যাই হোক চারুকে শাস্তি দেবার জন্যে আমি রাতের অন্ধকারে ডেকে পাঠালাম নতুন পুকুরপাড়ের গোদাকে। যে-কোনো বাড়িতে ও যেমন করে তোক ঢুকবেই। তারপর রাত থাকতে থাকতেই কাজ হাসিল করে আসবে।
আমাদের মতো বাবুদের বাড়িতে লুকিয়ে ডাক পাওয়া ভাগ্যের কথা। গোদা হাত জোড় করে এসে দাঁড়াল। বললাম, গোদা, একটা কাজ আছে। খুব সাবধানে করতে হবে। তবে তোমার পক্ষে কাজটা মোটেই শক্ত নয়।
বলুন হুজুর।
ওকে তখন কাজটা বুঝিয়ে বললাম, গোদা, আমি এইটুকু জেনেছি বাঁয়া-তবলাটা চারু ওর পড়ার ঘরে লুকিয়ে রেখেছে। তোমার কাজ হচ্ছে ওখান থেকে ওটা হাতিয়ে এনে আমার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। এর জন্যে তোমাকে কত দিতে হবে বলো? তবে সাবধান, কেউ যেন জানতে না পারে।
গোদা হাত জোড় করে বলল, আমায় সাত দিন সময় দেবেন। চার দিন লাগবে লক্ষ রাখতে কে কখন বাড়িতে যায়, বাড়ি থেকে বেরোয়। তারপর বাকি তিন দিনের মধ্যে কাজ হাসিল করে আপনার জিনিস আপনার কাছে পৌঁছে দেব। তারপর আপনি খুশি হয়ে গরিবকে যা দেন দেবেন।
বলেই আবার আভূমি নত হয়ে প্রণাম করে চলে গেল।
এর অনেক দিন পর নকুল যখন এল আমাদের বাড়িতে তখন ওকে দেখে প্রথমে গোদা বলেই ভুল করে ফেলেছিলাম। আশ্চর্য মিল! আমি নকুলকে জিগ্যেস করলাম তার কোনো দাদা এদিকে থাকত কিনা। ও জানিয়েছিল ওর আত্মীয়স্বজন কেউ কোথাও নেই।
পাদ্রীবাবা বললেন, এই জন্যেই বুঝি নকুলকে ডেকে আমাকে দেখালেন।
হ্যাঁ, নকুলকে দেখে গোদা সম্বন্ধে একটা ধারণা করতে পারবেন।
আপনার নির্দেশমতো গোদা কাজ করতে পেরেছিল?
হ্যাঁ, নিখুঁত ভাবে।
পাত্রীবাবা বললেন, তারপর চারু যখন জানতে পারল তখন কী করল?
ও যে ঠিক জানতে পেরেছিল তা আমিও বুঝিনি। শুধু আমি কেন কেউই খবর রাখেনি। এমন কি ও যে কবে হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল তাও আমরা জানতাম না। আর ধন্য তার বাবা-মা। ছেলে যে না বলে চলে গেছে তার জন্য কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই।
তাহলে আপনার সঙ্গে আপনার বন্ধুর দেখা হল কবে?
অনেকদিন পরে। ততদিনে পুরোনো বাড়ি ছেড়ে এই বাড়িতে এসে গেছি। কোথায় কেন যে এমন গা ঢাকা দিয়েছিল তা আজও জানি না। একদিন রাত্রে হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি চারু দাঁড়িয়ে। আমি তো অবাক। জিগ্যেস করলাম, কী ব্যাপার? কবে এলি?
তার উত্তর না দিয়ে বলল, শোন্, আমার শরীর খুব খারাপ। তবু তোকে জানাতে এসেছি আমার ঘর থেকে বাঁয়া-তবলা চুরি করে তুই রেহাই পাবি না। আমি যেখানেই থাকি একদিন তোকে টেনে নেবই। মনে রাখিস। বলতে বলতে সে যেন অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। এ আবার কী দেখলাম–কী শুনলাম! পরের দিন মোহনকে বললাম। ও বলল, হ্যাঁ, শুনেছি। কিন্তু ও দেখা করল কী করে? ও তো কদিন থেকে জ্বরের ঘোরে রয়েছে। কাল দেখতে গিয়েছিলাম। ডাক্তার রোগ ধরতে পারছেন না। ভুল বকে যাচ্ছে। আমায় দেখে লাল লাল চোখ মেলে দাঁত কড়মড় করে চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই শয়তান বন্ধু! চোর কোথাকার! প্রতিশোধ নেবই। আমি বাইচান্স খ্রিস্টানের ঘরে জন্মেছি। কিন্তু যিশু ভজি না। শোধ তুলবই। বুঝলাম চিনতে ভুল করেছে।
অসুখের মধ্যেও আমার মুন্ডু চিবোচ্ছে!
তুমি কি একদিন দেখতে যাবে?
বললাম, সাহস পাই না। আমায় দেখে যদি উত্তেজনায় হার্ট ফেল করে!
তা বটে। মোহন কাজে মন দিল।
যাব কি যাব না করতে করতে কদিন গেল। তারপর স্থির করলাম, ঝগড়াই হোক আর মনোমালিন্যই হোক একসঙ্গে এতদিন গানবাজনা করেছি। একবার দেখা করে আসি। এটা কর্তব্য।
কিন্তু মনের মধ্যে খোচ থেকেই গেল। সে রাত্রে যখন সে জ্বরের ঘোরে ছিল তখন আমার সঙ্গে দেখা করতে এল কী করে?
.
০৮.
শ্রাবণ মাস। সেদিন আবার শনিবার। ভরা অমাবস্যা। বিকেল বিকেল গেলাম। কিন্তু মেঘে মেঘে বিকেল তলিয়ে গেছে অকাল সন্ধ্যার মধ্যে। ভয়ে ভয়ে ঢুকলাম ওদের বাড়ি। ভেবেছিলাম অনেককেই দেখতে পাব। কিন্তু কোথায়? ওর বাবাকে দেখলাম কোট-প্যান্ট পরে দিব্যি হাসিমুখে একজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন। আমাকে দেখে বললেন, এসো।
জিগ্যেস করলাম, চারু কেমন আছে?
ভালো না। বলেই তিনি চলে গেলেন। আশ্চর্য! ভালো না–তবু বাবার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপটুকুও নেই। বাড়ির ঠাকুর-চাকরের অসুখ করলে বাড়ির কর্তা ভাবেন। কিন্তু এ যেমনই হোক তবু এ তো নিজের ছেলে।
সংকোচে পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকলাম। কারণ, যার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি সে আমায় মোটেই পছন্দ করে না। এই যে সেদিন গভীর রাতে অলৌকিক ভাবে চারু দেখা দিল তখনও তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শাসিয়ে গেল, যেখানেই থাকি তোকে টেনে নেব। এ কথার মানে কী? আমার সঙ্গে ওর এমন বন্ধুত্ব নেই যে যেখানেই ও থাকুক আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। আসলে আমাকে শাস্তি দেবার জন্যে। কিন্তু আমার অপরাধটা কী? আমি ওর ঔদ্ধত্য, প্রভুত্ব স্বীকার করতে পারতাম না। ও আমাকে যখন তখন বাজাবার জন্য হুকুম করত। ভাবত আমি যেন ওর মাইনে করা লোক। এটা সহ্য করতে পারতাম না। এড়িয়ে চলতাম, এটাই তার রাগ। সত্যি কথা বলতে কি ওর ভয়েই শেষ পর্যন্ত বাজানো ছেড়ে দিলাম।
তাই ভাবছিলাম রোগের মধ্যে এ রকম অপছন্দের মানুষকে দেখলে সে কি সহ্য করতে পারবে? যাই হোক, ভেতরের যে ঘরে গিয়ে ঢুকলাম–সে ঘরেই একটা চৌকিতে শুয়েছিল চারু। দুচোখ বন্ধ। যেন ঘুমোচ্ছে। ঘরে ওদের সরকারবাবু আর রামতারণ কবিরাজ মশাই ছাড়া আর কেউ নেই। বৃদ্ধ কবিরাজমশাই খুব মনোযোগ দিয়ে নাড়ি দেখছেন। সরকার মশাই ব্যাকুলভাবে তাকিয়ে আছেন কবিরাজমশাইয়ের দিকে। কী বলবেন কে জানে?
