা টেনে নিলাম।
দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থাও মিসেস অ্যান্টনির বাড়ি। কাজেই শুধু উদ্দেশ্যহীন বেড়ানো আর মিসেস অ্যান্টনির বাড়ি আড্ডা দেওয়া ছাড়া আমার আর অন্য কাজ ছিল না।
দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে গেল। কোনো অসুবিধে নেই। অত বড়ো বাড়িতে একা থাকি, তাতেও ভয় পাই না। কিন্তু একটা কথাই বারে বারে মনে হচ্ছিল–কেন হঠাৎ এলাম? এমন কি আমার আসার খবর পর্যন্ত দেশের বাড়িতে জানাইনি। জানাইনি তার প্রধান কারণ–কেন এলাম তা তো পরিষ্কার করে কাউকে বোঝাতে পারব না।
সাত দিন কেটে গেল। আর মাত্র তিন দিন থাকব। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছিল আমার এই আসাটা একেবারে নিরর্থক নয়, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটবে। কিন্তু কী ঘটতে পারে সে সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।
মিসেস অ্যান্টনির বয়স হয়েছে। ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর বেশ বড়ো সংসার। ওঁদের বাড়ি গেলেই মিসেস অ্যান্টনি পুরনো দিনের কথা তোলেন। জিজ্ঞেস করেন–মা কেমন আছেন, বাবার বয়েস কত হলো, হাঁটাচলা করতে পারেন কিনা। তারপরেই স্মৃতি হাতড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন–তুমি বোধহয় এখানে লাস্ট এসেছিলে যখন তোমার দিদি-জামাইবাবু এখানে ছিলেন।
কথাটা এড়িয়ে যাবার জন্যে সংক্ষেপেই উত্তর দিই।
–তোমার জামাইবাবু মানুষটাও বেশ ভালোই ছিলেন। যেমন হ্যান্ডসাম চেহারা, তেমনি হৈচৈ করতে ভালোবাসতেন।
বললাম–অসীমা সত্যিই খুব চমৎকার মানুষ। আমি তো যে কদিন এখানে ছিলাম–
বাধা দিয়ে মিসেস অ্যান্টনি বললেন–তবে উনি বোধহয় একটু ক্রেজি টাইপের ছিলেন।
–ক্রেজি! অস্বাভাবিক প্রকৃতির? না-না
–আমি দুঃখিত। ক্রেজি বলাটা আমার ঠিক হয়নি। আসলে কিছু কিছু ছেলেমানুষি ছিল।
আমি হেসে বললাম যত বয়স্কই হোক না কেন, সবার মধ্যেই অল্পবিস্তর ছেলেমানুষি থাকে।
–তা বলে নির্জন দুপুরে কোনো বয়স্ক মানুষ একা একা ইঁদুরের ল্যাজে দড়ি বেঁধে ঘোরায় না। বলে মিসেস অ্যান্টনি তার সামনের পড়ে যাওয়া দাঁত দুটোর ফাঁক দিয়ে হাসলেন।
বললাম–সে হয়তো দিদিকে ভয় দেখাবার জন্যে। ইঁদুর, আরশোলা, মাকড়সায় দিদির খুব ভয় ছিল।
–তোমার দিদির হার্টের ট্রিটমেন্ট জামাইবাবু করিয়েছিলেন?
মিসেস অ্যান্টনির এই ধরনের জেরা আমার ভালো লাগছিল না। তবু একটু উঁচু গলাতেই বললাম–দিদির যে হার্টের অসুখ ছিল তা আমরাই কখনও জানতাম না।
–তা বটে। বলে মিসেস অ্যান্টনি একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।
–এই দ্যাখো না আমার অবস্থা। একদিন মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। তবে না জানা গেল আমি হাই প্রেসারের রুগী হয়ে আছি। সে থাক, তোমার সেই সুন্দরী বোনটির খবর কি? কি যেন নাম?
–আমার পিসতুতো বোনের কথা বলছেন? মিন্টু?
—হ্যাঁ হ্যাঁ। ওর বিয়ে-থাওয়া হয়েছে?
বললাম–না, চেষ্টা চলছে।
পিসেমশাই, পিসিমা মারা যাবার পর সেই কোন ছোটবেলায় মা-ই ওকে নিজের কাছে এনে রাখে। সেই থেকে ও আমাদের সংসারেই রয়েছে। দিদির চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোটো হলেও দিদি ওকে খুব ভালোবাসত। যখনই কোথাও যেত মিন্টুকে সঙ্গে নিয়ে যেত। দুই বোন ম্যাচ করে একই রকম শাড়ি-ব্লাউজ পরত। শুতোও দুজনে একসঙ্গে। এক কথায় ওরা শুধু দুবোনই নয়, যেন দুই বন্ধু। দিদির বিয়ে দিতে গিয়ে বাবা প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। এখন দুর্ভাবনা মিন্টুকে নিয়ে।
.
নটা দিন কেটে গেল। কাল চলে যাব।
মিসেস অ্যান্টনি বললেন, পুরো একমাসের ভাড়া গুনলে, আর কটা দিন থেকে যাও। এই সময়টাই তো চেঞ্জের পক্ষে ভালো।
বললাম না মাসিমা, ছুটি ফুরিয়ে গেল। কাল যেতেই হবে।
মিসেস অ্যান্টনি বললেন, এত তাড়াতাড়িই যদি যাবে তাহলে দিল্লি থেকে এত খরচ করে মাত্র দশ দিনের জন্যে শুধু শুধু এলে কেন?
কি উত্তর দেব? শুধু একটু হাসলাম। সে প্রশ্নের উত্তর আমিও তো খুঁজছি।
.
রাত তখন নটা।
শীতের রাত। এমনিতেই পল্লীটা নিঝুম। এখন এই রাত নটাতেই মনে হচ্ছে যেন একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। মনে হলো যেন আমি কোনো মৃতের রাজ্যে বাস করছি।
