টগা হামাগুড়ি দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর টানাটানি করে কোনোরকমে দরজাটা খুলল। খুলতেই এক ঝলক আলো ঘরে এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল। শিউরে উঠল চপল। পাটকাঠি যেমন গোছা করে সাজিয়ে রাখে তেমনি করে গোছা বাঁধা রয়েছে নরকংকাল ঘরের এক কোণে। চপল ওপর থেকে পড়েছিল সেই কংকালের ওপরে।
অতি কষ্টে দুজনে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। এটা বাড়ির পিছনের দিকের বারান্দার একটা ঘর। এরই পাশাপাশি কোনো একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল মুকুন্দ। কিন্তু
কিন্তু সেটা কোন ঘর খুঁজে পাওয়া গেল না। সব ঘরগুলোই বাইরে থেকে ওপরে নিচে তালা বন্ধ। সব তালাই মর্চে পড়া! বহু দিন খোলা হয়নি।
আশ্চর্য, মুকুন্দ গেল কোথায়?
চপল বলল, মুকুন্দকে আর দরকার কী? তাড়াতাড়ি আমরা ফিরে যাই চলো।
টগা বলল, ওর সঙ্গে দেখা করে যাওয়া উচিত।
তা উচিত। কিন্তু সে গেল কোথায়?
আয়, এখানে ঘাসের ওপর বসে একটু অপেক্ষা করা যাক।
বসে বিশ্রাম করতে করতে চপল জানাল কিভাবে অন্ধকারে কার পায়ের শব্দ টগার মনে করে, সেই শব্দ অনুসরণ করে চলতে চলতে একটা গর্তের মধ্যে দিয়ে নিচে পড়ে গিয়েছিল।
তারপর টগা শোনাল কীভাবে দর্শন পেয়েছিল সারমেয়রাজের। তবে জ্যান্ত সারমেয় নয়, পাথরের মূর্তি।
যাক! তবু তো তুই দেখলি।
হা। তুই দেখবি?
রক্ষে করো। এখন অনেক পথ হাঁটতে হবে। ওঠো ওঠো–
হঠাৎ লক্ষ্য পড়ল বারান্দায় জীর্ণ দড়িতে মেলা রয়েছে একটা খাকি হাফ প্যান্ট, একটা ময়লা ফতুয়া। এসবই যে মুকুন্দের তাতে সন্দেহ নেই। এগুলোই তো একটু আগে পরেছিল। এসব খুলে রেখে সে গেল কোথায়?
ঐ দ্যাখো ওর হাতের লাঠিটা।
টগা দেখল লাঠিটা বেশ যত্ন করে বারান্দার দেওয়ালে ঠেসানো। যেন কেউ এইমাত্র লাঠিটা বাইরের দেওয়ালে ঠেসিয়ে রেখে ভেতরে ঢুকেছে।
দুজনে একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। বুঝতে কিছু বাকি রইল না। তারপর জোরে হাঁটতে লাগল।
.
শেষকৃত্য
শেষ-বিকেলে ওরা যখন পাদ্রিবাবার চার্চের কাছাকাছি এসে পড়ল তখন দেখল জনা চারেক লোক একটা কফিন কাঁধে করে নিঃশব্দে প্রায় দৌড়চ্ছে। সঙ্গে কয়েকজন ছাড়া শবযাত্রীও নেই। তবে পাদ্রিবাবা বিনয়বাবু আছেন। অবশ্য তার তো না থাকলেই নয়। শেষ প্রেয়ারটা তাকেই করতে হবে।
কিন্তু এদিকে কেন? নতুন বেরিয়াল ফিল্ডটা তো অন্য দিকে?
হঠাৎ দেখা গেল শবযাত্রীদের পিছন থেকে বিকু হাত নেড়ে ডাকছে।
আশ্চর্য! বিকু শবযাত্রীদের দলে কেন?
না, শুধু বিকুই নয়, বানবাংলোর আরও কেউ কেউ রয়েছে। আরে ঐ তো সদাশিববাবুও!
সদাশিববাবু থমথমে মুখে ইশারায় ওদের ডাকলেন।
নিঃশব্দে টগা, চপল ওঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
গতি বাড়ছে। যেন সকো, শয়তান যদি আবার জেগে ও তো এখন ব্যবহার
কি ব্যাপার?
সদাশিববাবু গম্ভীর মুখে চাপা গলায় বললেন, মিস্টার ফার্নান্ডেজ
সে কী কখন!
সদাশিববাবু বললেন, রাতে মহেন্দ্রর গলায় ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো কামড়ে দিয়ে পাঁচিল টপকে পালাচ্ছিলেন। পালাতে পারেননি। পড়ে গিয়ে মারা যান। হ্যাঁ, তার মধ্যে অশেষ শক্তিসম্পন্ন evil spirit–অশুভ শক্তি ছিল। কিন্তু তবু বয়েস হয়েছিল তো। তা ছাড়া পাপের পরিণতি এই-ই হয়।
ওরা ততক্ষণে সমাধিক্ষেত্রের কাছাকাছি এসে পড়েছে। যতই কাছাকাছি আসছে ততই ওদের গতি বাড়ছে। যেন সন্ধ্যে হবার আগেই কফিনটাকে মাটির নিচে নামিয়ে পালিয়ে আসতে পারে। বলা তো যায় না শয়তান যদি আবার জেগে ওঠে!
টগা জিগ্যেস করল, কিন্তু পুরনো সমাধিতে কেন? এটা তো এখন ব্যবহার করা হয় না।
সদাশিববাবু বললেন, সকালে ওঁর বডিটা পাবার পর পাদ্রিবাবাকে খবর দেওয়া হয়। স্থানীয় খ্রিস্টানরা অনেকেই আসেন। সকলেই মিস্টার ফার্নান্ডেজের ক্ষত-বিক্ষত দেহ–বিশেষ করে রক্তাক্ত ভয়ংকর মুখটা দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেন। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো মহেন্দ্রর টুটি কামড়ানো আর সেইসঙ্গে কিছু কিছু ঘটনায় তারা মনে করে নেন ইনি কোনো পাদ্রি হতে পারেন না। ইনি ছদ্মবেশী শয়তান। কাজেই মাটি দেওয়ার ব্যাপারে একজন পাদ্রির উপযুক্ত সম্মান এঁকে দেওয়া যায় না।
তখন তর্ক ওঠে–তবু তো উনি একজন খ্রিস্টান। অতএব শেষ সময়ে যেটুকু সম্মান প্রাপ্য সেটুকু দিতে হবেই।
অন্যেরা রাজী হলো। কিন্তু জানিয়ে দিলো নতুন বেরিয়াল ফিল্ডে ওঁকে সমাহিত করা হবে না। ওঁর জন্যে উপযুক্ত জায়গা সেই পুরনো পরিত্যক্ত নিষিদ্ধ সমাধিক্ষত্র।
মর্চে-পড়া তালা ভেঙে, লোহার গেট খুলে একরকম চুপিচুপি কফিন নিয়ে মাত্র জন কয়েক মানুষ সমাধিক্ষেত্রে ঢুকল। মাটি কাটাই ছিল। বাকি কাজটুকু সেরে ফিরতে আধঘণ্টার বেশি সময় লাগল না।
কোনোরকমে একটা ভয়ংকর, হিংস্র অশুভ আত্মার শেষ কাজটুকু সেরে এরা যখন বাইরে এসে দাঁড়াল তখন মাঠাবুরু পাহাড়ের পিছনে সূর্য ডুবে গেছে। অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে চারিদিকে।
[শারদীয়া ১৪১০]
পাশের ঘরেই সে আছে
বেশ অনেক বছর আগের কথা। কাগজে একটা খবর বেরিয়েছিল, একজন খুনী পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এই কলকাতাতেই লুকিয়ে আছে। পুলিশ তদন্ত করে এই পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিল খুনীটা উত্তর কলকাতার কোথাও কোনো বাড়িতে ছদ্মবেশে ডেরা গেড়ে আছে। লোকটার ছবিও ছাপা হয়েছিল। কাগজে বলা হয়েছিল কেউ যদি লোকটির সন্ধান দিতে পারে তাহলে তাকে গভর্নমেন্ট থেকে পুরস্কৃত করা হবে।
