শুধু ঝোলাই নয়, তার দুটো থাবা থেকে সরু সরু আটটা বাঁকানো তীক্ষ্ণ নখ বের করে বাইসনের মুখটা আঁচড়াচ্ছে।
নিশ্চয় দেওয়ালে পোকামাকড় ধরবার জন্যে লাফাতে গিয়ে বাইসনের শিং-এ আটকে গিয়ে ঝুলছে–তা বলে নেপাল থেকে কেনা আমার অমন শখের বাইসনটার মুখ আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে?
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। উঠে, হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে ছাতাটা তুলে নিয়ে বেড়ালটাকে দু-চার ঘা দিয়ে ঘর থেকে দূর করে দিলাম।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই চোখ পড়ল বাইসনের মাউন্ট করা মুখটার দিকে। হতভাগা বেড়ালট্রা মুখটাকে একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে। একে বীভৎস মুখ, তার ওপর বেড়ালের নখের আঁচড়ে আঁচড়ে এখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
বাইরে থেকে নেপালে যারা বেড়াতে যায় তারা যে শুধু ইমপোরটেড গুম্স অর্থাৎ বিদেশী জিনিসপত্তর, যেমন ছাতা, টর্চ, সেটিরেজার, লাইটার, রেকর্ড-প্লেয়ার কেনে তা নয়, কিউরিও থেকেও দুষ্প্রাপ্য পুরনো আমলের জিনিস কেনার দিকেও ঝোঁকে।
নেপালে যে হোটলে ছিলাম সেখানে সবার মুখেই শুনলাম, এখানে কোথাও বাইসনের মাউন্ট করা শিংসুন্ধু মাথা পাওয়া যায়। দুর্দান্ত জিনিস। ভক্তপুরে নেয়ার রাজাদের ঘরে নাকি বহুকাল ছিল। তারপর এখন নেপালের কিউরিও সপে তার গতি হয়েছে।
কিন্তু কোন কিউরিওর দোকানে পাওয়া যায় তা সঠিক কেউ জানে না।
জিনিসটা যে কী, কেনই বা দুর্দান্ত, কিসের জন্যেই বা লোকের এত আকর্ষণ কিছুই জানি না। শুধু ওটা কেনার জন্যে পাগল হয়ে উঠলাম। নানা মঠ, মন্দির, প্যাগোজ দেখতে দেখতে একদিন একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে ভক্তপুরে চলে এলাম।
ভক্তপুর নাম থেকেই বুঝতে পারা যায় এক সময়ে জায়গাটায় ভক্তরা থাকতেন। তাঁরা হিন্দু কি বৌদ্ধ তা জানি না। তবে কাছাকাছি হিন্দুদের অনেক পুরনো মন্দির দেখতে পেলাম।
ভক্তপুর জায়গাটা নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডু থেকে পুব দিকে আট মাইল দূরে। এখানেই এক সময়ে দুশো বছরেরও আগে নেয়ারি রাজারা বাস করতেন। তাদের রাজপ্রাসাদ এখনো আছে।
ঘুরতে ঘুরতে এখানে একটা কিউরিওর দোকান পেলাম। ভেতরে ঢুকে দেখি, নানারকমের পুরনো পুঁতির মালা, রুদ্রাক্ষের মালা, কারুকার্যকরা বড়ো বড়ো ছোরা, দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখার জন্যে ভীষণদর্শন মুখ, এমনি অনেক জিনিস রয়েছে। আমি কৌতূহলী হয়ে এদিক-ওদিক কিছু খুঁজছি দেখে দোকানি জিজ্ঞেস করল কী চাই?
আমি একে বিদেশী, তার ওপর এদেশের কিছু জানি না–সসংকোচে বাইসনের শিং-এর কথা জিজ্ঞেস করলাম।
দোকানদার আমার মুখে বাইসনের শিং-এর কথা শুনে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, আপনি কিনবেন?
এমনভাবে বলল যেন ও জিনিস কেনার অধিকার আমার নেই।
বললাম, দামে পোষালে আমি কিনব। অর আগে জিনিসটা দেখতে চাই।
লোকটি তখন একজন কর্মচারীর হাতে একগোছা চাবি দিয়ে আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে বলল।
দোকান থেকে বেরিয়ে গলি-পুঁজি দিয়ে শেষে একটা বিরাট প্রাসাদের মন্ত কাঠের দরজার কাছে লোকটা এসে দাঁড়াল। এ চাবি ও চাবি দিয়ে গোটা পাঁচেক দরজা খুলে শেষে সুন্দর একটা সাজানো-গোছানো ঘরে এনে দাঁড় করাল।
ঘরটি পুরনো কালের রাজা-রাজড়াদের জিনিসপত্রে ভর্তি। রাজসিংহাসন, রাজার মাথার ছাতা, বিরাট ঢাল, বাঁকা তরোয়াল, গোলাপপাস, আতরদান, ঝাড়লণ্ঠন এমন কত কী! হঠাৎ লক্ষ্য পড়ল দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে বিরাট এক মোষের মাথা। দেখেই বুঝলাম এইটেই সেই বাইসন!
বাইসন হচ্ছে আমেরিকার এক জাতীয় বুনো মোষ। মোষ যে এরকম ভয়ংকর হয় তা জানা ছিল না। চোখ দুটো লাল–যেন ক্রোধে জ্বলছে। মোটা মোটা দুটো বাঁকানো শিং।
বোঝা যায়, কোনো এককালে কোনো রাজা দুর্ধর্ষ এই জীবটিকে শিকার করেছিলেন। তারপর তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ কীর্তিটাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্যে গোটা মাথাটা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে যেমন ছিল তেমনি রেখে হরতনের আকারে একটা কুচকুচে কালো কাঠের ফ্রেমে মাউন্ট করে রেখেছেন। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, শিংগুলো এমন কিছু দিয়ে রং করা যা দেখলে যে কেউ মনে করবে এটা বুঝি সোনার।
একটা কথা ভেবে আশ্চর্য হলাম–আমেরিকার বাইসনের নাগাল নেপালের রাজা পেলেন কি করে!
সে কূটতর্ক থাক। জিনিসটা দেখে আমার এত পছন্দ হলো যে টাকার মায়া না করে কিনে ফেললাম।
হোটেলে সবাই এই দুষ্প্রাপ্য মহামূল্যবান জিনিসটা দেখে ঈর্ষায় ফেটে পড়ল। শুধু হোটেলের ম্যানেজার আমায় বললেন, বাবু, এটা তো কিনলে কিন্তু রাখবে কোথায়?
বললাম, কেন? আমার ঘরে।
ম্যানেজার হেসে বললেন, এ বাইসন যে সে ঘরে থাকে না। রাজপ্রাসাদ চাই। কত জনে নিয়ে গেছে, শেষে বিনা পয়সায় ফেরত দিয়ে বেঁচেছে।
আমি কোনো উত্তর দিইনি। বুঝলাম ম্যানেজার আমায় ঠাট্টা করছে। আমার ঘর-বাড়ি যত ভালোই হোক, এ জিনিস মানাবে না।
কুসংস্কারে বা অলৌকিকত্বে আমার এতটুকু বিশ্বাস নেই। আমি ওটিকে কলকাতায় এনে আমার সেই ভাঙাচোরা ভাড়াটে ঘরে সযত্নে টাঙিয়ে রেখেছিলাম। তারপর থেকেই যে সব ছোটোখাটো ঘটনা ঘটছিল তা অস্বস্তিকর হতে পারে কিন্তু অস্বাভাবিক বা অলৌকিক বলে মনে করিনি। আজ বেড়ালটার নখের আঁচড়ে আঁচড়ে বাইসনের অমন মুখটা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় দুঃখ পেলাম।
.
কয়েক দিন পর।
