বিভাবতীর মুখটা ভয়ে শুকিয়ে গেল। তিনি অনেক করে বোঝালেন। বললেন, ও ঘরটা ব্যবহার করা হয় না। পরিষ্কার করা নেই। কি দরকার? একটা রাত তো একটু কষ্ট করে না হয় আমার কাছে শুলেই।
অঞ্জনা ভাবল শাশুড়ি বোধ হয় ও ঘরে বিছানা পাতা, মশারি টাঙানোর হাঙ্গামার জন্যেই বলছেন। তাই বললে, আপনি কিছু ভাববেন না। আমি সব ঠিক করে নিচ্ছি।
বলে উত্তর দিকের ঘরে গিয়ে ঝটপাট দিয়ে বিছানা পেতে নিলো।
নিরুপায় বিভাবতী কি আর করেন, শুধু বললেন, ভয়টয় পেলে আমায় ডেকো।
অঞ্জনা হেসে বলল, কিসের ভয়? ভূতের?
ভূত কথাটা হঠাৎই তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল।
কি আর করেন, বিভাবতী এক ফাঁকে তার গলার রুদ্রাক্ষের মালাটা অঞ্জনার বালিশের নিচে রেখে দিয়ে এলেন। মনে মনে প্রার্থনা করলেন, ঠাকুর, বৌমাকে রক্ষে কোরো।
.
খুব ক্লান্ত ছিল অঞ্জনা। তাই হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে শোয়ামাত্র ঘুম। তখনও সে জানত না কি ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে…।
অনেক রাত্রে আচমকা তার ঘুম ভেঙে গেল। অসহ্য গরমে তার নিঃশ্বাস যেন আটকে যাচ্ছে। মশারির মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে দেখল পাখা চলছে না। লোডশেডিং? কলকাতায় এত লোডশেডিং হয়! কিন্তু তখনই বাইরের জানলা দিয়ে চোখ পড়তে দেখল রাস্তার আলোগুলো দিব্যি জ্বলছে।
তাহলে?
হঠাৎই তার মনে হলো ঘরের মধ্যে আরও কেউ রয়েছে। চমকে তাকাতেই দেখল তার বিছানা থেকে মাত্র হাত পাঁচেক দূরে লম্বা মতো একটা লোক কোমরে হাত দিয়ে তার দিকে ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। এইরকমই একটা আবছা চেহারা সে সন্ধ্যেবেলা দেখেছিল বাড়ি ঢোকার সময়ে। তখন মুখ দেখতে পায়নি।
ধড়মড় করে উঠে বসতে গেল অঞ্জনা। কিন্তু পারল না। মনে হলো তার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে।
কি করবে ভাবছে, দেখল লোকটা এক পা এক পা করে তার দিকে এগিয়ে আসছে।…
চিৎকার করতে গেল, পারল না। মুখ থেকে শুধু একটা গোঁ গোঁ শব্দ বেরিয়ে এল।
ততক্ষণে মূর্তিটা একেবারে মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। একটা হাত দিয়ে মশারিটা তুলছে…তারপরই কনকনে ঠাণ্ডা একটা হাত তার বাঁ হাতটা চেপে ধরে টানতে লাগল।
মাগো!
একটা শব্দই অঞ্জনার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়, শাশুড়ির ডাকাডাকিতে। প্রথমে মনে হয়েছিল রাত্রে দুঃস্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু নিজের হাতের দিকে তাকাতেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। হাত মুচড়ে ধরার দাগটা লাল হয়ে আছে। আর–আর মাথার দিকে মশারিটাও খানিকটা তখনও উঁচু হয়ে আছে।
অঞ্জনা বললে, আপনি এখানে একা আর থাকবেন না। আমার সঙ্গে চলুন।
বিভাবতী বললেন, হুট করে কি এখানকার পাট চুকিয়ে চলে যাওয়া যায়?
তবে আমি এখন যাই। খুব তাড়াতাড়ি আপনার ছেলেকে নিয়ে আসছি। তারপর একসঙ্গে বসে আলোচনা করে ঠিক করা যাবে। এ কদিন একটু সাবধানে থাকবেন।
বিভাবতী একটু হাসলেন।
.
ব্যাপারটা অঞ্জনা সহজে ছেড়ে দেয়নি। এই বাড়িতে এক রাত্তির থাকার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা কাগজে লিখল। কলকাতায় এসে পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটে যে তথ্যটা বের করেছিল তা হচ্ছে– সেই দীর্ঘদেহী খুনীটা পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এই বাড়িতেই লুকিয়ে ছিল দলবল নিয়ে। সাহস করে কেউ পুলিশকে খবর দিতে পারেনি। কিন্তু জমিদারপুত্রদের একজন বাড়িটা খালি করার জন্যে একদিন লেঠেল পাঠিয়ে তাকে খুন করে ঐখানেই পুঁতে রাখে। পুলিশ পরে এসে মাটি খুঁড়ে লাশের সন্ধান করে। আশ্চর্য! কিন্তু লাশ পাওয়া যায়নি।
[আষাঢ় ১৪০৭]
বাইসনের শিং
কলকাতার রাস্তায় শীতের মরশুমে প্রতি বছর ভুটানিরা দল বেঁধে সোয়েটার, টুপি, মাফলার বিক্রি করতে আসে।
ওয়েলিংটন স্কোয়ারের ধারে যারা বসে তাদেরই একজনের কাছ থেকে প্রতিবার কিছু না কিছু কিনি। লোকটি বৃদ্ধ। চোখে-মুখে সরলতার ছাপ আছে। ওর কাছে দাম সস্তা বলেই মনে হয়। জিনিসও খারাপ দেয় না।
এবারও একটা মাফলার কিনেছিলাম। সঙ্গে খুচরো টাকা ছিল না। ও আমার বউবাজারের বাসা চিনত। বলেছিল, এক সময়ে বাসায় এসে টাকা নিয়ে যাবে।
শীত শেষ হতে চলল, ভুটানিরা ফিরে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছে। এখনও লোকটি দাম নিতে এল না কেন ভাবতে ভাবতে তালা খুলে ঘরে ঢুকতেই আমি রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম। দেখলাম ঘরের একটা জানলা একদম খোলা। আর দুপুরের দমকা হাওয়ার সঙ্গে যে এক পশলা শেষ মাঘের বৃষ্টি হয়েছিল তাতে আমার টেবিলের কাগজপত্র চারিদিকে ছড়িয়ে ভিজে একা হয়ে গেছে।
আমি কয়েক মিনিট দরজার কাছে বিভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। জানলা খোলা থাকলে বাতাসে কাগজপত্র উড়ে যাবেই বৃষ্টির ছাটে ভিজেও যাবে। এ তো জানা কথা। কিন্তু জানলা তো খোলা ছিল না। এই ঘরটাতে আমি একাই থাকি। এবং যখনই বেরোই তখনই সব জানলা ভালো করে বন্ধ করে যাই। এটা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।
জুতোটা দোরগোড়ায় খুলে আমি জানলাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম জানলার একটা পাল্লা তখনও বন্ধ রয়েছে। অন্য পাল্লার লোহার ছিটকিনিটা তোলা। ভেতর থেকে কেউ যেন একটা পাল্লা খুলে ফেলেছে। এরকম অসম্ভব ঘটনা কি করে ঘটল তা ভেবে পেলাম না।
জামাকাপড় না ছেড়েই অবসন্ন দেহে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। একবার। ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম। না, বৃষ্টি বা ঝোড়ো বাতাসে আর কিছু এলোমেলো হয়ে যায়নি। হ্যাঁঙ্গারে শার্ট দুটো ঝুলছে, খবরের কাগজটা দেরাজের উপরে যেমন ভাঁজ করা ছিল তেমনিই আছে। দেওয়ালে অনেকগুলি দেব-দেবীর ছবি। সেগুলো সব যেমন ছিল তেমনটিই আছে। ওপাশে দামী কাঠের ওপর মাউন্ট করা বাইসনের শিং জোড়াটাও এতটুকু নড়েনি।
