দেব-দেবীর ছবিগুলো আমার নয়। ওগুলো বাড়িওলার। আমি সরিয়ে নিতে বলেছিলাম, বাড়িওয়ালা রাজী হননি। অগত্যা থেকেই গেছে। বাইসনের শিং জোড়াটাই আমার।
কিছুদিনের জন্যে নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফিরেছি গত সপ্তাহে। এখানে ফিরে পর্যন্ত লক্ষ্য করছি প্রায় প্রতিদিনই কিছু অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটছে। এতই সামান্য ঘটনা যে লোককে ডেকে বলার বা দেখাবার কিছু নেই। যেমন প্রথম দিন অফিস থেকে ফিরে তালা খুলতে গিয়ে দেখি তালা কিছুতেই খুলছে না। এমন কোনোদিন হয় না। শেষে রাস্তা থেকে কোনোরকমে একজন চাবিওয়ালাকে নিয়ে এলাম। সে আমারই চাবি নিয়ে তালায় ঢোকানো মাত্র তালা খুলে গেল। আশ্চর্য!
চাবিওয়ালা একটু হেসে চলে গেল।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে টাইমপীসটার দিকে তাকাতে দেখি ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে। অবাক হলাম। কেননা প্রতিদিন সকালে উঠেই আমি সব আগে ঘড়িতে দম দিই। একবার পুরো দম দিলে তা অন্তত দুপুর পর্যন্ত চলে। কিন্তু সেদিনই দেখলাম ব্যতিক্রম। ভাবলাম, নিশ্চয় পুরো দম দেওয়া হয়নি। যাই হোক, নতুন করে দম দিতে লাগলাম। আর সঙ্গে সঙ্গেই স্পিংটা কটু করে কেটে গেল।
কী ঝঞ্জাট! এখন ছোটো ঘড়ির দোকান। উটকো খরচা তো আছেই, তার চেয়ে ঢের অসুবিধে, এখন বেশ কিছুদিন ঘড়িটা পাব না। রিস্টওয়াচ একটা আছে ঠিকই কিন্তু চোখের সামনে ঘড়িটা না থাকলে আমার চলে না। আসলে আমি একা থাকি। ঘড়িটাই যেন আমার সঙ্গী। রাতদুপুরে হয়তো ঘুম ভেঙে গেল। এই কলকাতা শহরেও নিঝুম রাতে সরু গলির মধ্যে চুন-বালি-খসা পুরনো ঘরটার মধ্যে কেমন গা ছমছম করে। তখন টাইমপীসটার টিটি শব্দ শুনলে যেন মনে হয়, সচল কিছু একটা আমার ঘরে আছে।
আমি রোজ স্নানে যাবার আগে দাড়ি কামাই। রোজ দাড়ি না কাটলে চলে না। সেদিন খবরের কাগজ পড়তে পড়তে দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি সেটিরেজার নিয়ে শেভ করতে গিয়ে দেখি ব্লেড নেই। এমন কখনও হয় না। ব্লেড ফুরোবার আগেই নতুন এক প্যাকেট ব্লেড কিনে রাখি। যাক গে, হয়তো ভুলেই গেছি। তাড়াতাড়ি লুঙ্গির ওপর শার্ট চড়িয়ে ব্লেড কিনতে বেরোলাম। ব্লেড কিনে ফিরে এসে দেখি ব্লেডের একটা গোটা প্যাকেট আয়নার সামনেই রয়েছে।
ইস্! এমন চোখের ভুলও হয়!
যাই হোক, দেরি হয়ে গেছে বলে তাড়াতাড়ি দাড়ি কামাতে বসলাম। দুটো টান দিয়েছি, অমনি থুতনির নিচেটায় খচ্ করে কেটে গিয়ে রক্ত পড়তে লাগল।
একে নতুন ব্লেড, তার ওপর তাড়াতাড়ি হাত চলছিল–কেটে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু রক্ত কিছুতেই আর বন্ধ হয় না। আমি তখন এমন নার্ভাস হয়ে গেলাম যে কোনোরকমে তুলো দিয়ে জায়গাটা জোরে চেপে ধরে শুয়ে রইলাম। ডাক্তারখানায় যাব সে শক্তিটুকুও ছিল না।
এসব ঘটনা কাউকে জানাবার নয়, তবু আমার কাছে রীতিমতো অস্বস্তিকর। সেদিন রক্তপাত দেখে ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল কিছু একটা অশুভ ঘটনা যেন ঘটতে চলেছে। আজ খোলা জানলা দেখে আরো ঘাবড়ে গেলাম। মনে হলো অশুভ কিছু একটা প্রতিদিন যেন এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে। অথচ কী যে করব ভেবে পাচ্ছি না।
কদিন পর।
কোথা থেকে একটা বেড়াল এসে জুটেছে। সাদা লোমে ঢাকা বেড়ালটা দেখতে বেশ সুন্দর। খুব আদুরে। এসেই আমার পায়ে লুটোপুটি খেতে লাগল। বুঝলাম কারো বাড়ির পোষা বেড়াল। ভুল করে এখানে চলে এসেছে। এসেছে যখন থাক। দুবেলা আমার পাতের এঁটোকাটা খেয়ে ও থেকে গেল। ভাবলাম ঘড়িটা তো দোকানে। এখন বেড়ালটাই আমার সঙ্গী হোক।
আমাদের এই গলির মুখে কতকগুলো রাস্তার কুকুর রাত্তিরে আড্ডা জমায়। অচেনা লোক দেখলেই এমন ঘেউ ঘেউ করে ওঠে যে বাছাধন পালাতে পথ পায় না। ফলে চোর-টোরের ভয় থাকে না।
রাত তখন কত জানি না। হঠাৎ কুকুরের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। এত রাত্রে কুকুরগুলো অমন করে ডাকছে কেন?
আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। প্রথমে অন্ধকারেই দেখলাম সাদা বেড়ালটা পাগলের মতো একবার ভোলা জানলাটার দিকে যাচ্ছে, একবার খাটের তলায় কছে। ওদিকে রাস্তার কুকুরগুলো ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে। কিন্তু এ চিৎকার অন্যরকম। অচেনা লোক দেখে তাড়া করে যাওয়া নয়–এ যেন কিছু একটা দেখে আতঙ্কে আর্তনাদ করে ওঠার মতো।
আশ্চর্য! কুকুরগুলো এত রাত্রে এই গলির মধ্যে এমন কী দেখল যে ভয়ে অমন করে ডাকছে!
তাড়াতাড়ি উঠে আলো জ্বেলে জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালাম। আলো আর সেই সঙ্গে পরিচিত মুখ দেখে কুকুরগুলো শান্ত হলো।
পরের দিন পাড়ার লোকদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁরা রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছেন। আজ দিন দশ-পনেরো ধরে প্রতি রাত্তিরেই নাকি কুকুরগুলো ঐরকম বীভৎস সুরে ককিয়ে ককিয়ে ডাকে। কেন যে অমন করে ডাকে কে জানে! নিশ্চয় ভয়ানক কিছু দ্যাখে, কিন্তু সেটা কী বস্তু?
আমি বুঝলাম, অন্য দিনের ডাক আমি শুনতে পাইনি।
আমার ঘরটা পুরনো, ভাঙাচোরা। রাতের বেলা আরশোলা, উচ্চিংড়ে প্রভৃতি নানারকম পোকামাকড় ওড়ে। মাকড়সাগুলো তো রীতিমতো ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলেছে।
কি একটা জিনিস যেন পড়ে গেল–সেই শব্দে হঠাৎ গভীর রাত্রে ঘুম ভেঙে গেল। আলো জ্বেলে দেখি আলমারির গায়ে ছাতাটা ঝুলিয়ে রেখেছিলাম, সেটা পড়ে গেছে। আর অমন ধীর শান্ত বেড়ালটা হঠাৎই বীর বিক্রমে বাইসনের শিং ধরে ঝুলছে।
