এই হলো পরিস্থিতি। এর মধ্যে টগাদের কি কোনো কর্তব্য আছে?
না, কখনই না। তবে টগার একান্ত ইচ্ছে আর কেউ সঙ্গে থাক বা না থাক, সে একবার ঐ নীলকুঠির বাড়িতে যাবেই। স্বচক্ষে একবার দেখে আসতে চায়। আর তা যত শীগগির সম্ভব।
.
চিন্তায়-ভাবনায় টগার ভালো করে ঘুম হচ্ছিল না। হঠাৎ নিস্তব্ধ রাতে তার মনে হলো কোনো ঘরের দরজা খুব সাবধানে খোলা হলো। তারপর ফের দরজা বন্ধ করার শব্দ। তারপর অতি ধীর চাপা পদশব্দ…তারপর আবার সব চুপচাপ।
একটু পরে দূরে কোনো দরজায় ঠক ঠক শব্দ। কেউ যেন সাবধানে দরজা খুলতে বলছে…
টগার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। উঠে বসল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দরজার দিকে…।
ঠিক তখনই বাংলোবাড়ির ইঁদারার পিছন থেকে ভেসে এল মৃত্যু-যাতনায়-কাতর মর্মভেদী আর্তনাদ। টগা খিল খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। অন্ধকার বারান্দা। সুইচটা কোথায় খেয়াল হলো না। তাই অন্ধকারেই এগিয়ে গেল ইঁদারা লক্ষ্য করে। ততক্ষণে ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। এস্ত ভীত বোর্ডাররা আগের দিনের মতোই বেরিয়ে এসেছে।
উঃ কী ভয়ংকর শব্দ! কিসের শব্দ? অন্যজন উত্তর দিলো, মনে হলো কেউ খুন হচ্ছে।
খুন! তৃতীয়জন চমকে উঠল।
কে খুন হলো?
টগা বলল, ইঁদারার দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখুন।
ততক্ষণে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কেউ আর ইঁদারার দিকে এগোতে চায় না।
এই যে তপেন্দুবাবু, আমি জানি আপনি সব থেকে আগে এগিয়ে আসবেন। আর্তনাদ বলেই তো মনে হলো। আপনার কী মনে হয়?
আমারও তাই মনে হচ্ছে।
কিন্তু থেমে গেল কেন?
হয়তো সব শেষ হয়ে গেল।
সদাশিববাবু সহ অন্য সকলে একসঙ্গে চমকে উঠল।
খুন!
সদাশিববাবু অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। দু-চারজন বলল, কে খুন হলো? টগা আঙুল দিয়ে হাঁদারাটা দেখিয়ে দিলে বলল, আমার ধারণা ঐ দিকে গেলে দেখতে পাবেন।
ব্যস! কারো মুখে আর কথা নেই। তারপর একে একে প্রায় সকলেই যে যার ঘরের দিকে গা বাঁচিয়ে চলে গেল। রইল শুধু চপল আর বিকু।
আসুন সদাশিববাবু, দেখা যাক হতভাগ্যটা কে।
সদাশিববাবু কাঁপা-গলায় বললেন, কেমন যেন নার্ভাস হয়ে পড়ছি।
তা তো হবেনই। যদি সত্যিই খুন হয়ে থাকে তা হলে ম্যানেজার হিসেবে সব দায়িত্ব। আপনার।
ঘরের সামনেই পড়ে ছিল মহেন্দ্র শতপথী। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল কণ্ঠনালী। টগা হাঁটু গেড়ে বসে দেহটা পরীক্ষা করে বলল, মহেন্দ্রর প্রাণ কিন্তু এখনও আছে। এক্ষুণি ডাক্তার দেখিয়ে রক্ত বন্ধ করতে পারলে হয়তো বেঁচে যাবে।
কিন্তু এত রাতে ডাক্তার কোথায় পাব তপেন্দুবাবু? হাসপাতালও তো কাছে নয়।
টগা বলল, এক্ষুণি একবার চার্চের কোয়ার্টারে বিনয়বাবুর কাছে খবর পাঠান। ওঁর কাছে ফাস্ট এড দেবার ব্যবস্থা আছে দেখেছি। তিনি খবর পেলে কিছু একটা ব্যবস্থা করবেনই।
খুব ভালো কথা বলেছেন। বলেই সদাশিববাবু তখনই দুজন লোক পাঠিয়ে দিলেন।
চপল বলল, সবাইকে দেখলাম। মিস্টার ফার্নান্ডেজকে তত বেরোতে দেখলাম না।
উনি হয়তো টের পাননি। যা ঘুম! বললেন সদাশিববাবু।
চলুন দেখি।
সদাশিববাবু বললেন, আমি কিন্তু দরজা ঠেলতে পারব না তপেন্দুবাবু। তাঁরা ঘুম ভাঙানো নিয়ে যা অশান্তি একবার হয়ে গেছে–
টগা বললে, আপনাকে কিছুই করতে হবে না। যা করবার আমিই করব।
শেষ পর্যন্ত কাউকেই হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি করতে হলো না। টগা যেন জানতই, এইভাবে বন্ধ দরজাটা একটু ঠেলল। সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা খুলে গেল।
মিস্টার ফার্নান্ডেজ!
অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়েই টগা হাঁকল। কিন্তু সাড়া পাওয়া গেল না।
কী ব্যাপার? এত রাতে উনি গেলেন কোথায়?
গেছেন নিজের খুব পরিচিত জায়গায়। বলে টগা একটু হাসল। যাবার আগে সামান্য একটু কাজ সেরেই গেছেন। চলুন, মহেন্দ্র কেমন আছে দেখি গে।
.
আধঘণ্টার মধ্যেই ঐ গভীর রাতে বৃদ্ধ পাদ্রিবাবা নিজেই লোকজন, স্ট্রেচার, ওষুধপত্তর নিয়ে হাজির হলেন। টর্চের আলো ফেলে মহেন্দ্রর গলার ক্ষতস্থান পরীক্ষা করতে করতে বলে উঠলেন, তপেন্দুবাবু, লুক। আঘাতটা দেখে কি মনে হয় টুটিতে দাঁতের কামড়?
সকলেই বলে উঠল, হ্যাঁ, স্পষ্ট দাঁতের দাগ।
এই অবস্থাতেও বিনয়বাবু হাসলেন একটু। বললেন, এই হলো আপনাদের Angry Hound এর রাগের নমুনা। মিস্টার ফার্নান্ডেজ তো নিজেকে Angry Hound-এর প্রতিনিধি মনে করেন।
টগা চমকে উঠল। এও কী সম্ভব! মিস্টার ফার্নান্ডেজের মতো একজন বৃদ্ধ লোক– অন্যেরা কিছু বুঝল না। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
বিনয়বাবু প্রাথমিকভাবে ক্ষত থেকে রক্ত বন্ধ করার ব্যবস্থা করে মহেন্দ্রকে রাতের মতো চার্চে নিয়ে গেলেন।
.
পাথরমহল
বিকু এল না। বলল, পাগল! শেষ পর্যন্ত প্রেতপুরীতে মরতে যাব! ততক্ষণ ঘুমোলে কাজ হবে।
চপল বলল, তাই ঘুমো।
ঘুম তো দরকার। গত রাত্রে মহেন্দ্রর ওপর আক্রমণ, টুটিতে কামড় দিয়ে ফার্নান্ডেজের এই বৃদ্ধ বয়েসেও পাঁচিল টপকে পাথরমহলের দিকে পলায়ন, পাদ্রিবাবার সেবা ইত্যাদি সব অপ্রত্যাশিত ঘটনায় রাতে কারো ভালো ঘুম হয়নি। তবু টগা আর চপল অদম্য কৌতূহলে আর অসাধারণ সাহস বুকে করে সক্কালবেলাতেই বেরিয়ে পড়ল সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা পাথরমহলের দিকে।
পিছনের সূর্য ক্রমে মাথার উপর উঠে এল। পাথরের পর পাথর টপকে চলেছে দুজন। সঙ্গে কয়েক বোতল জল আর কিছু শুকনো খাবার। একসময়ে তারা এসে দেখল মরুভূমির যেমন চারদিকে ধু ধু বালি ছাড়া আর কিছু নেই, এখানেও তেমনি। ছোট-বড় পাথর ছাড়া আর কিছু নেই।
