যাই হোক এদিনের পর থেকে আর সে এ ঘরে ঢোকেনি। কিন্তু গোল বাধাল একদিন কাজের মেয়েটা।
তিনি ঠিক করেছিলেন কাজের মেয়েটাকে রাতে তার কাছে থাকতে বলবেন। তার জন্যে বেশি মাইনেও দেবেন। মেয়েটা রাজীও হয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে একটা ঘটনা ঘটল।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ আলোগুলো নিভে গেল। বিভাবতী বুঝলেন লোডশেডিং। এ তো রোজকার ব্যাপার। কিন্তু হঠাৎই কাজের মেয়েটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে এল তার কাছে। মুখ দিয়ে তার কথা বেরোচ্ছে না।
কি রে মালতী? কি হয়েছে?
মালতী অতি কষ্টে শুধু বললে, একটা লোক—
লোক! কোথায়?
মালতী আঙুল দিয়ে ওদিকের ঘরটা দেখিয়ে দিল। তারপর কোনোরকমে বলল, আজকে ঐ ঘরটায় ঝট দিতে ঢুকেছিল। সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং। আর তখনই ও স্পষ্ট দেখল একটা লম্বা মতো লোক ঘরের মধ্যে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে..
বিভাবতীর বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল। লোক বলতে মালতী যে কি বোঝাতে চাইছে তা বুঝতে তার আর বাকি রইল না। কিন্তু মুখে সাহস দেখিয়ে বললেন, ও ঘরে লোক আসবে কোথা থেকে? নিশ্চয় চোখের ভুল।
মালতী যতই বোঝাতে চায় চোখের ভুল নয়, বিভাবতী ততই বলেন, না চোখে ভুল। ও ঘরে লোক আসবে কোথা থেকে?
মালতী চুপ করে আছে দেখে তিনি আরও জোর দিয়ে বললেন, আমি এত দিন আছি। কই কোনো দিন তো কিছু দেখিনি।
মিথ্যে কথাই বলতে হয়েছিল বিভাবতাঁকে। কিছু না দেখলেও ঐ বন্ধ ঘরে মানুষের চলাফেরার শব্দ তিনি শুনেছিলেন এক-আধবার নয়, বারবার।
বাধ্য হয়েই এই মিথ্যেটুকু বলতে হয়েছিল। না বললে মালতী আর এ বাড়িতে কাজ করত না।
শেষ পর্যন্ত মালতী থাকল। তবে সন্ধ্যে হবার আগেই চলে যেত। তখন থেকে বিভাবতী সারা রাত একা মুখ বুজে। আর পাশের তালাবন্ধ ঘরটায় মূর্তিমান আতঙ্ক।
সেদিনও তার নিস্তব্ধ ঘরটাকে সচকিত করে টেলিফোনটা বেজে উঠল। তবে গভীর রাতে নয়, সন্ধ্যের একটু পরে।
চমকে উঠলেন বিভাবতী। কোনোরকমে তুলে নিলেন রিসিভারটা।
হ্যালো! দিল্লি থেকে? ও বৌমা! খুশিতে তার স্বর আটকে যাচ্ছিল।
হ্যাঁ, তা আছি একরকম–ভালোই আছি। আচ্ছা, তুমি কি আগে একদিন অনেক রাতে ফোন করেছিলে? করনি?…তাহলে রং নাম্বার। হ্যাঁ, অনেক রাতে কেউ করেছিল..কথা বলা হয়নি। কেটে গিয়েছিল।
তুমি আসবে পরশু দিন? খুব খুশি হলাম।..মাত্র এক রাতের জন্যে? তোমার বন্ধুর বিয়েতে?..থাকতে পারবে না দুদিন?…কি আর করা যাবে?…তাই এসো।
বিভাবতী দেবী রিসিভারটা রেখে দিলেন। তারপর মুখ তুলতেই তিনি চমকে উঠলেন। ঘরের বাইরে জানলার গরাদ ধরে লম্বা মতো কেউ যেন দাঁড়িয়ে।
কে? কে ওখানে?
সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিটা সরে গেল–যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বিভাবতীর রক্ত হিম হয়ে গেল। ও কি শুনতে এসেছিল এ বাড়িতে নতুন কেউ আসছে কি না?
বিভাবতীর ছেলের বৌ অঞ্জনা দিল্লির একটা বিখ্যাত ইংরিজি কাগজের অফিসে কাজ করে। কলকাতায় তার এক বন্ধুর বিয়েতে আসছে। রাতটুকু শুধু শাশুড়ির কাছে থাকবে। পরের দিনে সকালের ফ্লাইটেই দিল্লি ফিরে যাবে।
মাত্র একটি রাত বৌমা তার কাছে থাকবে। বিভাবতী মনকে বোঝান-যেটুকু নিজের লোককে কাছে পাওয়া যায় ততটুকুই আনন্দ। তবু তাকে মনের মতো বেঁধেবেড়ে খাওয়াতে পারবেন না এটাই দুঃখ। সে নেমন্তন্নবাড়ি আসছে কিনা।
সেই সঙ্গে তার একটু ভয়ও করল। ঐ যাকে এ বাড়িতে প্রায়ই দেখা যায়–বৌমাও তাকে দেখে ফেলবে না তো?
সেদিন দুপুরবেলাতেই অঞ্জনা হাসতে হাসতে এল। সারা দুপুর বিভাবতীর পাশে শুয়ে কত গল্পই না করল। বিকেলের দিকে বেরিয়ে গেল কিছু কেনাকাটা করতে। বলে গেল সন্ধ্যের আগেই ফিরবে।
ঠিক সন্ধ্যেবেলাতেই ফিরল অঞ্জনা। ফুটপাথ থেকে উঠে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। তারপরেই ঢোকার দরজা। কলিংবেল টিপতে যাচ্ছিল, দরকার হলো না। মালতী দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি। বৌদিকে দেখে একটু হাসল।
কাজ হয়ে গেল?
হ্যাঁ।
বাড়ি যাচ্ছ?
হ্যাঁ।
অঞ্জনা ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এবার একটু প্যাসেজ। প্যাসেজটা অন্ধকার। অঞ্জনা এগিয়ে যাচ্ছিল; হঠাৎ মনে হলো সে যেন এগোতে পারছে না…কিসে যেন বাধা পাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে ঠেলে বের করে দিতে চাইছে। অঞ্জনা থতমত খেয়ে গেল। তখনই তার মনে হলো তার সামনে দু হাত দূরে কেউ যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে..চোর?
অঞ্জনা দিল্লিতে খবরের কাগজের অফিসে চাকরি করা মেয়ে, সংবাদ সংগ্রহের জন্যে তাকে নানা জায়গায় ছুটতে হয়। অত সহজে সে ভয় পায় না। ধমকের সুরে বলল, কে ওখানে?
পরক্ষণেই মনে হলো কেউ যেন পথ ছেড়ে সরে গেল।
পাছে মা ভয় পান তাই ব্যাপারটা নিয়ে অঞ্জনা বেশি হৈচৈ করল না। মায়ের ঘরে ঢুকে শুধু একটা কথাই বলল, প্যাসেজটায় আলোর ব্যবস্থা নেই?
বিভাবতী অবাক হয়ে বললেন, আছে বৈকি। এই তো মালতী গেল আলো জ্বেলে।
কিন্তু কিন্তু আমি তো দেখলাম অন্ধকার।
বিভাবতী বললেন, তাহলে হয়তো বালবটা কেটে গেছে।
আধঘণ্টার মধ্যে অঞ্জনা সাজসজ্জা করে বিয়েবাড়ি চলে গেল। রাত দশটায় যখন ফিরল তখন দেখল প্যাসেজে দিব্যি আলো জ্বলছে।
এবার তাড়াতাড়ি শোবার পালা। কাল সকালেই আবার প্লেন ধরতে হবে।
বিভাবতী তার বিছানাতেই অঞ্জনার শোবার ব্যবস্থা করেছিলেন। মাত্র একটা রাত নিজের বৌমাকে কাছে নিয়ে শোবেন। অঞ্জনা কিন্তু শাশুড়ির সঙ্গে শুতে রাজী হলো না। বললে, ওদিকের ঘরটা তো খালি পড়ে রয়েছে। ওখানেই আমি শোব।
