অফিস-ফেরত ওয়েলিংটন স্কোয়ারের দিকে গিয়েছিলাম সেই ভুটানিটার সন্ধানে। দেখি ওরা এ বছরের মতো পাততাড়ি গোটাচ্ছে। আমি যে লোকটির কাছ থেকে মাফলার কিনেছিলাম সে লোকটিও রয়েছে। কিন্তু সে তখন তার দেশীয় লোকদের সঙ্গে কি একটা বিষয় নিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় এমনই তর্ক করছিল যে আমায় দেখে লজ্জা পেল। আমি কিছু বলার আগেই সে ইশারায় আমায় বাড়ি চলে যেতে বলল। একটু পরে সে নিজেই গিয়ে টাকা নিয়ে আসবে।
তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। তার ওপর লোডশেডিং। শেষ মাঘে হঠাৎ শীতটা যেন আঁকিয়ে বসেছে। সর্বাঙ্গে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে অন্ধকার গলির মধ্যে দিয়ে সাবধানে হেঁটে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। পকেট হাতড়ে চাবি বের করে তালা খুললাম। সঙ্গে সঙ্গে গা-টা কেমন যেন ছমছম করে উঠল। এমন তো কোনদিন হয় না।
আমি চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে জুতোটা খুললাম। দু হাতে দরজার দুটো পাল্লা ছড়িয়ে দিলাম। এবারে অন্ধকারে মেঝেতে পা ফেলতেই যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমার হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠল। মেঝেতে সাদা মতো কি একটা পড়ে আছে। আর তার সামনে দুটো জ্বলন্ত চোখ। শুধু জ্বলন্ত নয়, জীবন্ত।
সেই জীবন্ত চোখ দুটো যেন অন্ধকারের মধ্যেও আমাকে চেনবার চেষ্টা করছে।
আমি ভয়ে চিৎকার করতে গেলাম। কিন্তু স্বর বেরোল না। আমার মাথা ঘুরতে লাগল, পা টলতে লাগল। বুঝতে পারলাম আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি…আর ঠিক সেই সময়েই কে যেন বাইরে থেকে ডাকলবাবুজি।
কেমন করে তারপর দশ-পনেরো মিনিট কেটেছে জানি না। হঠাৎই দেখলাম কারেন্ট এসে গেছে। আর ভুটানি লোকটি একদৃষ্টে মেঝের ওপর লক্ষ্য করছে। বেড়ালটা রক্তাক্ত অবস্থায় মরে পড়ে আছে–তারই পাশে বাইসনের শিংসুষ্ঠু মাথাটা কাঠ থেকে খুলে পড়েছে।
ভুটানি জিজ্ঞেস করল, বাবুজি, এ জিনিস কোথায় পেলেন?
দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্তস্বরে সব ঘটনাই বললাম।
ও বলল, বাবুজি, এ জিনিস ঘরে রাখবেন না।
বললাম, কি করব?
সে বলল–আমি ব্যবস্থা করব। তবে এখন নয়, রাত বাড়লে। আর বাবু, আজকের রাতটা আপনি এখানে থাকবেন না। আমি একাই থাকব।
অগত্যা প্রাণের দায়ে এক অচেনা অজানা ভুটানির হাতে ঘর ছেড়ে দিয়ে আমি এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে গেলাম।
পরের দিন সকালে এসে দেখি ঘরের সামনে লোকের ভিড়। বাড়িওলা ভোরে উঠে দেখেন ঘর খোলা অথচ আমি নেই। বুঝলেন চোর এসেছিল। তারপরই লোক ডাকাডাকি করেছেন। আমায় দেখে তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, কি মশাই! কাল কোথায় ছিলেন? এদিকে
আমি সব কথাই চেপে গেলাম। শুধু বললাম, বিশেষ দরকারে কাল রাত্তিরে এক আত্মীয়ের বাড়ি থাকতে হয়েছিল।
দেখুন দেখি। আর সেই সুযোগেই চোর এসে হানা দিল। কুকুরগুলোও ডাকল না মশাই! আশ্চর্য!
ঝড়িওলা আলাদা ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, কি কি জিনিস চুরি গেছে, ঠাণ্ডা মাথায় একটা লিস্ট করে ফেলুন। থানায় জানাতে হবে তো। বলে তিনি শশব্যস্তে ওপরে চলে গেলেন।
লিস্ট করার দরকার হয়নি। কেননা আমি ভালো করে দেখেছি, কিছুই চুরি যায়নি। যাবার মধ্যে গেছে বাইসনের শিংওয়ালা মাথাটা আর নিখোঁজ সেই ভুটানি লোকটি।
তাকে ধন্যবাদ সে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল।
.
.
নিষেধ
কেন যে হঠাৎ সুদূর দিল্লি থেকে মধুপুরে মিসেস অ্যান্টনিকে চিঠি লিখে বসলাম সে কথাটা ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাই।
লিখলাম–দিন দশেকের জন্যে নদীর ধারে মিস্টার গুহর সেই বাড়িটা ভাড়া পাওয়া যাবে কি?
উত্তর সঙ্গে সঙ্গেই পেলাম। মিসেস অ্যান্টনি লিখছেন–চেঞ্জে আসবে তো? তা ওটা কেন? ভালো বাড়ি আমার হাতেই আছে। মিস্টার গুহর বাড়িটা সংস্কারের অভাবে প্রায় অব্যবহার্য হয়ে গেছে।
উত্তরে লিখলাম–ঠিক চেঞ্জে যাবার জন্যে নয়। ঐ বাড়িটার সঙ্গে আমাদের পরিবারের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। হঠাৎই বাড়িটা একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। আপনি অনুগ্রহ করে জানান কত ভাড়া লাগবে। টাকাটা পাঠিয়ে দেব। আর বাড়িটা মোটামুটি বাসোপযোগী (অন্তত একটি ঘর–কেননা আমি একাই যাব) করতে যা খরচ লাগবে তাও পাঠিয়ে দেব। তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা করবেন। আমি আবারও বলছি–হঠাৎই যাবার খেয়াল হয়েছে। দেরি হলে হয়তো মত বদলে যাবে।
মিসেস অ্যান্টনিদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের যোগ অনেক দিনের। আমরা যতবারই মধুপুর চেঞ্জে গিয়েছি, মিসেস অ্যান্টনিই বাড়ি ঠিক করে দিতেন। গুহসাহেবের বাড়িটাই আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছিল। নদীর ধারে বাড়িটা। লোকের কোলাহলও নেই। শান্ত পরিবেশ। বাড়িটাও বেশ বড়ো। অনেকগুলো ঘর। চারিদিক ঘিরে বিরাট কম্পাউন্ড। তার অনেকটাই ঝোপজঙ্গলে ভর্তি হয়ে থাকত। গুহসাহেব কলকাতায় থাকেন। এখানে বড়ো একটা আসেন না। বাড়িটা দেখাশোনার ভার মিসেস অ্যান্টনিকেই দিয়ে রেখেছেন।
আগেই বলেছি, এ বাড়িতে আমরা সপরিবারে অনেকবার এসেছি। মাঝে কয়েক বছর আসা হয়নি। শেষ এসেছিল শুধু দিদি আর জামাইবাবু অসীমদা। মাসখানেক ছিল। তারপর কী যে হয়ে গেল! আর কেউ এমুখো হতে চায় না। মধুপুরের কথা উঠলেই বাবা গম্ভীর হয়ে যান। মা নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে। আমিও ঠিক করেছিলাম আর কখনও এখানে আসব না। ব্যস! মধুপুরের সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ। তারপর হঠাৎই কী হলো, মধুপুরে সেই বাড়িতে যাবার জন্যে মনটা ছটফট করে উঠল।
