তারপর আধঘণ্টা এগোতেই চোখে পড়ল দূরে কালো পাহাড়ের নিচে একটা লম্বা উঁচু পাঁচিল। আর তার ভেতরে একটা ভাঙা দোতলা বাড়ি। বাড়িটার দোতলার একদিকের বারান্দা ভেঙে ঝুলছে। গোটা বাড়ি ঢাকা পড়ে আছে লতা-পাতা-আগাছায়।
বাড়ির কাছে এসে যখন তারা পৌঁছল তখন ওদের আনন্দর সীমা নেই। এই জায়গাটা ঘিরেই কত কালের কত জল্পনা-কল্পনা। কেউ বলে এটা ছিল রাজবাড়ি। কেউ বলে এটা অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের আস্তানা। এখানেই নাকি থাকে কুকুর-দেবতা বা কুকুর-ভূত– ফার্নান্ডেজ যাকে বলেন Angry Hound, পাদ্রিবাবা বলেন, সারমেয়রাজ। যিনিই হন– মাঝে মাঝে তিনি শিশুরক্তের তৃষ্ণায় হুংকার ছাড়েন। সেই বুক-কাঁপানো ডাক শোনা যায় বন-বাংলোয় বসেও। অথচ কেউ আসতে সাহস পায় না। আজ কলকাতার দুটি ছেলে শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছল।
কিন্তু কোথায় তিনি? তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
বাড়ির ভেতরে ঢোকবার আগে ওরা প্রথমে বাড়িটা–না, গোটা বাড়িটা বলতে যা বোঝায় এখন আর তা নয়, ধসে পড়া ইটের স্তূপ–ঘুরে দেখল। বোঝা গেল একসময়ে বিরাট জায়গা জুড়ে ছিল দোতলা বাড়িটা। সামনে থেকে দেখলে মনে হয় পাথরের বাড়ি। ওপরে যে ঘরগুলো এখনও মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে তার বড়ো বড়ো জানলাগুলোর কতকগুলো খোলা, কতকগুলো বন্ধ। এইসব পুরনো শূন্য ঘরে সাধারণত পায়রার বাসা থাকে। কিন্তু এখানে তেমন লক্ষণ নেই।
পাহাড়ি জায়গায় কি পায়রা থাকে না? চপল জিগ্যেস করল।
টগা প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল।
ওরা ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির পিছন দিকে এসে পড়ল। এ দিকটা আরও পরিত্যক্ত। চোরকাটা ভর্তি জমি কবে যে এদিককার রকে ওঠার সিঁড়িটা পর্যন্ত গ্রাস করে ফেলেছে তার ঠিক নেই।
বাড়ির এই পিছন দিকেও কয়েকটা ঘর আছে। সবগুলিরই জরাজীর্ণ অবস্থা। হঠাৎ তারই একটা ঘর থেকে একটা লোক বেরিয়ে এল। বয়েসের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে। মাথাভর্তি জট পাকানো পাকা চুল। হাতে একটা লাঠি। গায়ে একটা ময়লা ফতুয়া। আর আশ্চর্য…পরনে ধুতি বা লুঙ্গি নয়, সাহেবদের মতো খাকি হাফপ্যান্ট। প্যান্টটা বড় ঢিলে। যেন অন্যের প্যান্ট পরেছে।
বুড়ো লাঠি ঠক ঠক করতে করতে এগিয়ে এসে পরিষ্কার বাংলায় বলল, বাবুদের কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
আলাপ জমতে দেরি হলো না। তারা যে কলকাতা থেকে শুধু এই পাথরমহলটাই দেখতে এসেছে তা শুনে বুড়ো খুশি হলো। কেননা এই জায়গা দেখবার জন্যে দূর থেকে কেউ বড়ো একটা আসে না।
বুড়োর নাম মুকুন্দ। হ্যাঁ, শুধুই মুকুন্দ বলল। পদবি জানা নেই। না, তার কেউ নেই আজ। একাই থাকে এখানে। তার কাছ থেকেই জানা গেল একসময়ে এই বাড়িটা ছিল নীলকর সাহেবদের। খাঁটি সাহেব যাকে বলে। কী মেজাজ! নীলচাষীদের কুকুর-শেয়ালের মতো দেখত। বুটের নিচে দাবিয়ে রাখত তাদের।
তুমি তাদের দেখেছ?
দেখিনি? সাহেবদের মধ্যে জাত-সাহেব ছিল টম সাহেব। তারই বাগানে কাজ করত মুকুন্দ। খাস মালী। ওর মতো গোলাপের তোড়া বাঁধতে আর কেউ পারত না। তাই টম সাহেব তাকে খুব পছন্দ করত। কিন্তু বড়ো অত্যাচার করত সাহেব নীলচাষীদের উপর। তারপর একদিন নীলচাষীরা ক্ষেপে উঠল। মারমুখো হয়ে আক্রমণ করল কুঠিবাড়ি। টম সাহেব তার বাঘের মতো কুত্তাটাকে লেলিয়ে দিলো তাদের দিকে। কুত্তাটা একটার পর একটা চাষীর টুটি ছিঁড়তে লাগল। ওরা তখন দিলো এই বাড়িটায় আগুন ধরিয়ে। জ্যান্ত পুড়ে মরল টম সাহেব আর তার কুত্তাটা।
একটু থেমে মুকুন্দ বলতে লাগল, এসব তো সেদিনের কথা। তারপর নীলচাষ উঠে গেল। সাহেবরা একে একে এলাকা ছেড়ে চলে গেল। নীলের জমিতে শুরু হলো আম জাম-কাঁঠালের চাষ।…তারপর আরও কত বছর কাটল। সেইসব বন-বাগানও শেষ হয়ে গেল। তৈরি হলো চাষের জমি। সবই এই দুটো চোখে দেখলাম খোকাবাবুরা।…
কথা বলতে বলতে মুকুন্দ বাড়িটার পাশ দিয়ে হাঁটছিল।
সেই জমি থেকে লাঙলের মুখে উঠল কত কংকাল।
কংকাল!
হ্যাঁ, চাষীদের জোর করেও যখন নীলের চাষ করাতে পারত না তখন মেরে ঐসব জমির নিচে পুঁতে দিত সাহেবরা। আমি যত্ন করে সেগুলো তুলে রেখে দিয়েছি।
চমকে উঠল ওরা। বলে কী মুকুন্দ!
কোথায় রেখেছ?
দেখবেন? সব গুনে গুনে রাখা আছে। হয়তো কোনোদিন কাউকে হিসেব দিতে হবে।
না-না দরকার নেই। তুমি বরঞ্চ অন্য যদি কিছু দেখাবার থাকে তো দেখাও।
হ্যাঁ, দেখাব বইকি। কেউ তো আসে না। আপনারা এসেছেন কত দূর থেকে ঐ যে ছাতলাধরা ভাঙা একতলা মস্ত ঘরটা-ওটা ছিল নীলের গুদাম। আর ঐ যে উঁচু-মতো দেখছেন, ওটা ছিল নীলের চৌবাচ্চার চিমনি। দিন-রাত গলগল করে ধোঁওয়া বেরোত। আর ঐ ভাঙা চৌবাচ্চাতে নীল ভেজানো হতো।
চৌবাচ্চার নিচের দিকে কিসের দাগ?
ওখানে ছিল মোটা মোটা তামার পাত।
তামার পাত!
হ্যাঁ। সব গেছে।
চুরি?
না বাবু, একজন ভদ্দরলোক। বুড়ো। যিশুর শিষ্য। আস্ত শয়তান। কবছর অন্তর কোথা থেকে এসে সে-সব পাত খুলে নিয়ে যায়। শুধু তামার পাতই নয়, এই বাড়ির কোথায় কোন ঘরের মাটির নিচে সাহেবদের সোনাদানা থাকত ঐ বুড়োটা তাও জানত। সব নিয়ে গেছে।
টগা অবাক হয়ে চপলের দিকে তাকাল। তারপর মুকুন্দকে বললে, তোমরা বাধা দিতে পারনি?
মুকুন্দ কেমন একরকমভাবে হাসল। এত বয়েসেও হলদে হলদে বিশ্রী দাঁতগুলো বেরিয়ে এল। বলল, আমি ছাড়া আর কে আছে এ তল্লাটে বাবু? তা একাই লড়তে গিয়েছিলাম। বুড়োটা আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার ধরে ডেকে বলল, মুকুন্দ, তুমি আমায় চিনতে পারছ না? আমি যে টম সাহেবের নাতি! এই কুঠিবাড়িতে যা কিছু আছে সবকিছুর দাবিদার এখন আমি। তা শুনে আমি হাত গুটিয়ে নিলাম। কিন্তু আমি জানি ও মিথ্যে কথা বলছে। ও চোর। আর তার জন্যে ওকে শাস্তি পেতেই হবে।
