এই পর্যন্ত বলে বুড়ো মুকুন্দ হাঁপাতে লাগল।
কষ্ট হচ্ছে তোমার মুকুন্দ?
না। এবার তো আপনারা ওপরে যাবেন? যান। সাবধানে যাবেন।
তুমি যাবে না?
না বাবু, আমি সাহেবদের ভৃত্য ছিলাম। ওপরে যাওয়া আমার বারণ।
তা হলে আমাদের বুঝিয়ে দেবে কে?
বোঝাবার কিছু নেই। শুধু দেখেই নেমে আসবেন। যে ঘরগুলো তালা দেওয়া সেগুলোর দিকে তাকাবার দরকার নেই।
তুমি এখন কোথায় চললে?
কোথায় আর যাব? এ বাড়ি ছেড়ে আমার তো যাবার উপায় নেই। এখানেই আছি।
.
মুকুন্দরহস্য
ভাঙাচোরা সিঁড়িতে ভয়ে ভয়ে পা রেখে ওরা দোতলায় উঠে এল। দোতলায় উঠতেই দুজনকে চমকে দিয়ে গোটা বাড়িটা দুলে উঠল। একবার–দুবার–তিনবার–
ভূমিকম্প নাকি?
না, ভূমিকম্প যে নয় তা দরজা-জানলাগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা গেল। সেগুলো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তাহলে বাড়িটা অমন কেঁপে উঠল কেন?
চপলের মুখ শুকিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে তাকাল টগার দিকে। টানা বারান্দা দিয়ে চলতে চলতে বলল, এটা কিরকম হলো?
টগা উত্তর দিলো না। চপল ফের জিগ্যেস করল, এটা কি ভূমিকম্প?
টগা বলল, না।
তা হলে?
টগা নিরুত্তর।
চপল ফের জিগ্যেস করল, কিছু বলছিস না কেন?
বলার কিছু নেই।
তার মানে?
পুরনো বাড়ি মাঝে মাঝে এইরকম কাপে। এই দিক দিয়ে আয়।
কেন?
দেখছিস না চেয়ারগুলো?
পর পর এত চেয়ার কেন?
সাহেবরা এই বারান্দায় বসে পাহাড়ের শোভা দেখত বোধহয়।
সে তো কোন যুগের কথা! তা বলে আজও চেয়ার পাতা থাকবে?
টগা গম্ভীরভাবে বলল, এই মুহূর্তেও তারা হয়তো চেয়ারে বসে দেখছে…এখন অবাক হয়ে আমাদের দেখছে…ভাবছে কী সাহস! ওরা আগের মতোই পা ছড়িয়ে বসে আছে চেয়ারে। তাই ধারে আসতে বললাম। পায়ে পা না লাগে…
কী যে বলিস! ওরা এখনও চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে আছে!
টগা বলল, ভালো করে লক্ষ্য করে দ্যাখ। সরু সরু হাড্ডিসার পায়ের ছায়া পড়েছে। দেখেছিস? না-না, দাঁড়াসনে। এগিয়ে যেতে যেতে দ্যাখ।
ওসব কথা বলিসনে টগা। ভয়ে ভয়ে বলল চপল।
টগা বলল, আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? বেশ, আড়চোখে চেয়ারগুলো লক্ষ্য কর। পুরনো উইধরা পায়াভাঙা। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। পুরনো চেয়ার এত পরিষ্কার থাকে কি করে? নিশ্চয় রোজ কেউ ঝাড়পোঁচ করে? কে করে? মুকুন্দ ছাড়া আর কোনো মানুষ দেখতে পেলি? তাছাড়া মুকুন্দ দোতলায় ওঠে না। কী রে আমার হাত ধরছিস কেন? হাত যে তোর বরফের মতো ঠাণ্ডা!
টগা, আমি ফিরে যাব।
একা যেতে পারবি না।
তুইও চল।
আমি সব দেখে যাব।
তবে আমি নিচে চললাম।
যেতে পারবি তো?
চপল উত্তর দিতে পারল না। টলতে টলতে কোনোরকমে সিঁড়ির দিকে গেল বটে কিন্তু সিঁড়ি খুঁজে পেল বলে মনে হলো না।
চপল!
সাড়া পেল না টগা।
এই মরেছে গেল কোথায়? টগা এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল। চপল!
পাশ দিয়ে সরু সিঁড়ি কোথায় যেন চলে গেছে। চপল ভুল করে এদিকে যায়নি তো? এই ভেবে টগা সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। সিঁড়িটা এঁকেবেঁকে একটা বড়ো ঘর পর্যন্ত গিয়েছে। ফাটা দেওয়াল। কড়ি-বরগা ঝুলছে। জানলাগুলো কবে থেকে বন্ধ হয়ে আছে।
কই? এখানে তো চপল নেই।
কিন্তু কেউ আছেই। ঐ তো পিছনে চাপা পায়ের শব্দ…এগিয়ে আসছে।
চপল? চপল কি মজা করে ভয় দেখাচ্ছে? চট করে ঘুরে দাঁড়াল টগা। না, কেউ নেই।
কিন্তু কেউ তার পিছনে আছেই তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ভয়ে টগার সারা গা কাঁটা দিয়ে উঠল। না, পালাতে হবে। এ বড়ো মারাত্মক জায়গা। কিন্তু, চপল যে নেই?
চপল নিশ্চয় নিচেই গেছে।
কিন্তু ও সিঁড়ি দিয়ে নামেনি।
হয়তো ভুল করে অন্য কোনো পথ দিয়ে নেমে গেছে।
টগা এগোতে লাগল। বিরাট ঘর। গোটা দুই ভাঙা ইজিচেয়ার। টানা পাখার কড়া কড়িকাঠের সঙ্গে এখনও লেগে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত একটি পায়রাও চোখে পড়েনি। এত পুরনো বাড়ি হলেও দেওয়ালে মাকড়সার চিহ্নমাত্র নেই। টগা কিছুতেই যেন ঘরটার শেষপ্রান্তে পৌঁছতে পারছে না। যেন শেষ নেই। শেষ পর্যন্ত শেষ হলো–যেখানে শুরু হয়েছে আবার সরু সরু সিঁড়ি।
ও! এই দিক দিয়েও তা হলে নিচে নামা যায়। টগা নামতে লাগল সাবধানে। বড্ড অন্ধকার। মিনিট তিন-চার নামার পর সিঁড়িটা যেন হঠাৎ ফুরিয়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে পড়ল ভিজে মাটিতে। কিন্তু মাথাটা লাগল ঠক করে জোরে শক্ত কোনো কিছুর সঙ্গে।
সেটাকে শক্ত করে দু-হাতে ধরে কোনোক্রমে উঠে দাঁড়াল টগা।
এত বড়ো–কি এটা?
ঘুলঘুলি দিয়ে সরু একফালি রোদ এসে পড়েছিল, চমকে উঠল টগা। মানুষের মতো উঁচু পাথরের একটা বিরাট কুকুর দু-পায়ের উপর ভর দিয়ে মুখ উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন এক্ষুণি হুংকার ছাড়বে! আর তার মুখে লেগে রয়েছে রক্ত। হয় রক্তপান করেছে, নয় রক্তবমি করেছে। চোখের মণি দুটো কী পাথরের, কে জানে। মনে হচ্ছিল যেন জ্বলছে। টগা পালাতে গেল। কিন্তু দাঁড়াতে পারল না। শেষে হামাগুড়ি দিয়ে সেই ঘুপচি ঘরের অন্য প্রান্ত দিয়ে নামতে লাগল।
অন্ধকার—স্যাঁতসেঁতে সিঁড়ি। গড়িয়ে গড়িয়ে চলল টাগা। এই মুহূর্তে চপলের কথা মনে এল। তারপরই হঠাৎ ধপ করে কোথায় যেন পড়ল। আর তখনই কানে এল পাশেই কে যেন কাতরাচ্ছে, উঃ, বাবা গো!
চপল!
হু। পড়ে গেছি ওপর থেকে।
লাগেনি তো?
না, কিন্তু পিঠে কী বিধছে। উঠতে পারছি না।
এখানে একটা বন্ধ দরজা আছে বলে মনে হচ্ছে। দেখি যদি খোলা যায়।
